প্রকাশ: ৯ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাগেরহাটসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হলো ‘সাদা সোনা’ খ্যাত গলদা ও বাগদা চিংড়ি। এই শিল্পকে ঘিরে গড়ে উঠেছে লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা, যা দেশের রফতানি আয়ের একটি বড় উৎস। কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, বর্তমানে গলদা চিংড়ির রেণু বা পোনার তীব্র সংকটে এই শিল্প চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। চাহিদার তুলনায় ১০ ভাগের কম পোনা সরবরাহ পাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন হাজার হাজার চাষি। এই সংকট কেবল উৎপাদনের ওপরই প্রভাব ফেলছে না, বরং উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনীতিতে এক গভীর কালো ছায়া ফেলেছে। সঠিক সময়ে পোনা না পাওয়ায় অনেক চাষি ঘের খালি রেখে বিনিয়োগের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন, যা তাদের জন্য চরম হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মৎস্য বিভাগের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাগেরহাট জেলায় প্রায় ৫৪ হাজার ৮৪৮টি চিংড়ির ঘের রয়েছে, যেখানে প্রতি বছর প্রায় ২০ হাজার ৩৪৫ মেট্রিক টন গলদা চিংড়ি উৎপাদিত হয়। জেলাজুড়ে বছরে ৫৮ কোটি ৭৭ লাখ গলদার রেণু পোনার চাহিদা থাকলেও, স্থানীয় পাঁচটি হ্যাচারি থেকে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৪ থেকে ৫ কোটি পোনা। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় জোগান মাত্র ৮ থেকে ১০ শতাংশ। এই বিশাল ঘাটতির কারণে চাষিরা বাধ্য হয়ে চড়া দামে পোনা সংগ্রহ করতে চাইলেও তা পাচ্ছেন না। অথচ এই পোনা যদি মৌসুমের শুরুতেই সহজলভ্য হতো, তবে চিংড়ি উৎপাদন বর্তমানের চেয়ে অন্তত দশ গুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব ছিল, যা দেশের অর্থনীতিতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বড় ভূমিকা রাখত।
বাগেরহাটের ফকিরহাটের মৌভোগ এলাকার মৎস্যচাষি দীপক চৌধুরীর মতো অসংখ্য চাষি আজ সর্বস্বান্ত হওয়ার শঙ্কায় ভুগছেন। দীপক চৌধুরী জানান, গত বছর যে পোনা দেড় হাজার থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকায় পাওয়া যেত, এ বছর তা তিন হাজার থেকে তিন হাজার ৩০০ টাকায়ও আড়তে পাওয়া যাচ্ছে না। ১০ বিঘা জমির ঘেরের জন্য প্রয়োজনীয় রেণু তিনি সংগ্রহ করতে পারেননি, যার ফলে তার লক্ষাধিক টাকার লোকসানের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একই চিত্র দেখা যায় চাষি আহাদ শেখের ক্ষেত্রেও। ৪০ বিঘা ঘেরের জন্য তার দেড় লাখ রেণুর প্রয়োজন থাকলেও পেয়েছেন মাত্র ৩৭ হাজার। তার মতো অনেকেই ঘের প্রস্তুত করে বসে আছেন, কিন্তু মূল উপাদান অর্থাৎ পোনার অভাবে তারা উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরু করতে পারছেন না।
এই ভয়াবহ সংকটের পেছনে অন্যতম কারণ হলো নদী ও সমুদ্র থেকে আহরিত রেণু পোনা আহরণের ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা। এক সময় চাষিরা নদী থেকে আহরিত রেণুর ওপর বড় ধরনের নির্ভরশীল ছিলেন। কিন্তু সরকার প্রাকৃতিক উৎস থেকে পোনা ধরা নিষিদ্ধ করায় এই সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। বিকল্প কোনো ব্যবস্থা বা পর্যাপ্ত হ্যাচারি গড়ে না তুলেই এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় প্রান্তিক চাষিরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এছাড়া আগে ভারত থেকে আমদানি করা পোনার ওপরও নিষেধাজ্ঞা থাকায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। আড়তদার সালাম শেখের মতে, ফকিরহাটের মতো এলাকায় প্রতিদিন শত শত চাষি রেণু নিতে এসে খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন, যা উপকূলীয় অর্থনীতির জন্য এক অশনি সংকেত।
হ্যাচারিগুলোর সীমাবদ্ধতাও এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশেষজ্ঞ ও চাষিদের অভিযোগ, হ্যাচারি থেকে যে অল্প পরিমাণ পোনা সরবরাহ করা হচ্ছে, তার গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। প্রাকৃতিক উৎসের রেণুর মতো হ্যাচারির পোনা সব সময় পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে টিকে থাকতে পারে না, ফলে চাষিরা আর্থিক ঝুঁকির মুখে পড়েন। অথচ বাগেরহাটের মতো অঞ্চলে চিংড়ি চাষ ছাড়া বিকল্প কোনো পেশা না থাকায় চাষিরা তাদের শেষ সম্বলটুকু বিনিয়োগ করেছেন এই ঘেরে। এখন ঘেরের পানি আর মাটির পরিচর্যা করেও যদি পোনা ছাড়া না যায়, তবে তাদের জীবনযাপনের আর কোনো অবলম্বন থাকবে না।
এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারি পর্যায়ে জরুরি উদ্যোগ গ্রহণ করা অপরিহার্য। চাষিদের দাবি, বিকল্প কর্মসংস্থান বা সরকারি সহায়তার নিশ্চয়তা না দিয়ে পোনা আহরণের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যুক্তিযুক্ত হয়নি। সরকারের উচিত দ্রুততার সাথে আরও মানসম্মত হ্যাচারি স্থাপনে বিনিয়োগ করা এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে রেণু উৎপাদন বাড়ানোর ব্যবস্থা করা। যদি দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা না বাড়ে, তবে অনিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আসা পোনার ওপর নির্ভরতা কখনোই কমবে না। এছাড়া চাষিদের সরাসরি ঋণ সহায়তা ও সহজ শর্তে উন্নতমানের পোনা সরবরাহের জন্য সরকারি তদারকি বাড়ানো প্রয়োজন।
বাগেরহাটের চিংড়ি শিল্প কেবল একটি জেলা বা বিভাগের সম্পদ নয়, এটি দেশের জাতীয় অর্থনীতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। গত কয়েক দশকের কঠোর পরিশ্রমে গড়ে ওঠা এই শিল্প যদি আজ কেবল পোনা সংকটের কারণে ধ্বংসের মুখে পড়ে, তবে তা দেশের জন্য এক বিশাল অপূরণীয় ক্ষতি হবে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে এখনই বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রয়োজনে স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে নতুন হ্যাচারি গড়ে তুলতে হবে এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা বাড়িয়ে পোনার গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। চাষিদের হতাশাকে জয় করে পুনরায় উৎপাদন স্বাভাবিক করতে না পারলে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবনে ভয়াবহ বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, গলদা চিংড়ি শিল্পের বর্তমান সংকট কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি সঠিক পরিকল্পনার অভাবের প্রতিফলন। নদী থেকে পোনা আহরণের ওপর নিষেধাজ্ঞা যেমন জরুরি, তেমনি সেই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার আগে বিকল্প পোনা সরবরাহের উৎস তৈরি করাও সমান জরুরি ছিল। চাষিরা আজ নিরুপায় হয়ে সরকারি সহায়তার দিকে তাকিয়ে আছেন। প্রশাসন যদি দ্রুত এই সংকটের সমাধান না করতে পারে, তবে বাগেরহাটের এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প দীর্ঘমেয়াদী স্থবিরতায় পড়বে। আশা করা যায়, বর্তমান সরকার এই শিল্পের গুরুত্ব অনুধাবন করে চাষিদের পাশে দাঁড়াবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে ‘সাদা সোনা’র উৎপাদন আবারো সচল করবে।