বেনজীরের অবৈধ সম্পদের মামলায় ১৪ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১ জুলাই, ২০২৬
  • ৩ বার
বেনজীরের অবৈধ সম্পদের মামলায় ১৪ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ

প্রকাশ: ০১ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সর্বোচ্চ পদে আসীন থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে অভিযুক্ত পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে চলা আইনি লড়াইয়ে এক নতুন মোড় এল। ১১ কোটি টাকার বেশি অবৈধ সম্পদ অর্জনের চাঞ্চল্যকর এই মামলায় এখন পর্যন্ত মোট ১৪ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। আজ বুধবার ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫-এর বিচারক আব্দুল্লাহ আল মামুনের আদালতে সর্বশেষ ছয়জন সাক্ষীর জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। মামলার মোট সাক্ষী সংখ্যা ২৮ জন হওয়ায়, অর্ধেক সাক্ষীর জবানবন্দি শেষ হওয়ার মধ্য দিয়ে বিচারিক প্রক্রিয়ায় এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অতিক্রম করা হলো। পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ১৬ জুলাই দিন ধার্য করেছেন আদালত।

গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদকের উপপরিচালক হাফিজুল ইসলাম বাদী হয়ে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে এই মামলাটি দায়ের করেন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ৩০ নভেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বেনজীর আহমেদ তার সম্পদ বিবরণীতে আয়ের যে হিসাব দিয়েছিলেন, তার সাথে বাস্তবের আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে। দুদকের তদন্তে উঠে এসেছে যে, তিনি তার দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণীতে স্থাবর ও অস্থাবর মিলিয়ে যে সম্পদের ঘোষণা দিয়েছিলেন, প্রকৃত তদন্তে তার চেয়ে অনেক বেশি সম্পদের সাক্ষ্যপ্রমাণ মিলেছে। তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্যমতে, বেনজীর আহমেদ ১৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকার অধিক মূল্যের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মালিক হয়েছেন, অথচ তার বৈধ আয়ের উৎস হিসেবে পাওয়া গেছে মাত্র ছয় কোটি ৫৯ লাখ ৪২ হাজার ৬৬৮ টাকা। ব্যয়ের হিসাব বাদ দিলে তার নিট সঞ্চয় চার কোটি ৬৩ লাখ ৫৬ হাজার ৬৭৫ টাকা হওয়ার কথা থাকলেও, তিনি অজ্ঞাত উৎস থেকে ১১ কোটি চার লাখ ৪৩ হাজার ৫৭৬ টাকার সম্পদ অর্জন করেছেন বলে দুদকের মামলায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বুধবার আদালতে যে ছয়জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, তারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সাব-রেজিস্ট্রার ও সরকারি কর্মকর্তা। এর মধ্যে রয়েছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা রেজিস্ট্রার মো. আব্দুল হাফিজ, চাঁদপুর হাজীগঞ্জের সাব-রেজিস্ট্রার এস এম মোস্তাফিজুর রহমান, নওগাঁ মহাদেবপুরের সাব-রেজিস্ট্রার মো. রফিকুল ইসলাম, ভোলা চরফ্যাশনের সাব-রেজিস্ট্রার কাওসার খান, বন অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আব্দুস সালাম এবং বাড্ডার সাব-রেজিস্ট্রার জাহাঙ্গীর আলম। তাদের সাক্ষ্যদান এই মামলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জমির দলিলপত্র ও সরকারি নথিপত্রে বেনজীর আহমেদের দুর্নীতির জাল যে কত বিস্তৃত, তা তাদের জবানবন্দিতে উঠে এসেছে। দুদকের প্রসিকিউটর মীর আহমেদ আলী সালাম জানিয়েছেন, অভিযোগ গঠনের পর থেকে বিচারিক প্রক্রিয়া নিরবচ্ছিন্নভাবে এগিয়ে চলছে এবং সাক্ষীদের ধারাবাহিক উপস্থিতিতে মামলার আইনি ভিত্তি মজবুত হচ্ছে।

সাবেক এই প্রভাবশালী পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কেবল একটি নয়, বরং আরও পাঁচটি মামলা রয়েছে দুদকে। এর মধ্যে অন্যতম হলো সরকারি চাকরিতে কর্মরত থাকা অবস্থায় নিজেকে বেসরকারি চাকরিজীবী দেখিয়ে ভুয়া পাসপোর্ট তৈরির ঘটনা, যা ২০২৪ সালের অক্টোবরে দায়ের করা হয়। এছাড়া তার স্ত্রী জীশান মির্জা ও দুই কন্যা ফারহিন রিশতা বিনতে বেনজীর ও তাহসিন রাইসা বিনতে বেনজীরের বিরুদ্ধেও পৃথক তিনটি মামলা দায়ের করা হয়েছে, যেখানে বেনজীরকে সহযোগী আসামি হিসেবে দেখানো হয়েছে। ক্ষমতার দাপটে তিনি আইনি নিয়মগুলোকে কীভাবে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করেছিলেন, তা এখন আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে স্পষ্ট হচ্ছে। ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার ও র‍্যাবের মহাপরিচালকের দায়িত্বও পালন করেছিলেন। সেই সময় তিনি নিজের প্রভাব খাটিয়ে যে বিশাল বিত্তবৈভব গড়েছিলেন, তা আজ বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উন্মোচিত হচ্ছে।

বিচারিক এই কার্যক্রম কেবল একজন ব্যক্তির দুর্নীতির বিচার নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে বসে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের এক প্রতীকী লড়াই। দেশের মানুষ তাকিয়ে আছে এই মামলার চূড়ান্ত রায়ের দিকে। মামলার সাক্ষী সংখ্যা ২৮ জন এবং এখন পর্যন্ত ১৪ জনের সাক্ষ্য শেষ হওয়া মানেই অর্ধেক পথ পার হওয়া। বিচারক আব্দুল্লাহ আল মামুন মামলার কার্যক্রম অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করছেন। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই আইনি লড়াই এখন এক চূড়ান্ত পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আগামী ১৬ জুলাই পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের দিনে মামলার বাকি সাক্ষী ও নথিপত্র বিচারিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা যখন নিজেই দুর্নীতির চক্রে জড়িয়ে পড়েন, তখন সেটি সাধারণ মানুষের মধ্যে এক গভীর হতাশার সৃষ্টি করে। তবে সেই একই আইনের কাঠামোর অধীনে বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সত্য যখন বেরিয়ে আসে, তখন মানুষের মনে পুনরায় আস্থার সৃষ্টি হয়। বেনজীর আহমেদের এই মামলাটি দেশের বিচার বিভাগ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের সক্ষমতার এক বড় পরীক্ষা। এখন দেখার বিষয়, পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের পর এই আইনি লড়াই কোন দিকে মোড় নেয় এবং দীর্ঘমেয়াদে তা দেশের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে কী বার্তা নিয়ে আসে। আইন সবার জন্য সমান এবং অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, তাকে যে একদিন বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়, এই মামলার প্রক্রিয়াটি সেটাই আবারও প্রমাণ করছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত