হাতের কাজের জুতায় বিশ্ববাজারে জায়গা করে নিচ্ছে তারাগঞ্জ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬
  • ১ বার
হাতের কাজের জুতায় বিশ্ববাজারে জায়গা করে নিচ্ছে তারাগঞ্জ

প্রকাশ: ৩১ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

একসময় যে জনপদটি তীব্র দারিদ্র্য, কর্মহীনতা এবং মঙ্গার অভিশাপের কারণে দেশজুড়ে পরিচিত ছিল, আজ সেই উত্তরাঞ্চলের অবহেলিত জনপদ এক অনন্য রূপান্তরের মধ্য দিয়ে এক উজ্জ্বল সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন করেছে। রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ঘনিরামপুর গ্রামটি অতীতে এমন একটি এলাকা ছিল যেখানে বছরের একটি দীর্ঘ সময় কাজের চরম অভাবে শত শত পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হতো। জীবিকার অন্বেষণে এ এলাকার পুরুষদের দেশের দূর-দূরান্তে ছুটে বেড়াতে হতো, আর নারীরা সংসারের ঘানি টানতে গিয়ে গৃহস্থালির চার দেওয়ালের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকতেন। কিন্তু সময়ের সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনে এবং দূরদর্শী এক শিল্প উদ্যোক্তার হাত ধরে সেই পরিচিত চিত্র আজ সম্পূর্ণ বদলে গেছে। ভোরের সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই আজ ওই গ্রামের শত শত নারী কাজের টানে প্রফুল্ল চিত্তে ছুটে যান কর্মস্থলে, যেখানে তাঁদের নিপুণ ও দক্ষ হাতে তৈরি হচ্ছে বিশ্বমানের সিনথেটিক জুতা। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জার্মানি, পোল্যান্ড ও তুরস্কসহ বিশ্বের উন্নত ও প্রভাবশালী বিভিন্ন দেশের বাজারের চাহিদা মিটিয়ে তারাগঞ্জের এই নারীদের তৈরি জুতা এখন আন্তর্জাতিক বাজারে সুনাম কুড়াচ্ছে। মঙ্গার চিরচেনা সেই প্রতীক ঘনিরামপুর গ্রামটি আজ দেশের রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন, ব্যাপক কর্মসংস্থান এবং নারী ক্ষমতায়নের এক অনন্য ও অনুকরণীয় মডেলে পরিণত হয়েছে।

রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে পাকা মহাসড়কের পাশেই নয়নাভিরাম পরিবেশে গড়ে উঠেছে এই রপ্তানিমুখী জুতা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান যার নাম ব্লিং লেদার প্রোডাক্টস। প্রায় সাড়ে নয় একর বিশাল জমির ওপর স্থাপিত এই শিল্পপ্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠার পেছনে রয়েছে এক স্বপ্নবাজ মানুষের অদম্য প্রয়াস। প্রবাসে সফল জীবন কাটিয়ে দেশে ফিরে আসা দুই ভাই প্রয়াত সেলিম ও হাসানুজ্জামান হাসান ২০১৭ সালে প্রায় আড়াইশো কোটি টাকারও বেশি বিশাল বিনিয়োগে এই কারখানাটি প্রতিষ্ঠা করেন। আজ সেই স্বপ্নের প্রকল্প পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করায় সেখানে নিয়মিত কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন প্রায় তিন হাজার মানুষ, যার মধ্যে অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে প্রায় আশি শতাংশ শ্রমিকই নারী। গ্রামের সাধারণ গৃহবধূ থেকে শুরু করে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েরা আজ স্বাবলম্বী হওয়ার পথে অনেক দূর এগিয়ে গেছেন। কারখানা চালুর পর কেবল এলাকার অর্থনৈতিক বুনিয়াদই মজবুত হয়নি, বরং সমাজের ভেতরে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি এবং গ্রামীণ সামাজিক বাস্তবতারও এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন ঘটেছে।

কারখানার ভেতরে কর্মরত নারী শ্রমিকদের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের পেছনের গল্পগুলো অত্যন্ত অনুপ্রেরণাদায়ক ও মানবিক আবেগে ভরপুর। কারখানার শ্রমিক কল্যাণ কর্মকর্তা জেসমিন আরা গণমাধ্যমকে জানান যে, এই কারখানাটি চালু হওয়ার পর থেকে এলাকার সামাজিক ও পারিবারিক চিত্র সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। স্থানীয় মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের হাজারো নারী এখন নিজের কষ্টের উপার্জিত অর্থ দিয়ে নিজ পরিবারে আর্থিক অবদান রাখছেন, যা তাদের পারিবারিক মর্যাদা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। নারী শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রকে নিরাপদ ও আরামদায়ক করতে কারখানা কর্তৃপক্ষ মাতৃত্বকালীন ছুটি, আধুনিক চিকিৎসাসেবা, নিয়মিত সুচিকিৎসা এবং দক্ষতা উন্নয়নের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের সুব্যবস্থা করেছে। কাটিং ইউনিটের অভিজ্ঞ শ্রমিক জয়ন্ত রানী তাঁর অনুভূতির কথা প্রকাশ করে জানান যে, শুরুর দিকে সুচ ও কাঁচির কাজ দেখে তাঁর ভেতরে একধরনের ভয় কাজ করেছিল এবং তিনি কখনো ভাবতেও পারেননি যে এত সূক্ষ্ম কাজ তিনি শিখতে পারবেন। কিন্তু আজ তিনি কেবল নিজেই কাজ শেখেননি, বরং নিজের উপার্জনে সংসার চালিয়ে সন্তানদের পড়ালেখার খরচ জোগান দিচ্ছেন এবং ভবিষ্যতের সুরক্ষার জন্য কিছু টাকা সঞ্চয় করতেও সক্ষম হয়েছেন।

প্যাকেজিং ইউনিটের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী আদুরি রানী জানান যে, অতীতে পেটের দায়ে তাকে রাজধানী ঢাকায় গিয়ে চাকরি করতে হতো, কিন্তু সেখানে জীবনযাত্রার ব্যয় এত বেশি ছিল যে কঠোর পরিশ্রম করেও কোনো সঞ্চয় করা সম্ভব হতো না। অথচ এখন নিজ গ্রামের বাড়িতে বসেই তিনি এই কারখানায় কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন। পরিবারের প্রিয়জনদের কাছে থেকে নিজের ঘরের নিরাপত্তা বজায় রেখে বাড়তি আয়ের মাধ্যমে তিনি নিজের বাড়িতে গবাদিপশু পালনও শুরু করেছেন, যা তাঁর পরিবারকে আরও স্বাবলম্বী করে তুলেছে। আরেক নারী শ্রমিক লাভলী বেগম অত্যন্ত আবেগাপ্লুত কণ্ঠে জানান যে, একসময় তাঁদের সংসার মানেই ছিল নিত্যদিনের ধারদেনা আর চরম অভাব অনটন। কিন্তু এখন প্রতি মাসে নিয়মিত বেতন পাওয়ার সুবাদে তিনি তাঁর অতীতের সব ঋণ সম্পূর্ণ শোধ করতে পেরেছেন এবং প্রতি মাসেই ভবিষ্যতের জন্য কিছু টাকা জমিয়ে রাখতে পারছেন। তবে এর চেয়েও বড় কথা হলো, অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা কাটিয়ে আজ তাঁরা সমাজের বুকে নিজের পরিচয়ে মাথা উঁচু করে গর্বের সঙ্গে চলতে পারছেন, যা তাঁদের আত্মমর্যাদাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

প্রতিষ্ঠানটির মানবসম্পদ ও প্রশাসন বিভাগের ব্যবস্থাপক আবদুল্লাহ আল ফারুক সরকার জানান যে, বর্তমানে এই কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের মধ্যে অন্তত পাঁচশো দশ জন শ্রমিক আগে ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য বড় বড় শিল্পাঞ্চলে চাকরি করতেন। নিজ এলাকায় এমন একটি আধুনিক ও বড় কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় তাঁরা রাজধানী ও অন্যান্য শহর ছেড়ে আপন ঠিকানায় ফিরে এসেছেন এবং এখন অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে এই কারখানায় কাজ করছেন। নতুন যারা কাজে যোগ দিচ্ছেন, তাদের জন্যও রয়েছে বিশেষ প্রশিক্ষণের সুব্যবস্থা, যার মাধ্যমে তাদের দক্ষ করে তোলা হয়। বর্তমানে এই কারখানায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় দশ হাজার জোড়া উন্নতমানের জুতা উৎপাদিত হচ্ছে। কারখানার সম্প্রসারণের কাজ পুরোপুরি শেষ হলে ভবিষ্যতে এখানে প্রায় চৌত্রিশ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, যার সিংহভাগ অর্থাৎ প্রায় ৮০ শতাংশই নারী শ্রমিক। গ্রামীণ জনপদের বেকারত্ব দূরীকরণে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ দেশের অর্থনীতিতে এক সুদূরপ্রসারী ও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন।

প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসানুজ্জামান হাসান তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানান যে, তাঁর প্রয়াত ভাইয়ের আজীবন স্বপ্ন ছিল গ্রামের সাধারণ ও অসহায় মানুষকে নিজের গ্রামের মাটিতেই কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়া। বিশেষ করে গ্রামীণ নারীরা যেন কারো মুখাপেক্ষী না হয়ে নিজ পায়ে স্বাবলম্বী হয়ে দাঁড়াতে পারেন, সেটাই ছিল তাঁদের মূল লক্ষ্য। অদূর ভবিষ্যতে তাঁরা দৈনিক পঞ্চাশ হাজার জোড়া জুতা উৎপাদনের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন এবং এর পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও তাদের ব্যবসার পরিধি ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান খাজা রেহান বখত গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে এটি একটি শতভাগ রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান, যেখানে আন্তর্জাতিক বাজারের ক্রেতাদের কঠোর মানদণ্ড ও চাহিদা অনুযায়ী বিদেশি বিশেষজ্ঞদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে জুতা উৎপাদন করা হয়। দেশীয় শিল্পের উৎকর্ষ সাধনে অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এই প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪ সালে সর্বোচ্চ রপ্তানিকারক হিসেবে স্বনামধন্য রূপালী ব্যাংকের পক্ষ থেকেও মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি অর্জন করেছে, যা পুরো রংপুর অঞ্চলের মানুষের জন্য এক বিরাট গৌরবের বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত