শেখ হাসিনার চলে যাওয়া অলৌকিক মনে হচ্ছিল’: মির্জা ফখরুল

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ৪ বার

প্রকাশ: ৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ছাত্র-জনতার টানা ৩৬ দিনের আন্দোলনের পর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি সামনে রেখে বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সেই সময়ের নানা স্মৃতি, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তাঁর ভাষায়, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার ঘটনা তখন “অলৌকিক” বলেই মনে হয়েছিল।

একটি জাতীয় দৈনিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মির্জা ফখরুল বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা একটি সরকারের এত দ্রুত পতন ঘটবে—এমনটি অনেকেই কল্পনা করেননি। তাঁর দাবি, আন্দোলনের প্রতিটি দিন ছিল অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ এবং জনগণের প্রবল প্রত্যাশায় পরিপূর্ণ। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায়, যেখানে সরকারের ক্ষমতায় টিকে থাকা সম্ভব হয়নি।

বিএনপির মহাসচিব বলেন, আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে দেশজুড়ে যে জনসম্পৃক্ততা তৈরি হয়েছিল, তা ছিল নজিরবিহীন। তাঁর মতে, শিক্ষার্থী, তরুণ, পেশাজীবী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ আন্দোলনকে একটি সর্বজনীন রূপ দেয়। তিনি বলেন, আন্দোলনের গতি ও বিস্তার এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে।

তিনি স্মরণ করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ তাঁদের কাছেও অনেকটা অবিশ্বাস্য ছিল। শেখ হাসিনার ক্ষমতা ছেড়ে চলে যাওয়ার খবর যখন আসে, তখন সেটি প্রথমে বিশ্বাস করাই কঠিন ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ থাকা একটি সরকারের এমন দ্রুত পতন অনেকের কাছেই “অলৌকিক” মনে হয়েছিল।

সাক্ষাৎকারে মির্জা ফখরুল আন্দোলনের সময় নিহত ও আহতদের প্রতিও শ্রদ্ধা জানান। তিনি বলেন, যাঁরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে জীবন দিয়েছেন বা আহত হয়েছেন, তাঁদের আত্মত্যাগ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর মতে, সেই আন্দোলনের মূল শক্তি ছিল সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা এবং তরুণদের নেতৃত্ব।

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, সরকার পরিবর্তনের পর জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেড়েছে। তাঁর মতে, শুধু সরকার পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়; রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং গণতান্ত্রিক চর্চা শক্তিশালী করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, জনগণ এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা চায়, যেখানে আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত থাকবে।

নির্বাচন প্রসঙ্গে বিএনপির মহাসচিব বলেন, একটি গ্রহণযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক এবং অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমেই দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতের নির্বাচনী ব্যবস্থা এমন হবে যেখানে সব রাজনৈতিক দল সমান সুযোগ পাবে এবং জনগণ অবাধে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে।

রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে মির্জা ফখরুল বলেন, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, নির্বাচন ব্যবস্থা এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে আরও কার্যকর ও নিরপেক্ষ করার উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে হবে। তাঁর মতে, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তোলাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নয়, বরং জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে দেশ পরিচালনা করা প্রয়োজন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিভাজন দেশের উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করেছে। তাই মতভেদ থাকলেও জাতীয় স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ ও সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি।

২০২৪ সালের আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি বলেন, তরুণ সমাজ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচনা করেছে। তবে তিনি একই সঙ্গে উল্লেখ করেন, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে রাজনৈতিক সচেতনতা, সাংবিধানিক মূল্যবোধ এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী করতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিকে ঘিরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মূল্যায়ন ও বক্তব্য সামনে আসছে। কেউ ঘটনাটিকে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলন হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ রাজনৈতিক পালাবদলের একটি ঐতিহাসিক অধ্যায় হিসেবে মূল্যায়ন করছেন। ফলে এই সময়ের ঘটনাগুলো নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক ও আলোচনা এখনও অব্যাহত রয়েছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মির্জা ফখরুলের এই সাক্ষাৎকার শুধু অতীতের ঘটনাকে স্মরণ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, রাষ্ট্র সংস্কার, নির্বাচন এবং ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক কাঠামো নিয়েও তাঁর দলের অবস্থান তুলে ধরেছে। বিশেষ করে দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিকে কেন্দ্র করে দেওয়া এই মন্তব্যগুলো আগামী দিনের রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

এদিকে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক মহলের মতে, ২০২৪ সালের আন্দোলন ও সরকার পরিবর্তন নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজের মূল্যায়ন এক নয়। ফলে এ বিষয়ে ভিন্নমত ও বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত, ইতিহাসের এই অধ্যায়কে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য, নথিভুক্ত তথ্য এবং স্বাধীন গবেষণার ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত আলোচনা প্রয়োজন হবে।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত