বন্ধের মুখে নগর মাতৃসদন, চিকিৎসা বঞ্চিত লাখো মানুষ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬
  • ২ বার
বন্ধের মুখে নগর মাতৃসদন, চিকিৎসা বঞ্চিত লাখো মানুষ

প্রকাশ:  ৩১ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের লাখ লাখ দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত মানুষের স্বাস্থ্যসেবার শেষ ভরসাস্থল হিসেবে পরিচিত সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা এলাকার দুই শতাধিক নগর মাতৃসদন ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র আজ চরম এক অনিশ্চয়তা ও গভীর সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিনের অবহেলা আর প্রশাসনিক জটিলতার গ্যাঁড়াকলে পড়ে দেশের নগরাঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো এখন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। যদি দ্রুত এই সংকটের কোনো কার্যকর সমাধান না করা হয়, তবে স্বল্পমূল্য ও সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসা পাওয়া লাখ লাখ নগরবাসী চরমভাবে সেবাবঞ্চিত হওয়ার মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বেন। একই সঙ্গে দীর্ঘকাল ধরে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসা হাজার হাজার দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী হঠাৎ করে চাকরি হারানোর তীব্র আশঙ্কায় মানবেতর জীবনযাপনের মুখোমুখি হয়েছেন। প্রান্তিক মানুষের এই দুর্দশা এবং জনস্বাস্থ্যের এই ভয়াবহ অবনতির আশঙ্কা নিয়ে দেশজুড়ে সচেতন মহলে তীব্র উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।

এই গভীর সংকট ও আশঙ্কার কথা তুলে ধরে সম্প্রতি রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। নগর স্বাস্থ্যসেবা-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে এবং কোয়ালিশন ফর দ্য আরবান পুওর বা কাপ-এর সক্রিয় সহযোগিতায় আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন বিওএসসি নগর দরিদ্র বস্তিবাসীদের কেন্দ্রীয় ফেডারেশন এবং সেফ হেল্প গ্রুপ নেটওয়ার্ক পথবাসী ও ঝুঁপড়িবাসীদের ফেডারেশনের শীর্ষস্থানীয় প্রতিনিধিরা। সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা অত্যন্ত আবেগময় ও দায়িত্বশীল কণ্ঠে বলেন যে, দেশের শহর এলাকার গরিব মানুষ, রিকশাচালক, দিনমজুর, বস্তিবাসী ও পথবাসীরা সাধারণত বেসরকারি ক্লিনিক বা হাসপাতালে গিয়ে ব্যয়বহুল চিকিৎসা গ্রহণের সামর্থ্য রাখেন না। তাঁদের একমাত্র ভরসা ছিল এই নগর মাতৃসদন ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো। কিন্তু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তহীনতা এবং অর্থায়নের সংকটের কারণে আজ সেই চিকিৎসাসেবা থেকেও বঞ্চিত হওয়ার পথে রয়েছে দেশের এই অবহেলিত জনগোষ্ঠী।

সংবাদ সম্মেলনে পরিবেশিত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের মোট বারোটি সিটি করপোরেশন এবং একুশটি পৌরসভায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। এর মধ্যে সারা দেশে সর্বমোট পয়তাল্লিশটি নগর মাতৃসদন এবং একশো সাতষট্টিটি নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র চালু রয়েছে, যেখান থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ সেবা গ্রহণ করেন। সর্বমোট পনেরোটি অংশীদার এনজিওর সরাসরি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত এসব প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে তিন হাজার চারশো বাহাত্তর জন দক্ষ ও প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। এই বিশাল কর্মীবাহিনীর নিরলস প্রচেষ্টার ফলেই প্রায় এক কোটি সত্তর লাখেরও বেশি সাধারণ নগরবাসী নিয়মিত ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ পেয়ে আসছেন। চিকিৎসাসেবা বঞ্চিত হওয়ার এই শঙ্কা কেবল একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, বরং এটি লাখ লাখ মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত একটি মারাত্মক মানবিক সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে।

এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো থেকে কী ধরনের এবং কত ব্যাপক পরিসরে সেবা দেওয়া হতো, তার একটি চিত্রও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা হয়। বক্তারা জানান যে, এসব কেন্দ্রে মূলত মাতৃস্বাস্থ্যর সুরক্ষা, শিশুস্বাস্থ্যর পরিচর্যা, পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ক পরামর্শ, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি, পুষ্টি উন্নয়ন এবং কিশোর-কিশোরীদের বিশেষ প্রজনন স্বাস্থ্যসহ ষোলোটিরও বেশি অতি গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক সেবা প্রদান করা হতো। বিশেষ করে সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক ও অতি দরিদ্র মানুষদের জন্য রেড কার্ডের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রায় ত্রিশ শতাংশ সেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রদান করা হতো। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বর্তমান প্রশাসনিক জটিলতার কারণে সেই বিনামূল্যের রেড কার্ডের চিকিৎসাসেবা ইতোমধ্যে বন্ধ রয়েছে। ফলে টাকার অভাবে গরিব মায়েদের প্রসূতি চিকিৎসাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যা মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার বাড়িয়ে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

এই সংকটের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও প্রশাসনিক রূপান্তর প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, দীর্ঘদিন ধরে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বা এডিবির আর্থিক সহায়তায় এবং প্রকল্পভিত্তিক কাঠামোর আওতায় এই জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছিল। পরবর্তীতে প্রজেক্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর স্থানীয় সরকার বিভাগের উদ্যোগে এই স্বাস্থ্যসেবাগুলোকে একটি দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই মডেলে রূপান্তর করার সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছিল। সেই প্রস্তাবিত মডেলে স্থানীয় সরকার বিভাগ পঁচিশ শতাংশ, সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন পঁচিশ শতাংশ এবং অংশীদার এনজিওগুলো নিজেদের বিভিন্ন আয়ের উৎসের মাধ্যমে অবশিষ্ট পঞ্চাশ শতাংশ ব্যয় বহনের কথা ছিল। কিন্তু গত বাইশে এপ্রিল সরকারের পক্ষ থেকে নতুন এক নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যার মাধ্যমে নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার মূল দায়িত্ব স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নিকট হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়।

এই মন্ত্রণালয় বদল ও দায়িত্ব হস্তান্তরের জটিল প্রক্রিয়াই মূলত বর্তমান সংকটের মূল কারণ হিসেবে সামনে এসেছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের সরাসরি অধীনে পরিচালিত অংশীদার এনজিওগুলোর চুক্তির নির্দিষ্ট মেয়াদ গত ৩০ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়ে গেছে। এরপর থেকে নতুন কোনো অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি বা সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ও আনুষ্ঠানিক কোনো নির্দেশনা না পাওয়ায় এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দৈনন্দিন কার্যক্রম এক চরম অনিশ্চয়তার ঘূর্ণাবর্তেিপ পড়ে গেছে। ১ জুলাইয়ের পর থেকে অংশীদার এনজিওগুলো সম্পূর্ণ মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে নিজেদের সীমিত ব্যক্তিগত উদ্যোগে কোনোমতে স্বাস্থ্যসেবা চালু রাখার চেষ্টা করে গেলেও বাড়িভাড়া পরিশোধ, হাজার হাজার কর্মীর মাসিক বেতন প্রদান এবং জীবনরক্ষাকারী ওষুধ কেনার ব্যয় দীর্ঘদিন একা বহন করা তাদের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ফলে চলতি মাসের শেষ নাগাদ এসব কেন্দ্র সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতির কারণে সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত তিন হাজার চারশো বাহাত্তর জন নিবেদিতপ্রাণ স্বাস্থ্যকর্মী। চাকরি হারানোর তীব্র আশঙ্কার কথা তুলে ধরে বক্তারা অত্যন্ত সংবেদনশীল কণ্ঠে বলেন যে, এই বিশাল কর্মীবাহিনীর একটি বিরাট অংশই নারী, যারা নিজেদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। হঠাৎ করে যদি এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায় এবং তাদের চাকরি চলে যায়, তবে হাজার হাজার পরিবার রাতারাতি চরম অর্থনৈতিক সংকটে ও অনাহারে পতিত হবে। বছরের পর বছর ধরে নামমাত্র বেতনে মানুষের সেবা করে যাওয়া এই স্বাস্থ্যকর্মীরা আজ নিজেদের পেশাগত ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম হতাশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। রাষ্ট্র ও সরকারের নীতিনির্ধারক মহল যদি দ্রুত এই বিষয়ে সদয় দৃষ্টি না দেন, তবে দেশের নগর স্বাস্থ্য খাতের অবকাঠামো ভেঙে পড়ার পাশাপাশি অসংখ্য পরিবার পথে বসবে।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করে এই সংকট উত্তরণে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও যৌক্তিক সাত দফা দাবি জাতির সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রথমত, কোনো অবস্থাতেই যেন চলমান নগর স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম বন্ধ করা না হয়, সে বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, বর্তমান অংশীদার এনজিওগুলোর সঙ্গে অবিলম্বে অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির মাধ্যমে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর কার্যক্রম সচল রাখতে হবে। তৃতীয়ত, সমাজের অতি দরিদ্র মানুষের জন্য অত্যন্ত জনকল্যাণমূলক বিনামূল্যের রেড কার্ড সেবা দ্রুত পুনর্বহাল করতে হবে। চতুর্থত, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ ও দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীদের চাকরি ও জীবন জীবিকা রক্ষায় তাদের যথাযথভাবে ধরে রাখতে হবে। পঞ্চমত, অত্যন্ত পরিকল্পিত, সুশৃঙ্খল ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে কার্যক্রম স্থানান্তর করতে হবে। ষষ্ঠত, নগরের প্রতিটি বস্তি ও প্রান্তিক এলাকায় টেকসই প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে। সবশেষে সংশ্লিষ্ট সব মহলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশের সাধারণ মানুষের মৌলিক স্বাস্থ্য অধিকার সুরক্ষার জোরালো দাবি জানানো হয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত