পুলিশে পদোন্নতি জট ও অসন্তোষ: বাড়ছে প্রশাসনের বৈষম্য

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩ বার
পুলিশে পদোন্নতি জট ও অসন্তোষ: বাড়ছে প্রশাসনের বৈষম্য

প্রকাশ: ০৩ আগস্ট  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশ পুলিশের নীতিনির্ধারণী উচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের নিবেদিতপ্রাণ কর্মকর্তাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে এক গভীর হতাশা এবং চাপা অসন্তোষ বিরাজ করছে। এই হতাশার মূলে রয়েছে দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক পদোন্নতি জট, সিভিল প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে বিদ্যমান প্রকট বৈষম্য এবং সুনির্দিষ্ট লজিস্টিক সুবিধার চরম অভাব। একটি দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে পুলিশের মনোবল বৃদ্ধিতে পেশাদার প্রশিক্ষণ প্রদানসহ অন্যান্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান কোনো জোরালো উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এর ফলে বাহিনীর ভেতরে কর্মরত সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের মনে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা এই সুশৃঙ্খল বাহিনীর সামগ্রিক কার্যক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

সহকারী পুলিশ সুপার থেকে শুরু করে অতিরিক্ত আইজিপি পদমর্যাদার বহু কর্মকর্তা এবং মাঠপর্যায়ের পরিদর্শক, উপপরিদর্শক ও সহকারী উপপরিদর্শকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে যে বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা মারাত্মক মানসিক চাপের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তাদের মূল অভিযোগ হলো, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সরকারের উচ্চপর্যায়ে প্রশাসনিক দরকষাকষিতে বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের চরম ব্যর্থতার কারণেই মূলত এই ভয়াবহ পদোন্নতি জট সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে পুলিশের ন্যায্য দাবিদাওয়া আদায়, হারানো গৌরব ও মনোবল ফিরিয়ে আনা এবং বাহিনীর সুনাম বৃদ্ধির জন্য কোনো কার্যকর ও জোরালো পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। এতে সুশৃঙ্খল এই বাহিনীর অভ্যন্তরীণ চেইন অব কমান্ড বা শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। পুলিশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে তরুণ ক্যাডার অফিসারদের এই ক্ষোভের অন্যতম প্রধান কারণ হলো প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের সুযোগ-সুবিধার বিশাল ব্যবধান ও বৈষম্য।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে পুলিশের বিভিন্ন পদমর্যাদার অন্তত বিশজন কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপকালে এই চাপা অসন্তোষ ও ক্ষোভের বিষয়টি অত্যন্ত জোরালোভাবে উঠে এসেছে। কর্মকর্তাদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ হলো, প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা অত্যন্ত নিয়মিত ও দ্রুতগতিতে পদোন্নতি লাভ করে নীতিনির্ধারণী ধাপে পৌঁছে যাচ্ছেন, যা পুলিশ ক্যাডারের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। পুলিশ ক্যাডারের ২১তম ব্যাচের কর্মকর্তারা পদোন্নতি জটিলতার কারণে দীর্ঘকাল ধরে অতিরিক্ত ডিআইজি হিসেবে স্থবির হয়ে আছেন, অথচ তাদের অনেক জুনিয়র অফিসার অর্থাৎ প্রশাসন ক্যাডারের ২৪ ও ২৫তম ব্যাচের কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে যুগ্ম সচিব বা ডিআইজি পদমর্যাদায় উন্নীত হয়েছেন। প্রশাসনিক প্রথা অনুযায়ী, যুগ্ম সচিবের মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা ডিআইজি পদের সমতুল্য হলেও সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দিক থেকে প্রশাসন ক্যাডার অনেক বেশি সুবিধা ভোগ করে থাকে। এছাড়া প্রশাসন ক্যাডারে সুপারনিউমারারি বা পদের অতিরিক্ত পদোন্নতির সুযোগ অকৃপণভাবে ব্যবহার করা হলেও পুলিশ ক্যাডারে এই আধুনিক চর্চা কার্যত অনুপস্থিত বললেই চলে।

বিভিন্ন জাতীয় কর্মসূচিতে প্রশাসন ক্যাডারের ২৪ ও ২৫তম ব্যাচের কর্মকর্তারা যে ধরনের ডেকোরামগত বা মর্যাদাগত সুবিধা পেয়ে থাকেন, পুলিশের ২০, ২১ ও ২২তম ব্যাচের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারাও অনেক সময় সেই সম্মান পান না। এই ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতির কারণে বিভিন্ন ক্যাডারের সমন্বয়ে যৌথ কোনো প্রশিক্ষণেও পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তারা অংশ নিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। পুলিশ ও প্রশাসন ক্যাডারের ব্যাচভিত্তিক অবস্থান ও পদোন্নতির বর্তমান চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে প্রশাসন ক্যাডারের ১৮তম ব্যাচ পর্যন্ত কর্মকর্তারা সচিব হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া ২০তম ব্যাচ অতিরিক্ত সচিব এবং ২৪ ও ২৫তম ব্যাচ যুগ্ম সচিব পদে দায়িত্ব পালন করছেন, যা পুলিশ ক্যাডারের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তুলে ধরে। অন্যদিকে পুলিশ ক্যাডারের ১৫তম ব্যাচের অনেক কর্মকর্তা এখনো ডিআইজি বা যুগ্ম সচিব পদমর্যাদায় রয়েছেন, যা পদোন্নতির ক্ষেত্রে চরম বৈষম্যের স্পষ্ট প্রমাণ।

১৭ ও ১৮তম ব্যাচের কর্মকর্তারাও দীর্ঘদিন ধরে একই পদে আটকে রয়েছেন এবং ২০, ২১ ও ২২তম ব্যাচের কর্মকর্তারা অতিরিক্ত ডিআইজি কিংবা কেউ কেউ এসপি পদমর্যাদায় সম্পূর্ণ স্থবির অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। পুলিশ সদর দপ্তরের নিজস্ব তথ্যানুযায়ী, অতিরিক্ত মহাপুলিশ পরিদর্শক পদমর্যাদার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিনির্ধারণী পাঁচটি পদ দীর্ঘদিন ধরে খালি পড়ে রয়েছে। এর মধ্যে পুলিশ সদর দপ্তরের উন্নয়ন শাখা, হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট শাখা, অডিট শাখা, পুলিশ টেলিকম ইউনিট এবং নদীপথের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা নৌ পুলিশের প্রধানের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল পদগুলো অভিভাবকহীন অবস্থায় রয়েছে। গত এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিত পুলিশের পলিসি গ্রুপের বৈঠকে বাহিনীর সার্বিক চাওয়া-পাওয়ার বিষয়ে গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। এ গ্রুপের একাধিক নীতিনির্ধারক জানান যে প্রশাসন ক্যাডারের মতো অবিলম্বে সুপারনিউমারারি পদোন্নতির ব্যবস্থা করা না হলে ২৪তম ব্যাচের অন্তত ৮০ শতাংশ কর্মকর্তা এবং ২১ ও ২২তম ব্যাচের অনেক কর্মকর্তা সিনিয়র হওয়া সত্ত্বেও অতিরিক্ত ডিআইজি থাকাবস্থায়ই অবসরে চলে যেতে বাধ্য হবেন।

বৈঠকে একজন অতিরিক্ত আইজিপি তীব্র আক্ষেপ করে জানান যে ৩০তম ব্যাচের চাকরি চৌদ্দ বছর পার হতে চললেও তারা এখনো অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা যেকোনো পেশাদার কর্মকর্তার সততা ও মানসিক উদ্দীপনাকে ধূলিসাৎ করে দেয়। ব্যাচওয়ারী অনুসন্ধানে দেখা গেছে যে ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে রাজনৈতিক কারণে বিভিন্ন ব্যাচের বেশ কয়েকজন দক্ষ কর্মকর্তার পদোন্নতি পুরোপুরি বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ওইসব কর্মকর্তার ভোগান্তির আংশিক অবসান হলেও ২১তম ব্যাচের কর্মকর্তারা এখনো নানাভাবে উপেক্ষিত ও বঞ্চিতই রয়ে গেছেন। পুলিশ বাহিনীর বর্তমান জনসংখ্যা, অপরাধের আধুনিক ধরন এবং ভৌগোলিক বিস্তৃতি বিবেচনা করে পুলিশের বর্তমান অর্গানোগ্রাম পরিবর্তন করে নতুন ইউনিট গঠন এবং জনবল বাড়ানোর জন্য বাহিনীর ভেতর থেকে জোর দাবি উঠছে। দেশব্যাপী অপরাধের ডিজিটাল রূপান্তর ঠেকাতে একজন অতিরিক্ত আইজিপির নেতৃত্বে একটি স্বাধীন সাইবার ইউনিট গঠনের প্রস্তাব রয়েছে, যা দেশের প্রতিটি জেলায় বিশেষায়িত থানার মাধ্যমে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে।

দেশের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনা করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পাশাপাশি কুমিল্লা এবং নতুন সিটি করপোরেশন বগুড়াকে আধুনিক পুলিশে রূপান্তর করার যৌক্তিক দাবি রয়েছে। সেই সঙ্গে রেঞ্জগুলোয় ডিআইজির পরিবর্তে অতিরিক্ত আইজিপি পদায়নের আবশ্যকতা বারবার তুলে ধরা হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে অনেক থানায়ই টহল পিকআপের তীব্র সংকটের কারণে নিয়মিত পুলিশ টহল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যা অপরাধ দমনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। দেশের চৌত্রিশটি ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারের বেহাল দশা, পরিকাঠামোগত অবকাঠামো সমস্যা এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা বাহিনীর অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে অত্যন্ত দুর্বল করে তুলেছে। সিআইডির মতো ঐতিহ্যবাহী তদন্ত সংস্থার মারাত্মক জনবল সংকট পুরো পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল করে তুলেছে। পুলিশ বাহিনীতে বর্তমান মোট জনবল আনুমানিক দুই লাখ সাত হাজার, যা দেশের বর্তমান জনসংখ্যা ও অপরাধের হার বিবেচনায় অন্তত দুই লাখ ৫০ হাজারে উন্নীত করা জরুরি।

এসপি ও ডিআইজি পর্যায়ের কর্মকর্তারাই মূলত মাঠপর্যায়ে সার্বিক তদারকি ও গুরুত্বপূর্ণ সব তদন্ত কার্যক্রমের মূল দায়িত্ব পালন করে থাকেন। কিন্তু দীর্ঘদিনের পদোন্নতি অনিশ্চয়তা, চরম বঞ্চনা ও মূল্যায়নের অভাবে অনেক কর্মকর্তা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত রয়েছেন। এতে থানা থেকে শুরু করে রেঞ্জ পর্যায় পর্যন্ত পেশাদার চেইন অব কমান্ড দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা কোনোভাবেই একটি স্বাধীন দেশের জন্য কাম্য হতে পারে না। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশাসনিক এই হতাশা ও দীর্ঘসূত্রিতা দ্রুত নিরসন করা না হলে বাহিনীর সামগ্রিক মনোবল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং এর নেতিবাচক প্রভাব পুরো দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর পড়বে। তাই পুলিশ বাহিনীর আধুনিকায়ন, ভাবমর্যাদা রক্ষা এবং পদোন্নতি জট চিরতরে নিরসনে বর্তমান সরকারকে আরও বেশি আন্তরিক ও দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত