যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও ২৩ বাংলাদেশি ফেরত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬
  • ২ বার
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও ২৩ বাংলাদেশি ফেরত

প্রকাশ: ৩১ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বজুড়ে অবৈধ অভিবাসন ও অনিয়মিত সীমান্ত পারাপারের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রশাসনের কঠোর নীতি এবং চলমান সাঁড়াশি অভিযানের ধারাবাহিকতায় আরও একদল বাংলাদেশিকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। উন্নত জীবনের সোনালী স্বপ্ন বুকে নিয়ে যারা হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মার্কিন মুল্লুকে প্রবেশ করেছিলেন, অভিবাসন সংক্রান্ত আইনি জটিলতার গ্যাঁড়াকলে পড়ে তাদের সেই স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে গেছে। অনিয়মিত অভিবাসনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান কঠোর অভিযানের অংশ হিসেবে সর্বশেষ আরও তেইশ জন বাংলাদেশিকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। দীর্ঘ অনিশ্চয়তা, আইনি লড়াই এবং বন্দিদশা কাটিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে এই প্রবাসীরা অত্যন্ত হতাশাজনক পরিস্থিতিতে জন্মভূমিতে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও অভিবাসন নীতির সাম্প্রতিক পরিবর্তনের ফলে এই ধরনের প্রত্যাবাসনের ঘটনা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা অভিবাসন প্রত্যাশী তরুণ সমাজকে এক গভীর ভাবনায় ফেলে দিয়েছে।

ঘটনার বিবরণী থেকে জানা যায় যে, গত বৃহস্পতিবার বেলা এগারোটার দিকে একটি বিশেষ ফ্লাইটে করে এই তেইশ জন বাংলাদেশি নাগরিক হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছান। দীর্ঘ বিমানযাত্রা এবং মানসিক অবসাদগ্রস্ততার মধ্য দিয়ে দেশে ফেরা এসব মানুষকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানায় প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক এবং এভিয়েশন সিকিউরিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত দলগুলো। বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পর ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের পক্ষ থেকে তাদের তাৎক্ষণিক মানবিক সহায়তা, আইনি পরামর্শ এবং নিজ নিজ গন্তব্যে নিরাপদে পৌঁছে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবহন সহায়তা প্রদান করা হয়। আকস্মিকভাবে এভাবে খালি হাতে এবং সর্বস্ব হারিয়ে দেশে ফিরে আসায় অনেক অভিবাসীর চোখেই ছিল কান্নার ছাপ। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটি যখন কোনো অর্থ বা সম্পদ ছাড়াই শূন্য হাতে ফেরেন, তখন তাদের স্বজনদের ওপর দিয়ে যে মানসিক ও আর্থিক দুর্যোগ বয়ে যায়, তা কেবল ভুক্তভোগী পরিবারগুলোই উপলব্ধি করতে পারে।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সংগৃহীত তথ্য ও পরিসংখ্যানে অভিবাসনের নামে এই নির্মম চিত্রটি আরও স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, বিশ পঁচিশ সাল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দফায় মোট তিনশো উনসত্তুর জন বাংলাদেশিকে তাদের দেশ থেকে ফেরত পাঠিয়েছে। গত বিশ জানুয়ারি ছত্রিশ জন, ছাব্বিশ ফেব্রুয়ারি উনত্রিশ জন এবং সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার আরও তেইশ জন বাংলাদেশিকে এভাবে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এ ছাড়া বিগত বছরগুলোর বিভিন্ন সময়ে, যেমন বিশ পঁচিশ সালের আট ডিসেম্বর একত্রিশ জন, আঠারো নভেম্বর চার্টার্ড ফ্লাইটে উনচল্লিশ জন এবং আট জুন চার্টার্ড ফ্লাইটে বিয়াল্লিশ জন বাংলাদেশিকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। একইভাবে বিশ পঁচিশ সালের ছয় মার্চ থেকে একুশ এপ্রিলের মধ্যে আরও চৌত্রিশ জন বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। ধারাবাহিক এই প্রত্যাবাসনের পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনিয়মিত উপায়ে বসবাসকারী অভিবাসীদের ওপর দেশটির প্রশাসন কতটা কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের বিস্তারিত তথ্যে আরও উঠে এসেছে যে, সর্বশেষ ফেরত আসা তেইশ জনের মধ্যে কেবল নোয়াখালী জেলারই তেরো জন বাসিন্দা রয়েছেন। এ ছাড়া সিলেটের তিনজন এবং বাকিরা কক্সবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মুন্সীগঞ্জ, কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, ঢাকা ও দেশের অন্যান্য বিভিন্ন জেলার বাসিন্দা। ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক মাইগ্রেশন ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম শরিফুল হাসান অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে জানান যে, ফেরত আসা ব্যক্তিদের অধিকাংশেরই আমেরিকা যাত্রার পথটি ছিল অত্যন্ত ভয়ংকর। তারা দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার দীর্ঘ, অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং চরম ঝুঁকিপূর্ণ পথ ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছিলেন। পরিবারের ভাগ্য ফেরাতে এবং উন্নত ভবিষ্যতের আশায় এসব তরুণ অবৈধ দালালচক্রের খপ্পরে পড়ে নিজেদের জীবনকে বিপন্ন করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর এই বিপজ্জনক যাত্রায় জনপ্রতি পঞ্চাশ থেকে পঁয়ষট্টি লক্ষ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে বলে জানা গেছে, যা জোগাড় করতে গিয়ে অনেক পরিবার ভিটামাটি বিক্রি কিংবা চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছে।

প্রাথমিক তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে জানা যায় যে, ফেরত আসা এই তেইশ জনের মধ্যে বিশ জনই ব্রাজিলকে ট্রানজিট বা মূল রুট হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। তাঁরা প্রথমে ব্রাজিল থেকে বলিভিয়া, পেরু, ইকুয়েডর, কলম্বিয়া, পানামা, কোস্টারিকা, নিকারাগুয়া, হন্ডুরাস ও গুয়াতেমালা হয়ে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে মেক্সিকো সীমান্ত অতিক্রম করে অনিয়মিতভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন। এই দীর্ঘ ও রুদ্ধশ্বাস যাত্রাপথে তাদের চোদ্দো থেকে পনেরোটি ভিন্ন দেশ বাসে, ট্রাকে এবং পায়ে হেঁটে অত্যন্ত অমানবিক পরিস্থিতিতে অতিক্রম করতে হয়েছে। ফেরত আসা ব্যক্তিদের নিজস্ব ভাষ্য অনুযায়ী, ব্রাজিল রুট ব্যবহারকারীদের অধিকাংশই প্রথমে বাংলাদেশ সরকারের জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো বা বিএমইটির বৈধ ছাড়পত্র নিয়ে বৈধ উপায়েই ব্রাজিলে প্রবেশ করেছিলেন। আবার কেউ কেউ ট্যুরিস্ট ভিসার আড়ালে ব্রাজিলে পৌঁছানোর পর আন্তর্জাতিক দালালচক্রের প্রলোভনে পড়ে একই ধরনের অনিয়মিত ও অবৈধ পথে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের দুঃসাহসিক ও সর্বনাশা চেষ্টা চালান।

তবে আন্তর্জাতিক অভিবাসন আইন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ কঠোর বিধিমালার কারণে তাদের এই অবৈধ প্রচেষ্টা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বৈধ অভিবাসনের প্রয়োজনীয় শর্তাবলী ও আইনি কাগজপত্র যথাযথভাবে পূরণ করতে না পারার কারণে তারা খুব দ্রুতই দেশটির অভিবাসন কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারিতে পড়ে যান। মার্কিন আইন অনুযায়ী, বৈধ কাগজপত্র বা বৈধতা ছাড়া অবস্থানকারী যেকোনো অভিবাসীকে আদালতের আইনানুগ রায় কিংবা প্রশাসনিক আদেশের মাধ্যমে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর পূর্ণ এখতিয়ার কর্তৃপক্ষের রয়েছে। যখনই এসব অবৈধ অভিবাসীরা যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক বা মানবিক আশ্রয়ের আবেদন করেন এবং সেই আবেদন মার্কিন আদালত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়, তখন মার্কিন অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা বা আইসিই দ্রুত প্রত্যাবাসনের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে। আইনি লড়াইয়ে হেরে যাওয়ার পর এই অসহায় মানুষগুলোর সামনে দেশে ফিরে আসা ছাড়া আর কোনো বিকল্প খোলা থাকে না।

রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের ছোঁয়াও এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে আরও বেশি ত্বরান্বিত করেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর থেকে দেশের ভেতরে অনিয়মিত ও অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযান আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বহুগুণ জোরদার করেছেন। অবৈধ অভিবাসন রোধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করায় মার্কিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো এখন আরও কঠোর হাতে পরিস্থিতি দমন করছে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অনিয়মিত নাগরিকদের একাধিক দফায় তালিকা প্রস্তুত করে নিজ নিজ দেশে বিশেষ ফ্লাইটে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। এই কঠোর বাস্তবতার মুখে পড়ে যেসব বাংলাদেশি সর্বস্বান্ত হয়ে দেশে ফিরে আসছেন, তাদের পুনর্বাসন এবং অবৈধ অভিবাসনের এই ভয়াবহ ফাঁদ থেকে তরুণ সমাজকে রক্ষায় রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পর্যায়ে আরও কার্যকর ও জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণের তাগিদ দিচ্ছেন সচেতন মহল।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত