সর্বশেষ :

মাশহাদে চিরনিদ্রায় শায়িত আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২৬
  • ৫ বার
মাশহাদে চিরনিদ্রায় শায়িত আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনি

প্রকাশ: ০৯ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইরানের রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক ইতিহাসের এক বর্ণাঢ্য ও দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনিকে তার জন্মশহর মাশহাদের পবিত্র ইমাম রেজা (আ.)-এর মাজার প্রাঙ্গণে শেষ শয্যায় সমাহিত করা হয়েছে। কয়েক দশকের শাসনামলে যিনি কেবল ইরানেরই নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতির অন্যতম প্রধান নিয়ন্ত্রক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, তার বিদায়লগ্নে পুরো ইরান জুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। বৃহস্পতিবার সকালে হাজারো শোকার্ত মানুষের উপস্থিতিতে যখন তাকে দাফন করা হচ্ছিল, তখন পুরো পরিবেশ ছিল আবেগ ও উত্তেজনায় পরিপূর্ণ। এই দাফন কেবল একজন নেতার শেষ বিদায় নয়, বরং এটি ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এক নতুন ও অনিশ্চিত যুগের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যু পরবর্তী শোকযাত্রা ছিল নজিরবিহীন। গত এক সপ্তাহ ধরে তেহরান, কোম এবং ইরাকের নাজাফ ও কারবালাসহ বিভিন্ন শহরে তার মরদেহ নিয়ে যে বিশাল শোক মিছিল ও সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল, তা প্রমাণ করে সাধারণ মানুষের কাছে তার প্রভাব কতটা গভীর ছিল। প্রতিটি শহরেই লাখো মানুষের ঢল নেমেছিল। মাশহাদের রাস্তায় এদিন মানুষের বাঁধভাঙা ভিড় ছিল দেখার মতো। তাদের হাতে ছিল ইরানের পতাকা, খামেনির প্রতিকৃতি এবং নানা ধরনের প্রতিবাদী প্ল্যাকার্ড। দাফন অনুষ্ঠানে আগত জনতার অনেকের হাতে ‘কিল ট্রাম্প’ লেখা প্ল্যাকার্ড বহন করতে দেখা গেছে, যা পরিষ্কারভাবে জানান দেয় যে তারা এই মৃত্যুর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী মনে করছেন এবং প্রতিশোধের সংকল্প পোষণ করছেন।

ইরানের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে শিয়া ধর্মীয় ঐতিহ্যের শাহাদাতের ধারণা অত্যন্ত প্রভাবশালী। বিদেশি হামলায় খামেনির মৃত্যু এই ধারণাটিকে আরও জোরালো করেছে। এটি কেবল একটি মৃত্যু নয়, বরং একে ইরানি শিয়া বিপ্লবের ইতিহাসে এক নতুন প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে। ১৯৮৯ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে দীর্ঘ ৩৭ বছর তিনি ইরানের রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। তার শাসনামলেই ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) আজকের এই শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছেছে। তার উত্তরসূরি কে হবেন—তা নিয়ে অনেক দিন ধরেই জল্পনা ছিল, তবে তার মৃত্যুর পর আইআরজিসির সমর্থন ও প্রভাবের মধ্য দিয়েই তার পুত্র মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে।

তবে নতুন নেতৃত্বের অভিষেক হয়েছে এক চরম সংকটের মুহূর্তে। মোজতবা খামেনি সম্পর্কে সংবাদমাধ্যমে নানা গুঞ্জন রয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও ইরানি সূত্রের দাবি, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এক হামলায় তিনি গুরুতর আহত হয়েছিলেন। সেই হামলায় তার মুখমণ্ডল বিকৃত এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে মারাত্মক জখম হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব জখমের কারণে এবং নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে তিনি এখনও জনসমক্ষে আসতে পারছেন না। চিকিৎসাধীন থাকার কারণে তার কোনো সরাসরি ভিডিও, অডিও বা ছবি প্রকাশ করা হয়নি। এমনকি তিনি যে লিখিত বার্তা পাঠাচ্ছেন, তার সত্যতা নিয়েও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে। নতুন নেতার এই পর্দার অন্তরালে থাকা ইরানের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের নতুন এই টানাপোড়েন পুরো বিশ্বকে শঙ্কার মুখে ফেলেছে। কয়েক সপ্তাহের সাময়িক যুদ্ধবিরতি শেষে আবারও সংঘাতের যে ঘনঘটা দেখা যাচ্ছে, তাতে খামেনির দাফন অনুষ্ঠানটি এক রাজনৈতিক শক্তিমত্তার প্রদর্শনীতে রূপ নিয়েছিল। জনতার প্রতিশোধমূলক স্লোগান এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশের মাধ্যমে ইরানের বিপ্লবী মানসিকতা আবারও প্রকাশ্যে এল। আইআরজিসি এখন দেশটির শাসনক্ষমতায় কতটুকু নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারবে এবং মোজতবা খামেনির শারীরিক সক্ষমতা ভবিষ্যতে নেতৃত্বের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে চলছে নানা বিশ্লেষণ।

একজন নেতার মৃত্যু কেবল একটি পদের শূন্যতা নয়, বরং এটি একটি আদর্শের পরীক্ষা। খামেনি তার ৩৭ বছরের শাসনামলে ইরানকে আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে করে রাখা সত্ত্বেও নিজস্ব সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ছিলেন অনড়। তার মৃত্যুতে সেই ধারাবাহিকতায় বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন আসবে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে কৌতূহল রয়েছে। একদিকে অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে বৈদেশিক শত্রুতার মুখোমুখি ইরান—এই দুইয়ের দোলাচলে দেশটি এখন এক কঠিন পথ পাড়ি দিচ্ছে।

পরিশেষে বলা যায়, মাশহাদের মাটিতে চিরনিদ্রায় শায়িত খামেনিকে ঘিরে যে আবেগ ও রাজনৈতিক উত্তাপ দৃশ্যমান হয়েছে, তা ইরানের আগামী দিনের রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করবে। শোকের এই আবহ কাটিয়ে ইরান কত দ্রুত স্থিতিশীলতায় ফিরতে পারে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। শোকযাত্রা ও দাফন অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা হয়তো শেষ হয়েছে, কিন্তু তার প্রস্থান যে শূন্যতা ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার জন্ম দিয়েছে, তা সহসাই দূর হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। শিয়া বিপ্লবের এই নতুন অধ্যায় কোন দিকে মোড় নেয়, তা কেবল সময়ই বলে দেবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত