শিল্পের স্বার্থে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা চান উদ্যোক্তারা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬
  • ৩ বার
শিল্পের স্বার্থে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা চান উদ্যোক্তারা

প্রকাশ: ৩১ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি এবং রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচিত শিল্পকারখানাগুলো আজ তীব্র গ্যাস সংকট ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনার চরম অব্যবস্থাপনার কারণে এক নজিরবিহীন স্থবিরতা ও গভীর সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের অভাবে কারখানার উৎপাদন প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যার ফলে জাতীয় অর্থনীতিতে নেমে এসেছে এক কালো ছায়া। প্রয়োজনীয় চাহিদার অর্ধেক গ্যাসও এই মুহূর্তে কারখানায় মিলছে না, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক শিল্প উৎপাদনে। এমন এক উদ্বেগজনক ও সংকটময় পরিস্থিতিতে দেশের উৎপাদনমুখী শিল্প খাতকে সম্ভাব্য বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে এবং অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে একটি যুগোপযোগী ও সুষ্ঠু জ্বালানি ব্যবস্থাপনার জোরালো দাবি জানিয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্প উদ্যোক্তা ও বাণিজ্য সংগঠনের প্রতিনিধিরা। সঠিক সময়ে কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে আজ ক্ষুদ্র থেকে শুরু করে বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক কর্মসংস্থান ও আর্থিক নিরাপত্তার জন্য এক বড় অশনিসংকেত।

এই সংকটময় বাস্তবতাকে সামনে রেখে সম্প্রতি রাজধানীর তেজগাঁওয়ে অবস্থিত সমকাল কার্যালয়ে ‘জ্বালানি খাতে সংকট: উত্তরণে করণীয়’ শীর্ষক এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়। দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম সমকালের উদ্যোগে আয়োজিত এই উচ্চপর্যায়ের সংলাপে দেশের জ্বালানি খাতের নীতিনির্ধারক, শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী নেতা, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এবং খ্যাতনামা জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। অত্যন্ত প্রাণবন্ত ও তথ্যবহুল এই সংলাপে প্রধান অতিথি হিসেবে ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হন বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী, আর পুরো অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত দক্ষ ও সুশৃঙ্খলভাবে সঞ্চালনা করেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না। দেশের বর্তমান জ্বালানি খাতের না বলা সত্যগুলো এবং এর থেকে মুক্তির সম্ভাব্য পথগুলো নিয়ে এই সংলাপে খোলামেলা ও গভীর বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

আলোচনার শুরুতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বিগত ছয় মাসে তাঁর মন্ত্রণালয়ের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাগুলোর একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে জানান যে, দেশের ভেতরে তেল ও গ্যাসের নিজস্ব উৎপাদন বৃদ্ধি এবং নতুন উৎস অনুসন্ধানের বহুমুখী কার্যক্রম ইতোমধ্যে ত্বরান্বিত করা হয়েছে। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে সরকার অতি সম্প্রতি দুটি আধুনিক রিগ ক্রয় করেছে এবং অদূর ভবিষ্যতে আরও তিনটি রিগ কেনার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় দেশের সম্ভাবনাময় অঞ্চল নোয়াখালীর সেনবাগে নতুন একটি গ্যাসকূপ খননের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে বলে তিনি সবাইকে অবহিত করেন। তবে বর্তমান তীব্র গ্যাস সংকটের মূল কারণ হিসেবে তিনি মহেশখালীতে অবস্থিত ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট বা ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে সংঘটিত অনাকাঙ্ক্ষিত অগ্নিকাণ্ডের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। তিনি জানান যে, বিদেশি বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীরা দ্রুত ত্রুটি সারানোর জন্য দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন এবং আগামী শনিবার থেকে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে শুরু করবে, আর সম্পূর্ণ সমস্যা কাটতে আগামী দশ আগস্ট পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

সরকারের পক্ষ থেকে কোনো অবাস্তব প্রতিশ্রুতি না দিয়ে মন্ত্রী স্পষ্টতই জানান যে, রাতারাতি শতভাগ গ্যাস সংকট পুরোপুরি কেটে যাবে– এমন কোনো অবাস্তব আশ্বাস তিনি দিচ্ছেন না, তবে সরকার এই সংকট নিরসনে অত্যন্ত আন্তরিক ও সচেষ্ট রয়েছে। এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আরও নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের প্রাথমিক অনুমতি একটি চীনা কোম্পানিকে প্রদান করা হয়েছে। সাধারণত এ ধরনের একটি টার্মিনাল নির্মাণকাজ শেষ করতে প্রায় দুই বছর সময় প্রয়োজন হয়, যার সফল সমাপ্তির পর দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি বর্তমানের চেয়ে অনেক বেশি স্থিতিশীল হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়। এ ছাড়া দেশের খনির কয়লা উত্তোলন প্রসঙ্গে তিনি বলেন যে, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়েছে এবং জমির মালিকদের জন্য একটি আকর্ষণীয় ও সন্তোষজনক ক্ষতিপূরণ প্যাকেজ প্রস্তুত করেই সরকার এই অত্যন্ত সংবেদনশীল পদক্ষেপটি বাস্তবায়নের চিন্তা করছে।

তবে মন্ত্রীর এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় শিল্পোদ্যোক্তারা তাদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও আশঙ্কার কথা অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরেন। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল সরাসরি প্রশ্ন তোলেন যে, কবে নাগাদ গ্যাস সরবরাহের এই চলমান ভয়াবহ সংকটের একটি স্থায়ী ও নির্ভরযোগ্য সমাধান পাওয়া যাবে। এর উত্তরে মন্ত্রী বলেন যে, দীর্ঘ পনেরো বছর ধরে জমে থাকা বা তৈরি হওয়া বহুমুখী সমস্যাগুলো বর্তমান সরকারের মাত্র ছয় মাসের সংক্ষিপ্ত কার্যকালের মধ্যে জাদুকরি উপায়ে পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। তাঁর মতে, পূর্ববর্তী সময়ে দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস উত্তোলনে জোর না দিয়ে দেশকে সম্পূর্ণভাবে উচ্চমূল্যের এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরশীল করে তোলা হয়েছে, যার খেসারত আজ পুরো জাতিকে দিতে হচ্ছে। তা সত্ত্বেও বর্তমান সংকট মোকাবিলায় সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী ত্রিমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে আরও শক্তিশালী ও গতিশীল করার প্রক্রিয়া চলছে। মন্ত্রী আরও জানান যে, শিল্প খাতের এই ভয়াবহ সমস্যাগুলো নিয়ে খুব দ্রুতই প্রধানন্ত্রীর সঙ্গে ব্যবসায়ীদের একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে এবং সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পমালিকদের গ্যাস বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত উদারতা দেখিয়ে ব্লক অ্যাকাউন্টে নিয়ে পরবর্তীতে কিস্তিতে পরিশোধ করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।

গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত দেশের শীর্ষস্থানীয় জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীবৃন্দ বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত কিছু সুপারিশ সরকারের কাছে পেশ করেন। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে জানান যে, নতুন কিছু কূপ খনন করা হলেও দেশের দেশীয় গ্যাসের প্রধান ও বৃহত্তম উৎস বিবিয়ানার উৎপাদন যেভাবে দ্রুত কমে যাচ্ছে, তা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। বিবিয়ানা থেকে অতিরিক্ত গ্যাস তুলে ফেলার কারণে এই প্রধান উৎসটি আগামী বিশ বছরের মধ্যেই সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। এই বিশাল ঘাটতি মেটানোর জন্য তিনি ‘তিতাস ডিপ ড্রিলিং’-এর সফলতার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব আরোপ করেন এবং ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঢাকা ও বরিশাল অঞ্চলে নিয়ে আসার পরামর্শ দেন। ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান মন্তব্য করেন যে, দীর্ঘ দেড় দশক ধরে দেশীয় প্রাকৃতিক খনি থেকে সম্পদ আহরণে চরম অবহেলার ফলস্বরূপ আজ আমাদের এই দুর্দিন দেখতে হচ্ছে। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন যে, শিল্পে গ্যাস ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাবে এবং ব্যাংকের ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে না পারায় দেশে খেলাপি ঋণের এক বিশাল পাহাড় জমে উঠবে।

এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন জানান যে, অনেক কারখানায় গ্যাস সরবরাহ ৬০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে, যার ফলে তাদের উৎপাদন সক্ষমতা অর্ধেকে নেমে এসেছে। বৈদেশিক বিনিয়োগের কথা বললেও দেশীয় বিনিয়োগকারীরা যথাযথ অবকাঠামো ও জ্বালানি সুবিধা না পেয়ে বর্তমানে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন। বাংলাদেশ চেম্বারের সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ জোর দিয়ে বলেন যে, উদ্যোক্তাদের এই প্রত্যাশা কেবল আলোচনার টেবিলে বা গোলটেবিলের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সরকারকে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে বাস্তবসম্মত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন যে, এই জ্বালানি সংকট কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়, বরং সঠিক সময়ে সঠিক দূরদর্শী সিদ্ধান্ত না নেওয়ার অবশ্যম্ভাবী ফলাফল। তিনি দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হিসেবে অন্তত তিন থেকে চারটি এফএসআরইউ সচল রাখার পাশাপাশি স্থলভিত্তিক টার্মিনাল নির্মাণের ওপর বিশেষ জোর দেন। বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে বলেন যে, গ্যাসের অভাবে আগামী দশ আগস্টের আগে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে কারখানাগুলোর উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ থাকবে এবং নির্ধারিত সময়ে পণ্য পাঠাতে না পেরে ব্যবসায়ীরা চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন। এ ছাড়া শ্রমিকদের মাসিক বেতন সময়মতো পরিশোধ করতে না পারলে শিল্পাঞ্চলে অনাকাঙ্ক্ষিত অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ার তীব্র ঝুঁকি রয়েছে বলেও তিনি সতর্ক করেন। কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম জ্বালানি খাতের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও সুশাসনের অভাবের তীব্র সমালোচনা করেন। বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন মন্তব্য করেন যে, বর্তমান পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে কোনো সাময়িক মলম লাগানোর মতো উপশমে এই খাতকে বাঁচানো সম্ভব নয়, এর জন্য পুরো শিল্পায়নের পরিকল্পনা নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে। সবশেষে বক্তারা এক বাকه‌ای স্বীকার করেন যে, দেশের অর্থনীতি এবং শিল্প খাতকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ঝেড়ে ফেলে সুশাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল একটি টেকসই ও সুষ্ঠু জ্বালানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা সম্ভব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত