প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর যে নতুন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রত্যাশা করা হয়েছিল, তা আজ দিন দিন সহিংসতা, আক্রমণ ও অসহিষ্ণুতার কালো ছায়ায় ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। মাঠের রাজনীতিতে মতপার্থক্যকে গণতান্ত্রিক উপায়ে মোকাবিলা করার পরিবর্তে পেশিশক্তি প্রদর্শনের যে পুরনো ও ধ্বংসাত্মক সংস্কৃতি জেঁকে বসেছে, তার সর্বশেষ এক ভয়াবহ শিকার হয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি। সিলেটের গোলাপগঞ্জে শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও মানবিক একটি মতবিনিময় সভা শেষ করে ফেরার পথে এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমকে বহনকারী গাড়িবহরে দুই দফা বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়েছে। এই কাপুরুষোচিত সন্ত্রাসী হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে এনসিপির শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন যে, যারা নতুন করে দেশে স্বৈরাচার কায়েম করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে এবং ছাত্রদলের সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করতে চাইছে, তাদের পরিণতি একাত্তরের পরাজিত শক্তি কিংবা শেখ হাসিনার সরকারের চেয়েও আরও অনেক বেশি ভয়াবহ হবে।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে জানা যায় যে, নির্ধারিত রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া বীর পরিবারগুলোর খোঁজখবর নিতে ও তাঁদের সঙ্গে সমবেদনা জানাতে সিলেটে গিয়েছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় নেতারা। তারই অংশ হিসেবে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে সিলেটের গোলাপগঞ্জ পৌরসভা মিলনায়তনে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একটি অত্যন্ত আবেগঘন ও গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভায় অংশ নেন এনসিপির নেতারা। সভা শেষে অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ পরিবেশেই নির্ধারিত সময় বিকেল পৌনে তিনটার দিকে সারজিস আলমকে বহনকারী গাড়িটি মিলনায়তন এলাকা ত্যাগ করে গন্তব্যের দিকে রওনা হয়। কিন্তু ঠিক তখনই ওঁৎ পেতে থাকা দুর্বৃত্তরা অতর্কিতভাবে গাড়ি লক্ষ্য করে উসকানিমূলক স্লোগান দিতে শুরু করে এবং মুহূর্তের মধ্যে গাড়িতে ইটপাটকেল, পাথর ও বোতল ছুড়তে শুরু করে। এই আকস্মিক ও হিংসাত্মক আক্রমণে সারজিস আলমের গাড়ির পেছনের কাচ সম্পূর্ণ চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়, যা উপস্থিত নেতাকর্মীদের চরম আতঙ্কের মধ্যে ফেলে দেয়।
গোলাপগঞ্জের ওই প্রথম হামলার রেশ কাটতে না কাটতেই দুর্বৃত্তরা আরও বেশি আগ্রাসী রূপ নিয়ে পাঁচমাইল নামক এলাকায় দ্বিতীয় দফায় অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে ফের আক্রমণ চালায়। এই দ্বিতীয় দফার হামলায় সন্ত্রাসীরা আরও হিংস্র হয়ে ওঠে এবং তাদের হাতে রড, চাপাতি ও ভারী লাঠিসোঁটা দেখা যায় বলে এনসিপির পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করা হয়েছে। দ্বিতীয় দফার এই ভয়াবহ হামলায় গাড়িতে থাকা যুবশক্তির সিলেটের সাবেক দপ্তর সম্পাদক তারেক জামিল সরাসরি চোখে মারাত্মক আঘাত পান। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, সন্ত্রাসীদের মূল টার্গেট ছিল এনসিপির শীর্ষ নেতাদের ওপর সরাসরি শারীরিক আঘাত হানা এবং তাদের জীবন বিপন্ন করা। চোখের পলকে ঘটে যাওয়া এই দুই দফা হামলার পুরো ঘটনার ভিডিও চিত্র এবং প্রামাণ্য প্রমাণ দলের নেতাকর্মীদের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। চরম ঝুঁকিপূর্ণ ও সংকটপূর্ণ এই পরিস্থিতি এড়িয়ে সারজিস আলমসহ অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতারা অক্ষত অবস্থায় কোনোমতে সিলেট সার্কিট হাউসে ফিরে আসেন এবং সেখানে জরুরি সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হন।
সার্কিট হাউসে আয়োজিত তাৎক্ষণিক সংবাদ সম্মেলনে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও প্রতিবাদী কণ্ঠে সারজিস আলম দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি এবং এর সহযোগী সংগঠন ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের দিকে সরাসরি আঙুল তোলেন। তিনি অত্যন্ত আক্ষেপ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সাধারণ মানুষ একটি স্বাধীন ও নিরাপদ রাজনৈতিক পরিবেশের আশা করেছিল, কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, শেখ হাসিনা যে স্বৈরাচারী ও রক্তপিপাসু শাসন ব্যবস্থা কায়েম করেছিলেন, ঠিক একই পদাঙ্ক অনুসরণ করে আজ বিএনপি আরেকটি ভয়ংকর স্বৈরাচারী শাসন কায়েম করার অশুভ পাঁয়তারা চালাচ্ছে। তিনি কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন যে, বিএনপি তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বা অন্য কোনো নতুন রাজনৈতিক দলকে স্বাধীনভাবে এই রাষ্ট্রে মাথা তুলে দাঁড়াতে দিতে চাইছে না। বিগত দিনের ফ্যাসিবাদী আচরণ বজায় রেখে যদি তারা জোরপূর্বক অন্য দলকে দমানোর চক্রান্ত অব্যাহত রাখে, তবে ইতিহাসের নির্মম পরিণতি তাদের জন্য অপেক্ষা করছে এবং তাদের পতন শেখ হাসিনার চেয়েও আরও অনেক বেশি ভয়াবহ রূপ নেবে।
আহত সহকর্মী তারেক জামিলের ক্ষতবিক্ষত অবস্থার কথা তুলে ধরে সারজিস আলম বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির পতন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন যে, এই রাজনৈতিক সন্ত্রাসীরা এখন সরাসরি মানুষের চোখের ওপর আঘাত হানছে, যা অত্যন্ত পৈশাচিক। হবিগঞ্জে ইতোমধ্যে একজন নেতার চোখ চিরতরে কেড়ে নেওয়া হয়েছে এবং সিলেটে তারেক জামিলের চোখে মারাত্মক আঘাত হেনে তাকে অন্ধ করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। তিনি প্রশ্ন রাখেন যে, এই তারেক রহমানের ছাত্রদলের সন্ত্রাসীরা মূলত কী ধরনের বাংলাদেশ দেখতে চায়? গাড়িতে বৃষ্টির মতো যেসব ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়েছে, তার একটির আঘাত সামান্য এদিক-সেদিক হলে গাড়িতে থাকা যেকোনো মানুষের জীবন প্রদীপ নিভে যেতে পারত। ঠান্ডা মাথায় এই ধরনের পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ঘটানোর উদ্দেশ্য নিয়েই কি তারা রাজনৈতিক কর্মসূচি ও বিরোধীদের ওপর এই ধরনের পৈশাচিক আক্রমণ চালাচ্ছে? তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন যে, হামলা ও মামলা দিয়ে তরুণ প্রজন্মের এই জাগরণ ও অধিকার আদায়ের আপসহীন আন্দোলনকে কোনোভাবেই স্তব্ধ করা যাবে না।
সারজিস আলমের এই বক্তব্যের পর এনসিপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদা মিতু এবং দলের মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীও অত্যন্ত জোরালো ভাষায় এই ন্যক্কারজনক ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানান। তারা বলেন যে, হবিগঞ্জের পর সিলেটে বারবার এনসিপির শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে হামলা চালানো হলেও স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না, যা অত্যন্ত রহস্যজনক ও হতাশাজনক। তারা হবিগঞ্জের ঘটনায় অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতাদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার এবং আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। এই ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কাছে এনসিপির নেতাকর্মীরা কখনোই মাথা নত করবে না এবং পূর্বনির্ধারিত সকল কর্মসূচি আরও বেশি সাহসিকতার সঙ্গে সফল করা হবে বলে তারা দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। উদ্ভূত এই চরম প্রতিকূল পরিস্থিতির মাঝেই দলের আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামের সরাসরি নেতৃত্বে এনসিপির পুরো গাড়িবহর নির্ধারিত পূর্বসূচি অনুযায়ী কানাইঘাট উপজেলায় জুলাই পদযাত্রা কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে বীরদর্পে রওনা হয়।
এদিকে এনসিপির পক্ষ থেকে ছাত্রদলের ওপর সুনির্দিষ্ট এই অভিযোগ তোলার পর সিলেট জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন সংবাদ মাধ্যমের কাছে সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন যে, ছাত্রদলের কোনো নেতাকর্মী এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সঙ্গে বিন্দুমাত্র যুক্ত নয় এবং যদি তাদের দলের কেউ জড়িত থাকে, তবে তার প্রমাণ দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি আরও দাবি করেন যে, এনসিপির নেতারা শহীদের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলেও প্রকৃত আহত বা ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে দেখা না করেই সেখান থেকে প্রস্থান করায় স্থানীয় সাধারণ মানুষের মাঝে কিছুটা ভুল বোঝাবুঝি বা ক্ষোভের সৃষ্টি হতে পারে, যার ফলে এই বিচ্ছিন্ন ঘটনাটি ঘটে থাকতে পারে বলে তিনি শুনেছেন। তবে এই দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই সিলেটের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে মারাত্মক উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। সিলেটের পুলিশ সুপার চৌধুরী মো. যাবের সাদেক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, গোলাপগঞ্জে এনসিপির কর্মসূচি শেষে ফেরার পথে কে বা কারা অত্যন্ত সুকৌশলে ঢিল মেরে গাড়ির কাচ ভেঙে দিয়েছে, যা একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। পুলিশ প্রশাসন ইতোমধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পুরো বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করছে এবং ঘটনার নেপথ্যে যে বা যারাই জড়িত থাকুক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি দৃঢ় আশ্বাস দিয়েছেন।