প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বৈশ্বিক ভূরাজনীতির দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের সমীকরণ প্রতিনিয়ত নতুন রূপ লাভ করছে। এই গতিশীল ধারার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় ও বহুমাত্রিক সম্পর্ক বর্তমানে এক অত্যন্ত সন্তোষজনক ও ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে বলে জোরালোভাবে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। দুই দেশের কূটনৈতিক মৈত্রী এবং পারস্পরিক অংশীদারত্বকে আগামী দিনগুলোতে আরও বেশি সুদৃঢ়, গভীর ও বেগবান করার জন্য উভয় দেশের নীতিনির্ধারকরা অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গরের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ ও ফলপ্রসূ বৈঠকের সর্বশেষ পরিস্থিতি গণমাধ্যমের সামনে বিস্তারিত তুলে ধরার সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই আশাবাদ ব্যক্ত করেন। বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই ওয়াশিংটন ও ঢাকার মধ্যকার পারস্পরিক আস্থার যে সেতুবন্ধন রচিত হয়েছে, এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকটি সেই ধারাবাহিক কূটনৈতিক সম্পর্কেরই একটি নতুন ও ফলপ্রসূ অধ্যায় বলে সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক মহল মনে করছে।
গত সপ্তাহের শেষ দিকে ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গরের সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। শুধু তাই নয়, সেই একই সফরে তিনি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গেও ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাৎ করে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে বিস্তারিত মতবিনিময় করেছিলেন। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই সম্প্রতি ঢাকায় বা সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক চ্যানেলে অনুষ্ঠিত এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকটি দুই দেশের সম্পর্ককে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, দুই দেশের মধ্যকার বর্তমান এই পারস্পরিক সম্পর্ক অত্যন্ত ইতিবাচক একটি অভিমুখে বা ঠিকানার দিকে এগিয়ে চলেছে এবং আগামী দিনগুলোতে এই মৈত্রী ও সহযোগিতার পরিধি আরও বহুগুণ বাড়িয়ে তুলতে দুই পক্ষই সমানভাবে উন্মুখ হয়ে কাজ করছে। অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব এবং কৌশলগত সহযোগিতার ক্ষেত্রে এই ইতিবাচক ধারা দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় এক বিশাল ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আমেরিকার বিশেষ দূতের সঙ্গে এই সাম্প্রতিক সফরে ঠিক কী ধরনের বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ সম্পর্কে মূলত কী জানতে চেয়েছে, এমন সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় জানান যে, এই বৈঠকে দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের প্রায় সব কটি গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর বিষয়ই অত্যন্ত খোলামেলাভাবে আলোচনায় স্থান পেয়েছে। বিশেষ করে দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্য সম্পর্ক প্রসার, সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি, জ্বালানি খাতের উন্নয়ন এবং অভিবাসন ব্যবস্থাপনার মতো জনগুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে তিনি এটিও স্পষ্ট করে উল্লেখ করেন যে, এটি মূলত একটি স্বল্পপরিসরের কিন্তু অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বৈঠক ছিল, যার ফলে কোনো নির্দিষ্ট বা জটিল বিষয়ে গভীর ও বিস্তারিত পর্যালোচনার চেয়ে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের সার্বিক দিকনির্দেশনা এবং সামগ্রিক রূপরেখা নিয়ে সৌহার্দ্যপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। বিশ্ববাণিজ্যের এই প্রতিযোগিতামূলক বাজারে আমেরিকার সঙ্গে বাংলাদেশের এই নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে আরও বেশি মজবুত করবে।
দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের একটি অন্যতম প্রধান দৃষ্টান্ত তুলে ধরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বোয়িং উড়োজাহাজ ক্রয় সংক্রান্ত বহুল আলোচিত বিষয়ের ইতি টানেন। তিনি জানান যে, বাংলাদেশ সরকার কেবল রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মাধ্যমেই এককভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িং উড়োজাহাজ ক্রয় করছে না, বরং দেশের উদীয়মান বেসরকারি বিমান চলাচল প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকেও নিয়মিতভাবে বোয়িং উড়োজাহাজ ক্রয় করা হচ্ছে। এই বহুমুখী বাণিজ্যিক লেনদেন দুই দেশের মধ্যকার সুদৃঢ় অর্থনৈতিক সহযোগিতারই একটি অত্যন্ত উজ্জ্বল ও ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হচ্ছে। এর পাশাপাশি সবচেয়ে বড় মানবিক সংকটের জায়গা অর্থাৎ লাখ লাখ বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গার পুনর্বাসন ও সহায়তার বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে মায়ানমার থেকে জোরপূর্বক বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশ যে বিশাল পরিমাণ মানবিক সহায়তা পেয়ে থাকে, তার অর্ধেকেরও বেশি আসে একমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। তিনি জোরালো আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, ভবিষ্যতেও বিশ্বমানবতার স্বার্থে ওয়াশিংটন এই মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখবে।
আমেরিকার নতুন শুল্ক বা ট্যারিফ ব্যবস্থা নিয়ে বিশ্ববাজার ও দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে অতীতে যে নানামুখী বিভ্রান্তি বা সংশয় কাজ করছিল, তার একটি সুন্দর ও যৌক্তিক ব্যাখ্যা প্রদান করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে শুরুতে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের ওপর ১৯ শতাংশ শুল্ক আরোপ করার কথা ভাবা হলেও পরবর্তী সময়ে দেশটির সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট আইনি রায় ও সামগ্রিক পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট বাণিজ্য আইনের আওতায় দীর্ঘ তদন্ত প্রক্রিয়া পরিচালিত হওয়ার পর বাংলাদেশের জন্য তুলনামূলকভাবে অত্যন্ত সুবিধাজনক মাত্র ১০ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। অথচ বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল ও উদীয়মান দেশকেই যেখানে ১২ বা সাড়ে ১২ শতাংশ পর্যন্ত উচ্চ শুল্কের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশের জন্য ১০ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ দেশের রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য এক বিরাট স্বস্তির খবর। এর চেয়েও বড় ও ঐতিহাসিক অর্জন হলো, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য একটি বিশেষ ট্যারিফ কোটা ব্যবস্থা বা কোটাভিত্তিক শুল্ক সুবিধা চালু করেছে, যার মাধ্যমে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকে যদি মার্কিন উৎপাদিত তুলা কিংবা ম্যান-মেইড ফাইবার বা কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করা হয়, তবে বাংলাদেশ আমেরিকার বিশাল বাজারে আরও অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক ও সুবিধাজনক প্রবেশাধিকার লাভ করবে।
মানবাধিকার সুরক্ষা এবং অতীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী র্যাবের ওপর আরোপিত বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানান যে, বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার দেশের প্রতিটি নাগরিকের মানবাধিকার সুরক্ষার বিষয়ে শুরু থেকেই অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে ও আপসহীনভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রয়েছে। এই সংবেদনশীল মানবাধিকার ইস্যু নিয়ে বাংলাদেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের মহলে নিয়মিত ও গঠনমূলক আলোচনা অব্যহত থাকে। তবে তিনি পরিষ্কার করে জানিয়ে দেন যে, এই সাম্প্রতিক বৈঠকে র্যাবের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বা এসংক্রান্ত অন্য কোনো সুনির্দিষ্ট বা কড়া আলোচ্যসূচি ছিল না, বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী ও ধারাবাহিক কূটনৈতিক প্রক্রিয়ারই অংশ হিসেবে বজায় রয়েছে। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক কোনো বিষয় যেমন সাবেক ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের অন্তর্ভুক্তি, অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র কিংবা বহুল আলোচিত মানবিক করিডোরের মতো স্পর্শকাতর রাজনৈতিক বিষয়গুলোও আজকের এই দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে উত্থাপিত বা আলোচিত হয়নি বলে তিনি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন।
আগামী ৮ সেপ্টেম্বর অত্যন্ত গৌরবের সঙ্গে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বা ইউএনজিএ একচল্লিশতম অধিবেশনের সম্মানিত সভাপতি হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছেন ড. খলিলুর রহমান। বিশ্ববাসীর এই সর্বোচ্চ কূটনৈতিক আসনে তাঁর বসার বিষয়টি মার্কিন বিশেষ দূতের সঙ্গে বৈঠকে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পেছনে আমেরিকার ঐতিহাসিক ও অগ্রণী ভূমিকার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন যে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির মতো এত বড় একটি বিশ্বজনীন দায়িত্ব সফলভাবে পালন করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, মতবিনিময় এবং পারস্পরিক পরামর্শ হওয়াটা অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং আগামী দিনগুলোতেও ওয়াশিংটনের সঙ্গে এই মেলবন্ধন ও সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। বর্তমান যুগ যেহেতু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এবং আধুনিক প্রযুক্তির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, সেহেতু বিশ্ব অর্থনীতি ও প্রযুক্তির নতুন এই বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে উভয় দেশ কীভাবে একসঙ্গে কাজ করতে পারে, তা নিয়েও প্রাজ্ঞ মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের এই সুদৃঢ় কূটনৈতিক অংশীদারত্ব আগামী দিনে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে এক যুগান্তকারী ও ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে বলেই দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা একবাক্যে বিশ্বাস করছেন।