নারায়ণগঞ্জে আগুনে পুড়ল ঝুটের গুদামসহ ৪ দোকান

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১ জুলাই, ২০২৬
  • ৩ বার
নারায়ণগঞ্জে আগুনে পুড়ল ঝুটের গুদামসহ ৪ দোকান

প্রকাশ:  ১ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভোরবেলার শান্ত প্রকৃতি তখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকার ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের পশ্চিম পাশে দক্ষিণ সস্তাপুর এলাকাটি যখন কর্মচাঞ্চল্যে রূপ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তখনই আগুনের লেলিহান শিখা সবল গ্রাসে সবকিছু তছনছ করে দেয়। বুধবার সকালে ঘটে যাওয়া এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড কেড়ে নিল অসহায় ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন ও সম্বল। আগুনের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, মুহূর্তের মধ্যেই গার্মেন্টস ওয়েস্টেজ বা ঝুটের গুদামসহ চারটি দোকান ভস্মীভূত হয়ে ছাই হয়ে গেছে। আগুনের কালো ধোঁয়া পুরো আকাশকে আচ্ছন্ন করে ফেললে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, সকাল সাড়ে সাতটার দিকে হঠাৎ করেই দক্ষিণ সস্তাপুরের একটি ঝুটের গুদাম থেকে আগুনের ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আগুনের শিখা গুদামের ভেতরে থাকা দাহ্য পদার্থে ছড়িয়ে পড়ে। ঝুটের বস্তাগুলো আগুনের তীব্রতাকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। মুহূর্তের মধ্যেই সেই আগুন পাশেই থাকা আরেকটি ঝুটের গুদাম, একটি স-মিল এবং একটি চায়ের দোকানে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। চারদিকের মানুষের আর্তনাদ আর আগুনের লেলিহান শিখার প্রচণ্ড উত্তাপ এলাকাটিকে এক নরকপুরীতে পরিণত করে। জীবনের নিরাপত্তা ও জানমালের ভয়ে আশেপাশের বাসিন্দারা নিজেদের ঘরবাড়ি ফেলে প্রাণ বাঁচাতে রাস্তায় নেমে আসেন।

ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে নারায়ণগঞ্জের শিবু মার্কেট ও মণ্ডলপাড়া ফায়ার স্টেশনের চারটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আগুন নেভানোর কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। চারদিকে ঘন ধোঁয়া এবং আগুনের তাপে দমবন্ধ করা পরিস্থিতির মধ্যেই তারা দীর্ঘ প্রায় এক ঘণ্টার মরণপণ চেষ্টা চালিয়ে সকাল নয়টার দিকে আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। তবে আগুনের ভয়াবহতা এতই বেশি ছিল যে, নিয়ন্ত্রণে আসার আগেই গুদামগুলোতে থাকা বিপুল পরিমাণ ঝুট, স-মিলের দামী কাঠ, বিভিন্ন ধরণের আসবাবপত্র এবং চায়ের দোকানের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পুরোপুরি পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। সর্বস্ব হারানো ব্যবসায়ীরা কান্নায় ভেঙে পড়ে জানান, তাদের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন ছিল এই দোকানগুলো। ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের প্রাথমিক দাবি অনুযায়ী, এই অগ্নিকাণ্ডে অন্তত চল্লিশ লক্ষ টাকার বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অধিকাংশ মালামাল পুড়ে যাওয়ায় তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর পথ এখন অনিশ্চিত। আগুনের তাপে পাশের ঘরবাড়ি ও স্থাপনাগুলোর দেয়ালও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। একটি ছোট চায়ের দোকান থেকে শুরু করে স-মিলের কাঠ—সবই এখন পোড়া ছাইয়ের স্তূপ ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।

ঘটনার তদন্তে নেমেছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ। নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরেফিন গণমাধ্যমকে জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট বা গোলযোগ থেকেই এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়েছে। তবে আগুন লাগার প্রকৃত কারণ এবং সুনির্দিষ্ট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে একটি তদন্ত কমিটি কাজ করবে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পরই আগুনের উৎস এবং সামগ্রিক ক্ষতির প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে। তবে বৈদ্যুতিক ত্রুটি বা অসতর্কতা যাই হোক না কেন, এই ঘটনাটি আবারো শিল্পাঞ্চল ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থার অপ্রতুলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।

নারায়ণগঞ্জের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও শিল্পনির্ভর এলাকায় গুদাম বা দোকানগুলোতে অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থার যে অভাব রয়েছে, তা এই অগ্নিকাণ্ডে আবারও প্রমাণিত হলো। গার্মেন্টস ওয়েস্টেজ বা ঝুট গুদামগুলোর অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় প্রতিনিয়ত এরকম দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকেই যায়। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সঠিক অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা সচেতনতার অভাবে আজকের এই অপূরণীয় ক্ষতি তাদের জীবনকে থমকে দিয়েছে। এখন প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি এবং সচেতনতা বৃদ্ধিই পারে ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে।

এই অগ্নিকাণ্ডের পর দক্ষিণ সস্তাপুর এলাকাটিতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। অসহায় ব্যবসায়ীরা এখন সরকারের কাছে সাহায্যের আবেদন জানাচ্ছেন যাতে তারা অন্তত কিছুটা পুঁজি নিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারেন। আগুনের এই ধ্বংসলীলা কেবল মালামালই পোড়ায়নি, বরং অনেকগুলো পরিবারের উপার্জনের উৎসকেও পুড়িয়ে দিয়েছে। প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের এই দুর্গত ব্যবসায়ীদের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছেন, তবে ভুক্তভোগীরা চান দ্রুত তদন্ত এবং উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ। আগুন নেভার পর ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়ে থাকা ব্যবসায়ীদের দৃষ্টিতে ছিল শুধু অন্ধকার ভবিষ্যৎ। এই বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য প্রতিটি গুদাম ও দোকানের অগ্নি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন একমাত্র কাম্য।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত