সর্বশেষ :

পাহাড়ি ঢলে বিশ্বম্ভরপুরে বাড়ছে নদ-নদীর পানি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২৬
  • ৪ বার
পাহাড়ি ঢলে বিশ্বম্ভরপুরে বাড়ছে নদ-নদীর পানি

প্রকাশ:  ০৯ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং টানা বর্ষণে সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার নদ-নদীতে পানি অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। গত দুদিনের অব্যাহত বৃষ্টিপাত ও বৈরী আবহাওয়ায় উপজেলার নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ায় হাওরপাড়ের বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে বন্যার আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষ ও দিনমজুররা তাদের স্বাভাবিক কর্মসংস্থান থেকে বিচ্যুত হয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। এখন পর্যন্ত কোনো গ্রাম সরাসরি প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া না গেলেও পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় স্থানীয় প্রশাসন সতর্কাবস্থায় রয়েছে।

যাদুকাটা নদীর প্রবল স্রোত উজান থেকে বালি ও পলি নিয়ে ভাটির দিকে ধাবিত হচ্ছে, যার ফলে নদীতীরবর্তী এলাকায় ভাঙনের ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। এর প্রভাবেই বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার দক্ষিণ বাদাঘাট ইউনিয়নের শক্তিয়ারখলা ও দুর্গাপুর এলাকায় সংযোগ সড়কের অন্তত ১০০ মিটার অংশ তলিয়ে গেছে। এই সড়কটি তলিয়ে যাওয়ায় বিশ্বম্ভরপুরের সঙ্গে তাহিরপুর উপজেলার সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ ও যানবাহন চালকদের চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে যারা প্রতিদিন যাতায়াত করেন, তাদের এখন নৌকা বা বিকল্প পথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিনের এই সড়কটির অবকাঠামো টেকসই না হওয়ায় সামান্য ঢলেই তা তলিয়ে যায়, যা তাদের দুর্ভোগকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে জেলায় সর্বোচ্চ ২৬৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সুরমা নদীর পানি বিপৎসীমার খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে এবং বৃহস্পতিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত প্রতি ঘণ্টায় পানির স্তর উর্ধ্বমুখী ছিল। বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার শক্তিয়ারখলা পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার শূন্য দশমিক ২৭ মিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইমদাদুল হক জানিয়েছেন যে, আগামী ৭২ ঘণ্টার আবহাওয়ার পূর্বাভাস অত্যন্ত উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদি টানা বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকে, তবে সুনামগঞ্জ ও বিশ্বম্ভরপুরের নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদী বন্যার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। নদ-নদীর পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে হাওরের নিচু জমিও প্লাবিত হতে শুরু করেছে, যা কৃষিনির্ভর এই জনপদের জন্য উদ্বেগের বড় কারণ।

বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে। ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান জানিয়েছেন, দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের প্রস্তুতি রয়েছে। তবে মানুষের ঘর থেকে বের হওয়ার সুযোগ না থাকা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের সংকট মোকাবেলায় প্রশাসন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছে। হাওরপাড়ের মানুষের জীবনের নিরাপত্তার জন্য এবং সম্ভাব্য বন্যার ঝুঁকি এড়াতে সতর্কবার্তা প্রচার করা হচ্ছে। বন্যা দেখা দিলে দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রগুলো খোলার ব্যাপারেও স্থানীয় পর্যায়ে প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

হাওরপাড়ের বাসিন্দাদের জীবনযাত্রা এখন পুরোপুরি প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। টানা দুই দিনের ভারী বৃষ্টিতে নিম্নাঞ্চলের রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় গৃহপালিত পশুপাখি নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন খামারিরা। এছাড়া বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট ও পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় চিকিৎসকরা। নদী তীরবর্তী মানুষগুলোর মনে এখন শুধুই অজানা আতঙ্ক। তারা প্রতি মুহূর্তের পানির উচ্চতা পর্যবেক্ষণ করছেন। অতীতের ভয়াবহ বন্যার স্মৃতি তাদের তাড়া করে ফিরছে। কৃষকরা তাদের আবাদি জমির ফসল রক্ষায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন, যদিও হাওরের অধিকাংশ ফসল এখনো ঘরে তোলা হয়েছে। তবুও নিচু জমির সবজি চাষ ও ঘরবাড়ির নিরাপত্তা নিয়ে তাদের দুশ্চিন্তার শেষ নেই।

আবহাওয়া অফিস ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা পাওয়ার পর থেকে বিশ্বম্ভরপুরসহ পুরো সুনামগঞ্জ জেলায় প্রশাসনের পাশাপাশি বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনও তৎপর হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে জরুরি প্রয়োজনে দুর্গতদের সহায়তা করতে নৌকার ব্যবস্থা রাখা এবং স্থানীয় আশ্রয়কেন্দ্রগুলোকে প্রস্তুত করার কথা ভাবছে প্রশাসন। পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলের এই তোড় যদি আগামী কয়েকদিন অব্যাহত থাকে, তবে বিশ্বম্ভরপুরের শক্তিয়ারখলা পয়েন্টের এই সংযোগ সড়কটি পুরোপুরি ধসে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দ্রুত প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং সড়ক মেরামতের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

পরিশেষে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রতি বছরই সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চলগুলো এভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হচ্ছে। পানি নিষ্কাশনের পথ সুগম করা এবং নদীর তলদেশ খনন করা এই এলাকার স্থায়ী জলাবদ্ধতা দূর করার জন্য অপরিহার্য। বর্তমান পরিস্থিতি কেবল একটি সাময়িক দুর্ভোগ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অভাবে এই জনপদের মানুষ বারবার প্রকৃতির রোষানলে পড়ছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সরকারি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের উচিত অতি দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা যাতে পাহাড়ি ঢলের ক্ষতি ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়। বিশ্বম্ভরপুরের দুর্গত মানুষ এখন কেবল একটু নিরাপত্তা ও দ্রুত সরকারি সহযোগিতার অপেক্ষায় দিন গুনছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত