ফরচুন গ্রুপের ২৫ প্লট বাতিল হয়নি কেন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬
  • ১ বার
ফরচুন গ্রুপের ২৫ প্লট বাতিল হয়নি কেন

প্রকাশ: ৩১ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দক্ষিণ জনপদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও শিল্পায়নের এক বিশাল স্বপ্ন বুক বেঁধে ঝালকাঠিতে গড়ে উঠেছিল বিসিক শিল্পনগরী। পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের মনে যে আশার আলো জেগে উঠেছিল, তা আজ নানা অনিয়ম, প্রভাব বিস্তার, প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা এবং অব্যবস্থাপনার কারণে অনেকটাই মুখ থুবড়ে পড়েছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত প্রভাবশালী এক নেতার রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে ঝালকাঠি বিসিক শিল্পনগরী আজ এক চরম স্থবিরতার শিকার হয়েছে। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে এবং কোনো ধরনের বৈধ অনুমোদন বা স্থানীয় চাহিদার তোয়াক্কা না করে তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমুর সরাসরি রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ফরচুন গ্রুপের নামে বরাদ্দ নেওয়া হয়েছিল বিশাল অঙ্কের জমি। অথচ বরাদ্দ পাওয়ার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও প্লট বাবদ কিস্তির প্রায় দেড় কোটি টাকা বকেয়া রাখা এবং সেখানে কোনো ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন না করার পরও বিসিক কর্তৃপক্ষের রহস্যজনক নীরবতা ও নমনীয় মনোভাব গোটা প্রশাসনিক কাঠামোর স্বচ্ছতা নিয়ে এক বিরাট প্রশ্নচিহ্নের জন্ম দিয়েছে।

বিসিক সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী জানা গেছে যে, ২০১৯ সালে অত্যন্ত আড়ম্বরপূর্ণ পরিবেশে ঝালকাঠিতে এই শিল্পনগরীটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সমগ্র শিল্পনগরীর মোট জমির পরিমাণ প্রায় এগারো দশমিক আট একর এবং এখানে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট বায়ান্নটি প্লট থাকার কথা থাকলেও মূলত মোট শিল্প প্লটের সংখ্যা ছিল উনআশিটি। এর মধ্যে নিয়মের চরম ব্যত্যয় ঘটিয়ে ২০২৩ সালে এককভাবে ফরচুন ইনভেনশন অ্যান্ড টেকনোলজি লিমিটেডের নামে এক লাখ সতেরো হাজার বর্গফুটের বিশাল আয়তনের ২৫টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। অথচ প্রচলিত বিসিকের নিজস্ব নিয়ম অনুযায়ী কোনো একটি প্রতিষ্ঠানকে সর্বোচ্চ পনেরো হাজার বর্গফুটের প্লট বরাদ্দ দেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু তৎকালীন সৈনিক লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও বরিশাল মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং বিতর্কিত ফরচুন সুজ কোম্পানির চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান সেই সমস্ত নিয়মের তোয়াক্কা না করে সরাসরি তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমুর ক্ষমতার জোর দেখিয়ে মন্ত্রণালয় থেকে এক লাফে এই বিশাল পরিমাণ প্লট বাগিয়ে নেন। আর এর মাধ্যমেই ঝালকাঠি বিসিক শিল্পনগরীর মোট প্লটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জায়গা চলে যায় একটিমাত্র প্রভাবশালী গ্রুপের মুঠোয়।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এত বিশাল পরিমাণ জমি বরাদ্দ নেওয়া হলেও আজ পর্যন্ত সেখানে কোনো ধরনের কলকারখানা বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ন্যূনতম কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, ফলে পুরো জমিটাই বছরের পর বছর ধরে সম্পূর্ণ ফাঁকা ও অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। নিয়মানুযায়ী বরাদ্দ পাওয়ার পরপরই শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের জন্য যথাযথ লেআউট বা নকশা দাখিল করার কথা থাকলেও ফরচুন গ্রুপের পক্ষ থেকে তা করা হয়নি। এর পাশাপাশি জমির কিস্তির টাকা বাবদ সরকারের বকেয়া থাকা প্রায় এক কোটি চুয়াল্লিশ লাখ টাকা পরিশোধ করার জন্য বিসিক কর্তৃপক্ষ একাধিকবার তাগাদাপত্র ও নোটিস পাঠালেও মালিকপক্ষ বরাবরই তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে গেছে। শুধু ঝালকাঠির এই বিসিক শিল্পনগরীই নয়, এর আগে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত অন্যতম বৃহৎ প্রতিষ্ঠান ফরচুন সুজ লিমিটেডের বিরুদ্ধে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ বিতরণ না করা এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের বা বিএসইসির তালিকাভুক্তি ফি পরিশোধ করতে ব্যর্থ হওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান, পরিচালক ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের জরিমানা আরোপ করা হয়েছিল এবং অবিলম্বে বকেয়া ফি পরিশোধের কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

ঝালকাঠি বিসিক শিল্পনগরীর সার্বিক বর্তমান চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, এই প্রকল্পের প্রকৃত লক্ষ্য কতটা ব্যাহত হয়েছে। মোট উনআশিটি প্লটের মধ্যে ফরচুন গ্রুপের দখলেই রয়েছে পঁচিশটি প্লট। এছাড়া বাকি চৌান্নটি প্লটের মধ্যে মাত্র আটাশটি প্লটে এগারোটি ছোট-বড় শিল্প ইউনিট কোনো রকমে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করতে পেরেছে। বাকি ছাব্বিশটি প্লট কাগজে-কলমে বিভিন্ন উদ্যোক্তার নামে বরাদ্দ দেখানো হলেও বাস্তবে সেগুলোর অবস্থাও সম্পূর্ণ ফাঁকা। এর মধ্যে আবার নতুন করে কোনো উদ্যোক্তা নিতে আগ্রহ প্রকাশ না করায় আরও পাঁচটি প্লটের বরাদ্দ বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। এই হিসাব কষে দেখলে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, মোট উনআশটি প্লটের মধ্যে ফরচুনের পঁচিশটি এবং অন্যান্য অব্যবহৃত ছাব্বিশটিসহ মোট একান্নটি প্লটই আজ সম্পূর্ণ খালি পড়ে রয়েছে। চালু থাকা বাকি শিল্প ইউনিটগুলোর মধ্যে মাত্র দুই-তিনটি বাদ দিলে অধিকাংশেরই উৎপাদন কার্যক্রম অত্যন্ত ধীরগতিতে চলছে। ১১.৮ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এই শিল্পনগরীতে বর্তমানে মাত্র চৌত্রিশটি শিল্প ইউনিট রয়েছে, যার মাধ্যমে মোটে একশ চৌদ্দ জন মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পেরেছে। অথচ শুরুতেই যে স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, তার ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেনি এই প্রকল্প।

স্থানীয় ও প্রশাসনিক পর্যায়ে এ বিষয়ে কথা বললে নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা ও অব্যবস্থাপনার চিত্র উঠে আসে। ঝালকাঠি বিসিক শিল্পনগরীর কর্মকর্তা আল আমিন গণমাধ্যমকে জানান যে, তাঁদের এই অঞ্চলটি নদীমাতৃক হওয়া সত্ত্বেও মূল শিল্পনগরী এলাকার সঙ্গে নদীর কোনো ধরনের সরাসরি সংযোগ বা যোগাযোগ না থাকায় ভারী শিল্প উদ্যোক্তারা এখানে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হননি। তাছাড়া এত ক্ষুদ্র পরিসরে একটি আধুনিক শিল্পনগরী গড়ে তোলাও একধরনের বড় ভুল ছিল বলে তিনি মনে করেন। তিনি আরও জানান যে, পশ্চিম পাশের ইটের ভাটার জমি যথাযথভাবে অধিগ্রহণ করে যদি সুতালরী ব্রিজ পর্যন্ত এই শিল্পনগরীর পরিসর বর্ধিত করা সম্ভব হয়, তবেই ভবিষ্যতে বড় বড় শিল্প উদ্যোক্তারা এখানে আসতে আগ্রহী হতে পারেন। তাছাড়া ভবিষ্যতে পায়রা বন্দর পুরোপুরি চালু হলে এই অঞ্চলের শিল্পায়নে নতুন গতি আসতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তবে ছোট উদ্যোক্তাদের আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে তাঁদের যে একটি বড় ব্যর্থতা রয়েছে, তা তিনি অকপটে স্বীকার করেন। ফরচুন গ্রুপের প্লট বাতিলের বিষয়ে তিনি জানান যে, তাঁদের কাছ থেকে বকেয়া টাকা আদায়ের জন্য অফিসে গিয়ে বা ফোনে কোনোভাবেই যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না, কারণ তাদের কোনো সঠিক যোগাযোগের নম্বর বা লোক কারখানায় পাওয়া যায় না।

ঝালকাঠি জেলার সুযোগ্য জেলা প্রশাসক মোমিন উদ্দিন এই প্রসঙ্গে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, বিসিক কর্তৃপক্ষ স্থানীয় সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদের এই শিল্পনগরীর প্রতি যথেষ্ট পরিমাণে উদ্বুদ্ধ ও আকৃষ্ট করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। সরকার দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বেকারত্ব দূরীকরণের লক্ষ্যে ক্ষুদ্র থেকে মাঝারি শিল্প গড়ে তোলার জন্য প্লট বরাদ্দের ক্ষেত্রে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা ও প্রণোদনা দিলেও প্রকৃত উদ্যোক্তাদের মধ্যে এখানে প্লট নেওয়ার তেমন কোনো আগ্রহ লক্ষ করা যায়নি। এর ওপর আবার একজনমাত্র প্রভাবশালী উদ্যোক্তা ও ফরচুন কোম্পানির মালিকপক্ষ একসঙ্গে পঁচিশটি প্লਟ দখল করে নিয়েও সেখানে কোনো ধরনের দৃশ্যমান কাজ না করায় সমস্ত প্লট বছরের পর বছর ধরে অলস ও ফাঁকা পড়ে রয়েছে, যা এলাকার অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথে এক বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। জমির কিস্তির বিপুল পরিমাণ টাকা দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া পড়ে থাকায় তাদেরকে ইতিমধ্যে চূড়ান্ত নোটিস প্রদান করা হয়েছে এবং আগামী জেলা ও বিসিকের যৌথ মাসিক সভায় এ বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত