প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, পেশাদার, মানবিক ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, পুলিশ কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর লাঠিয়াল বাহিনী নয়। এটি রাষ্ট্রের একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, যার প্রধান দায়িত্ব জনগণের জানমাল রক্ষা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তাই প্রতিটি পুলিশ সদস্যকে নিরপেক্ষতা, সততা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
রোববার (২ আগস্ট) সকালে রাজশাহীর সারদায় বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমিতে ২৭তম বিসিএস (পুলিশ) ব্যাচের প্রথম পর্যায়ের শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ সুপারদের ছয় মাস মেয়াদি মৌলিক প্রশিক্ষণের সমাপনী কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সময়ের অপরাধের ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রচলিত অপরাধের পাশাপাশি সাইবার অপরাধ, ডিজিটাল প্রতারণা, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর জালিয়াতি এবং আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের তৎপরতা বেড়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পুলিশ সদস্যদের আধুনিক প্রযুক্তি সম্পর্কে দক্ষ হতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে ভবিষ্যৎ পুলিশিংয়ের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
তিনি নবীন পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, জনগণের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা একটি আধুনিক পুলিশের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সাধারণ মানুষ যেন থানায় বা অন্য কোনো পুলিশি সেবা নিতে গিয়ে হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। একজন নাগরিকের প্রতি সম্মান, মানবিক আচরণ এবং দ্রুত সেবা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। সেই নীতির অংশ হিসেবে পুলিশ বাহিনীতেও দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা বা জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হবে। কোনো সদস্য যদি ক্ষমতার অপব্যবহার করেন বা অনিয়মে জড়ান, তাহলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি সততা, জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, অতীতের কিছু ঘটনার কারণে পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাহিনীকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে হবে। জনগণের বিশ্বাস ও আস্থা পুনরুদ্ধার করতে হলে প্রতিটি পুলিশ সদস্যকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বৈষম্য বা পক্ষপাতের সুযোগ নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি মানবাধিকার, সংবিধান এবং আইনের শাসন সমুন্নত রাখার দায়িত্বও পুলিশের। তাই বাহিনীর প্রতিটি সদস্যকে সংবিধানের প্রতি আনুগত্য বজায় রেখে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নবীন কর্মকর্তারা তাদের কর্মজীবনে পেশাদারিত্ব, সততা এবং মানবিক মূল্যবোধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবেন।
সমাপনী কুচকাওয়াজের মধ্য দিয়ে ২৭তম বিসিএস (পুলিশ) ব্যাচের প্রথম পর্যায়ের ৫৮ জন শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ সুপারের ছয় মাসব্যাপী মৌলিক প্রশিক্ষণ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়। ২০২৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তারা মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় শারীরিক সক্ষমতা, আইনগত জ্ঞান, নেতৃত্বের দক্ষতা এবং আধুনিক পুলিশিং কৌশল সম্পর্কে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এই কুচকাওয়াজের মাধ্যমে তারা বাস্তব কর্মজীবনে প্রবেশের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেন।
বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির প্যারেড গ্রাউন্ডে আয়োজিত অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নবীন কর্মকর্তাদের অভিবাদন গ্রহণ করেন। পরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃতিত্ব অর্জনকারী প্রশিক্ষণার্থীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন। প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজে প্যারেড কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ সুপার ড. মো. নূরুল হুদা ভূঁইয়া। তিনি প্রশিক্ষণের সার্বিক সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে ‘বেস্ট প্রবেশনার’ এবং ‘বেস্ট ইন ফিল্ড অ্যাক্টিভিটিজ’—এই দুটি সম্মাননা অর্জন করেন।
এ ছাড়া ‘বেস্ট একাডেমিক অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ সুপার আবু নুমান মোহাম্মদ খাইরুল ইসলাম। ‘বেস্ট শ্যুটার’ হিসেবে স্বীকৃতি পান শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ সুপার এ বি এম মামুন। প্রশিক্ষণে তাদের অসাধারণ সাফল্য অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিদের প্রশংসা অর্জন করে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির এবং বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির প্রিন্সিপ্যাল অতিরিক্ত আইজিপি জিএম আজিজুর রহমান। তারা নবীন কর্মকর্তাদের অভিনন্দন জানিয়ে দায়িত্ব পালনে সততা, নিষ্ঠা এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা বজায় রাখার আহ্বান জানান।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের বিস্তার, সাইবার নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ এবং নাগরিকবান্ধব পুলিশিংয়ের প্রয়োজনীয়তার প্রেক্ষাপটে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য নতুন পুলিশ কর্মকর্তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হবে। বিশেষ করে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, জবাবদিহিমূলক এবং মানবিক পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলার যে প্রত্যাশা তিনি ব্যক্ত করেছেন, তা বাস্তবায়িত হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং জনগণের আস্থা বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।