ঢাকার নৌপথে ফিরছে ওয়াটার বাস, জানালেন নৌমন্ত্রী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২ আগস্ট, ২০২৬
  • ১ বার

প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর ক্রমবর্ধমান যানজট কমানো, বিকল্প গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং নদীকেন্দ্রিক পর্যটনের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর লক্ষ্যে ঢাকার চারপাশের চক্রাকার নৌপথে আবারও ওয়াটার বাস চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এবার সরকারি সংস্থার পরিবর্তে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করে আধুনিক ও টেকসই ব্যবস্থাপনায় এ সেবা চালুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, যথাযথ পরিকল্পনা, পরিবেশ উন্নয়ন এবং যাত্রীবান্ধব পরিচালনা নিশ্চিত করা গেলে রাজধানীর যাতায়াতে নতুন মাত্রা যোগ হবে।

রোববার (২ আগস্ট) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান সড়ক ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি বলেন, আগামী দুই মাসের মধ্যে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার কাজ শেষ করা হবে। এরপর ধাপে ধাপে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণে ঢাকার চক্রাকার নৌপথে ওয়াটার বাস চালুর উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হবে।

মন্ত্রী বলেন, রাজধানীর চারপাশে নদী থাকলেও এখনো সেই নৌপথকে নগর পরিবহনের কার্যকর বিকল্প হিসেবে পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। অথচ পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা করা গেলে সড়কের ওপর চাপ কমবে, যাত্রীদের জন্য নতুন পরিবহন সুবিধা সৃষ্টি হবে এবং নদীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বাড়বে। সরকার এ বিষয়টিকে দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিবহন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে।

তিনি জানান, আশুলিয়া থেকে সদরঘাট হয়ে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত নদীপথের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যাত্রী চলাচলের জন্য তুলনামূলকভাবে উপযোগী। তবে পুরো চক্রাকার নৌপথে এখনো বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামোগত ও পরিবেশগত প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। কোথাও নাব্যতার সমস্যা, কোথাও নদীদূষণ, আবার কোথাও প্রয়োজনীয় জেটি ও যাত্রীসুবিধার ঘাটতি রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধান না করলে কাঙ্ক্ষিত যাত্রীসেবা নিশ্চিত করা কঠিন হবে।

শেখ রবিউল আলম বলেন, রাজধানীতে মানুষ সাধারণত দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে চান। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে সড়কপথে দেড় থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যে যাতায়াত সম্ভব হলেও একই দূরত্ব নদীপথে অতিক্রম করতে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগে। ফলে অনেক যাত্রী নদীপথ ব্যবহার করতে আগ্রহী হন না। এ বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে নৌপথকে আরও দ্রুত, আরামদায়ক এবং সময়সাশ্রয়ী করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, অতীতে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) ঢাকায় ওয়াটার বাস পরিচালনা করেছিল। শুরুতে সাধারণ মানুষের আগ্রহ থাকলেও সময়ের সঙ্গে যাত্রীসংখ্যা কমে যায়। পাশাপাশি পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি, নদীদূষণ এবং আয়-ব্যয়ের ভারসাম্যহীনতার কারণে সংস্থাটি দীর্ঘ সময় লোকসানের মুখে পড়ে। গত এক দশকে ওয়াটার বাস পরিচালনায় প্রায় ৫৭ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হওয়ায় শেষ পর্যন্ত সেবা বন্ধ করতে বাধ্য হয় বিআইডব্লিউটিসি।

এবারের পরিকল্পনায় অতীতের সেই অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী। তার ভাষ্য, কয়েকজন বেসরকারি উদ্যোক্তা ইতোমধ্যে ওয়াটার বাস পরিচালনায় আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তারা শুধু যাত্রী পরিবহন নয়, বরং নদীকেন্দ্রিক বিনোদন, পর্যটন এবং অবকাশ কার্যক্রমের সম্ভাবনাকেও কাজে লাগাতে চান। ফলে এই উদ্যোগ বাণিজ্যিকভাবে টেকসই হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

তিনি বলেন, কার্যকর গণপরিবহন হিসেবে ওয়াটার বাস জনপ্রিয় করতে হলে নির্দিষ্ট সময় পরপর নৌযান ছাড়তে হবে। যাত্রীদের দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হলে তারা এই সেবা গ্রহণে আগ্রহ হারাবেন। এজন্য ১৫ থেকে ২০ মিনিট অন্তর ওয়াটার বাস পরিচালনার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। তবে এর জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক নৌযান, দক্ষ জনবল এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পরিচালন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য নিশ্চিত করতে না পারলে অতীতের মতো আবারও লোকসানের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

নদীদূষণকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে নৌপরিবহনমন্ত্রী বলেন, দুর্গন্ধ, ভাসমান আবর্জনা এবং দূষিত পরিবেশের কারণে অনেক মানুষ নদীপথে ভ্রমণে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। তাই ওয়াটার বাস চালুর পাশাপাশি নদী পরিষ্কার রাখা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, দুই তীরের পরিবেশ উন্নয়ন এবং নদীকেন্দ্রিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি করাও সরকারের অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে। পরিষ্কার ও মনোরম নদী ছাড়া এ উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে সফল হবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, বিশ্বের অনেক বড় শহরে নদীপথ গণপরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সড়ক ও রেলপথের পাশাপাশি জলপথের কার্যকর ব্যবহার যানজট কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে সফলতা নির্ভর করবে সময়নিষ্ঠ সেবা, নিরাপত্তা, সহজ টিকিট ব্যবস্থা, উন্নত জেটি এবং পরিবেশবান্ধব পরিচালনার ওপর।

পরিবহন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রাজধানীর জনসংখ্যা এবং যানবাহনের চাপ বিবেচনায় বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিকল্প নেই। ওয়াটার বাস কার্যকরভাবে পরিচালিত হলে কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী এবং পর্যটকদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি নদীকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটন খাতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য আগামী কয়েক মাসে সম্ভাব্য রুট, যাত্রী চাহিদা, অবকাঠামো উন্নয়ন, পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ এবং বেসরকারি বিনিয়োগের বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে ওয়াটার বাস পরিচালনার কার্যক্রম শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত