টাঙ্গুয়ার হাওর সুরক্ষায় ১৩ দফা কঠোর নির্দেশনা জারি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩ বার
টাঙ্গুয়ার হাওর সুরক্ষায় ১৩ দফা কঠোর নির্দেশনা জারি

প্রকাশ:  ০৩ আগস্ট  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যের এক অনন্য আধার সুনামগঞ্জের বিশ্বখ্যাত টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশ রক্ষা এবং এর প্রতিবেশগত ভারসাম্য সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১৩ দফা অত্যন্ত জরুরি ও কঠোর নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। দেশের এই বহুমুখী প্রাকৃতিক সম্পদকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে এবং পর্যটকদের দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করতে নতুন এই উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও হাওর সুরক্ষা বাস্তবায়ন ও পরীক্ষণ কমিটির সম্মানিত সভাপতি মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান স্বাক্ষরিত এক আনুষ্ঠানিক গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই নতুন নির্দেশনাগুলো প্রকাশ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে হাওরের জীববৈচিত্র্য যেভাবে হুমকির মুখে পড়েছিল, তা থেকে উত্তরণের জন্য এই নির্দেশনাগুলো অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। হাওরের পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষা করতে প্রশাসনের এমন কঠোর অবস্থান সচেতন মহলে ব্যাপক প্রশংসার জন্ম দিয়েছে।

গত রবিবার সন্ধ্যায় প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপকালে সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সার্বিক মো. মতিউর রহমান খান এই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট করে জানান যে এই নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়নের পূর্বে স্থানীয় হাউসবোট এবং পর্যটকবাহী নৌযানের মালিকদের সঙ্গে একাধিকবার ফলপ্রসূ আলোচনা করা হয়েছে। তিনি পরিষ্কার করে বুঝিয়ে বলেন যে পুরো হাওর জুড়ে নয়, বরং হাওরের যে অংশটি প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা বা ইসিএ হিসেবে চিহ্নিত, কেবল সেই নির্দিষ্ট স্থানেই কোনো ধরনের ইঞ্জিনচালিত নৌযান প্রবেশ ও চলাচল করতে পারবে না। তবে এর বাইরে হাওরের বাকি অংশে হাউসবোট কিংবা অন্যান্য পর্যটকবাহী নৌকা চলাচলে কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা বা বাধা রাখা হয়নি। এই ব্যবস্থার ফলে সাধারণ পর্যটকরা কোনো ধরনের বিঘ্ন ছাড়াই স্বচ্ছন্দে মাটিয়ান হাওর, ঐতিহাসিক বৌলাই নদ হয়ে সুদূর টেকেরঘাট পর্যন্ত মনোরম নৌভ্রমণ উপভোগ করতে পারবেন। এর আগে গত বছরের একুশ জুন হাওরের পর্যটকদের জন্য বারো দফা নির্দেশনা জারি করা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে গত বছরের ছয় নভেম্বর সরকার টাঙ্গুয়ার হাওর ও হাকালুকি হাওর সুরক্ষা আদেশ জারি করেছিল। মূলত সেই সুরক্ষা আদেশের সফল বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতেই এই নতুন ত্রয়োদশ দফা নির্দেশনাগুলো কার্যকর করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসন কর্তৃক জারি করা তেরোটি নির্দেশনার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হাওরের সংরক্ষিত এলাকায় পর্যটকবাহী হাউসবোট ও নৌযান চলাচলের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং সকল নৌযানের জন্য বাধ্যতামূলক নিবন্ধন নিশ্চিত করা। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে অনুমতি ছাড়া কোনো ধরনের হাউসবোট বা পর্যটকবাহী নৌযান হাওরে পরিচালনা করা সম্পূর্ণ বেআইনি বলে গণ্য হবে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, হাওরের শান্ত পরিবেশ এবং জলজ প্রাণীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হাউসবোটে উচ্চ স্বরে গানবাজনা, লাউডস্পিকার বা মাইক বাজানো এবং যেকোনো ধরনের হৈচৈপূর্ণ পার্টির আয়োজন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া পরিবেশ দূষণ রোধে হাওর এলাকায় যেকোনো ধরনের একবার ব্যবহারযোগ্য বা সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক বহন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। নৌযানের যাত্রীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রতিটি নৌযানে আধুনিক পানি বিশুদ্ধকারী ফিল্টার রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে প্রতিটি হাউসবোটে অবশ্যই বাধ্যতামূলক সেপটিক ট্যাংক ও অন্তত দুটি ডাস্টবিন রাখতে হবে, যাতে হাওরের স্বচ্ছ জলে কোনোভাবেই কোনো ধরনের বর্জ্য বা ময়লা-আবর্জনা ফেলা না হয়।

নৌযানের আকার ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত নির্দেশিকায় বলা হয়েছে যে প্রতিটি হাউসবোটের দৈর্ঘ্য যেকোনো মূল্যে সর্বোচ্চ একশো ফুটের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে, যাতে অতিরিক্ত বড় নৌযানের কারণে হাওরের সরু জলপথ ও প্রতিবেশে বিরূপ প্রভাব না পড়ে। পর্যটকদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা রক্ষার্থে পর্যাপ্ত পরিমাণ লাইফ জ্যাকেট, লাইফবয় রিং, প্রয়োজনীয় অগ্নিনির্বাপণযন্ত্র এবং গ্যাস সিলিন্ডারের নিরাপদ ও সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। পর্যটকরা যাতে হাওরে এসে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ না করেন, সেজন্য তাদের জন্য একটি স্পষ্ট আচরণবিধি প্রতিটি নৌযানের দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শন করতে হবে এবং যাত্রা শুরু করার আগেই তা পর্যটকদের ভালোভাবে অবহিত করতে হবে। যেকোনো ধরনের জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস এবং নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি যোগাযোগের নম্বরগুলো নৌযানের সহজে দৃশ্যমান স্থানে ঝুলিয়ে রাখতে হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সেজন্য দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় পর্যটক পরিবহন সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হবে এবং ঝড়, প্রবল বৃষ্টিপাত কিংবা বজ্রপাতের আশঙ্কা দেখা দিলে পর্যটকদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নৌযানের আকার, আকৃতি ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত নির্দেশিকায় আরও বলা হয়েছে যে প্রতিটি হাউসবোটের দৈর্ঘ্য যেকোনো মূল্যে সর্বোচ্চ একশো ফুটের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে, যাতে অতিরিক্ত বড় আকারের নৌযানের কারণে হাওরের সরু জলপথ ও প্রতিবেশে কোনো ধরনের বিরূপ প্রভাব না পড়ে। পর্যটকদের জীবন ও মহামূল্যবান সম্পদ রক্ষার্থে পর্যাপ্ত পরিমাণ লাইফ জ্যাকেট, লাইফবয় রিং, প্রয়োজনীয় অগ্নিনির্বাপণযন্ত্র এবং রান্নার কাজে ব্যবহৃত গ্যাস সিলিন্ডারের নিরাপদ ও সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। পর্যটকরা যাতে হাওরে এসে কোনো ধরনের অসদুপায় অবলম্বন বা পরিবেশবিরোধী আচরণ না করেন, সেজন্য তাদের অনুসরণের জন্য একটি স্পষ্ট ও মার্জিত আচরণবিধি প্রতিটি নৌযানের সহজে দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শন করতে হবে এবং যাত্রা শুরু করার আগেই তা পর্যটকদের ভালোভাবে অবহিত করতে হবে। যেকোনো ধরনের জরুরি বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস এবং নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি যোগাযোগের নম্বরগুলো নৌযানের দৃশ্যমান স্থানে ঝুলিয়ে রাখতে হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে যাতে কোনো ধরনের প্রাণহানির ঘটনা না ঘটে, সেজন্য দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় পর্যটক পরিবহন সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হবে এবং ঝড়, প্রবল বৃষ্টিপাত কিংবা বজ্রপাতের আশঙ্কা দেখা দিলে পর্যটকদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এই নির্দেশনাগুলো অবিলম্বে কার্যকর করার ঘোষণা দিয়েছে জেলা প্রশাসন এবং একই সঙ্গে আগামী দশ আগস্টের মধ্যে সমস্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ নির্ধারিত ফরম পূরণ করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে হাউসবোটগুলোর নিবন্ধনের জন্য আবেদন করার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত এই সময়ের মধ্যে যদি কোনো নৌযানের মালিক আবেদন না করেন কিংবা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বৈধ অনুমতি গ্রহণ না করেন, তবে সেই নৌযান হাওরে পরিচালনা করার কোনো সুযোগ থাকবে না। প্রশাসনের এই কঠোর এবং সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপের ফলে টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্য, মাছের প্রজননক্ষেত্র এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দীর্ঘকাল ধরে অক্ষুণ্ণ থাকবে বলে সংশ্লিষ্টরা দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত