আফগান যুদ্ধের পাঁচ বছর: ইতিহাস কি আবারও ফিরছে?

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ৫ বার

প্রকাশ: ৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বাহিনী প্রত্যাহারের পাঁচ বছর পূর্ণ হচ্ছে চলতি আগস্টে। ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট তালেবান কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর যে নাটকীয় ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, তা শুধু আফগানিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসই বদলে দেয়নি, বরং যুক্তরাষ্ট্রের দুই দশকের সামরিক অভিযান, রাষ্ট্রগঠন প্রচেষ্টা এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তানীতির কার্যকারিতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছিল। পাঁচ বছর পর সেই ঘটনার মূল্যায়নে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আফগানিস্তান আজও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘চিরন্তন যুদ্ধ’ বা Forever War-এর সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার পর আল-কায়েদাকে নির্মূল এবং তালেবান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্য নিয়ে আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো জোট। প্রথমদিকে অভিযান সফল মনে হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধের লক্ষ্য বদলাতে থাকে। সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান ধীরে ধীরে রাষ্ট্র পুনর্গঠন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং নিরাপত্তা বাহিনী গঠনের দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে পরিণত হয়। কিন্তু দুই দশকের বিপুল ব্যয় ও সামরিক উপস্থিতির পরও ২০২১ সালে তালেবানের পুনরায় ক্ষমতায় ফেরা সেই পুরো কৌশলকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

বিশ্লেষকদের মতে, কাবুল থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের দৃশ্য আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত সামরিক ও কূটনৈতিক মুহূর্ত। বিমানবন্দরে হাজারো মানুষের ভিড়, দেশত্যাগের মরিয়া চেষ্টা, বিদেশি নাগরিক ও আফগান সহযোগীদের সরিয়ে নেওয়ার ব্যস্ততা এবং আত্মঘাতী হামলায় বহু মানুষের প্রাণহানি বিশ্বজুড়ে গভীর আলোচনার জন্ম দেয়। অনেক পর্যবেক্ষক এই দৃশ্যের সঙ্গে ১৯৭৫ সালে ভিয়েতনামের সায়গন থেকে মার্কিন বাহিনীর প্রত্যাহারের ঐতিহাসিক ঘটনার তুলনা করেন।

যুদ্ধের মানবিক মূল্য ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। সরকারি ও গবেষণা সংস্থার বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, আফগানিস্তানে দুই দশকের সংঘাতে দুই হাজার চারশোর বেশি মার্কিন সেনা এবং প্রায় ৪৫০ ব্রিটিশ সেনা নিহত হন। পাশাপাশি হাজার হাজার আফগান নিরাপত্তা সদস্য এবং বিপুলসংখ্যক বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারান। প্রকৃত বেসামরিক নিহতের সংখ্যা আজও নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং কোটি মানুষের জীবন-জীবিকায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়েছে।

যদিও আল-কায়েদার সাংগঠনিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল করা হয়েছিল, তবু তালেবানের পুনরায় ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন পশ্চিমা সামরিক কৌশলের কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো অভিযোগ করেছে, তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর বিশেষ করে নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং নাগরিক স্বাধীনতার ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। যদিও তালেবান প্রশাসন তাদের শাসনব্যবস্থাকে দেশের নিরাপত্তা ও ইসলামী মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে দাবি করে।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওয়ার কলেজের অধ্যাপক এবং আফগানিস্তানে দায়িত্ব পালনকারী সাবেক বেসামরিক উপদেষ্টা কার্টার মালকাসিয়ান সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে বলেন, আফগানিস্তানে দীর্ঘ সময় সেনা রাখার অন্যতম প্রধান যুক্তি ছিল দেশটি আবার আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হতে পারে। তবে তাঁর মূল্যায়ন অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে আফগানিস্তানভিত্তিক কোনো গোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলা চালাতে সক্ষম হয়নি। তাঁর মতে, যুদ্ধের মাধ্যমে যে হুমকির কথা তুলে ধরা হয়েছিল, বাস্তবে তার অনেকটাই অতিরঞ্জিত ছিল।

ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ‘কস্টস অব ওয়ার’ প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন এবং পাকিস্তানজুড়ে নাইন-ইলেভেন-পরবর্তী সংঘাতে আনুমানিক ৯ লাখ ৪০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। গবেষকরা আরও উল্লেখ করেছেন, যুদ্ধের পরোক্ষ প্রভাব—যেমন স্বাস্থ্যসেবা ভেঙে পড়া, খাদ্যসংকট, বাস্তুচ্যুতি এবং অবকাঠামো ধ্বংসের কারণে—মৃত্যুর সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা শুধু সেই দেশেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০০৩ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সামরিক অভিযানও একই ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি করে। সে সময় ইরাকে গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার যে দাবি করা হয়েছিল, পরবর্তী তদন্তে তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গোয়েন্দা তথ্যের ব্যবহার, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং যুদ্ধ শুরুর যৌক্তিকতা নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রশ্ন তৈরি হয়।

বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে অনেক বিশেষজ্ঞ আশঙ্কা প্রকাশ করছেন যে, অতীতের ভুল থেকে বিশ্ব কতটা শিক্ষা নিয়েছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনা এবং ইরানকে ঘিরে নিরাপত্তা ইস্যুতে কিছু বিশ্লেষক আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তির ঝুঁকির কথা উল্লেখ করছেন। তবে এ বিষয়ে বিভিন্ন দেশের সরকার এবং বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। কেউ মনে করেন বর্তমান পরিস্থিতি অতীতের তুলনায় ভিন্ন, আবার কেউ সতর্ক করছেন দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের সম্ভাবনা সম্পর্কে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, যে কোনো সামরিক হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—স্পষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য, বাস্তবসম্মত কৌশল এবং একটি কার্যকর ‘এক্সিট স্ট্র্যাটেজি’। আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, এসব উপাদানের ঘাটতি থাকলে সামরিক সাফল্যও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই রাজনৈতিক সমাধানে রূপ নেয় না।

একই সঙ্গে অর্থনৈতিক ব্যয়ের বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, আফগান যুদ্ধ পরিচালনায় যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় ট্রিলিয়ন ডলারের ঘরে পৌঁছেছে। এই বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় দেশটির নীতিনির্ধারণী মহলেও যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সমালোচনা বেড়েছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, আফগানিস্তানের ঘটনাপ্রবাহ ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। সামরিক শক্তি দিয়ে রাজনৈতিক সংকটের স্থায়ী সমাধান সব সময় সম্ভব হয় না। স্থানীয় বাস্তবতা, জনগণের আস্থা, কার্যকর প্রতিষ্ঠান এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া কোনো রাষ্ট্রে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত কঠিন।

পাঁচ বছর পর কাবুল থেকে মার্কিন বাহিনীর প্রত্যাহারকে অনেকেই একটি ঐতিহাসিক মোড় হিসেবে দেখছেন। কারও মতে এটি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘতম যুদ্ধের সমাপ্তি, আবার কারও মতে এটি একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রগঠন প্রকল্পের প্রতীক। তবে একটি বিষয়ে প্রায় সব বিশ্লেষকেরই ঐকমত্য রয়েছে—আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক সামরিক হস্তক্ষেপ, পররাষ্ট্রনীতি এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা কৌশল নির্ধারণে দীর্ঘদিন প্রভাব ফেলবে।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত