চট্টগ্রামে ভয়াবহ গ্যাস সংকট: স্থবির জনজীবন ও শিল্প

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩ বার
চট্টগ্রামে ভয়াবহ গ্যাস সংকট: স্থবির জনজীবন ও শিল্প

প্রকাশ: ০৩ আগস্ট  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের প্রধান বাণিজ্যিক রাজধানী এবং অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত বন্দরনগরী চট্টগ্রামে বর্তমানে এক নজিরবিহীন ও ভয়াবহ গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। গ্যাসের এই তীব্র সংকটের কারণে আবাসিক এলাকার লাখ লাখ পরিবারের চুলায় আগুন জ্বলছে না, শিল্প-কারখানাগুলোতে উৎপাদন আশঙ্কাজনকহারে কমে গেছে এবং সিএনজি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সারির কারণে সাধারণ মানুষের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। অন্যদিকে গ্যাস সংকটের সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপরও, যার ফলে চট্টগ্রামজুড়ে লোডশেডিংয়ের মাত্রা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সব মিলিয়ে বাণিজ্যিক এই মহানগরের সামগ্রিক জনজীবন, পরিবহন খাত, শিল্প এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের চাকা প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বড় বড় শিল্প উদ্যোক্তারা পর্যন্ত চরম অনিশ্চয়তা ও উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন।

কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড বা কেজিডিসিএলের নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বন্দরনগরী চট্টগ্রাম ও এর আশেপাশের অঞ্চলে গ্যাসের দৈনিক স্বাভাবিক চাহিদা রয়েছে প্রায় তিনশো পঞ্চাশ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু বর্তমান সংকটের শুরুর দিকে চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ নেমে এসেছিল মাত্র দুশো মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি। তবে চলতি আগস্ট মাসের শুরু থেকে এই সরবরাহ পরিস্থিতি আরও বেশি অবনতি হয়েছে, যার ফলে আবাসিক, বাণিজ্যিক এবং শিল্প খাত—সব ক্ষেত্রেই নজিরবিহীন এই গ্যাস সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। গ্যাস সরবরাহ হঠাৎ করে এমন তলানিতে ঠেকে যাওয়ায় নগরীর বিভিন্ন এলাকার মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ ওলটপালট হয়ে গেছে। গৃহিণীরা সময়মতো রান্না করতে না পেরে চরম বিপাকে পড়েছেন এবং অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বাইরের হোটেল বা রেস্তোরাঁর খাবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।

নগরীর হালিশহর, আগ্রাবাদ, চান্দগাঁও, চকবাজার, বাকলিয়া এবং পতেঙ্গাসহ অধিকাংশ ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় প্রতিদিন ভোরের সূর্য ওঠার পরপরই গ্যাসের প্রেসার বা চাপ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসছে। দিনের বেলায় চুলায় এক ফোঁটা গ্যাসও না থাকায় অনেক পরিবারকে দুপুরের খাবার রান্না করার জন্য বিকেল কিংবা গভীর রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। একই করুণ চিত্র দেখা যাচ্ছে নগরীর বিভিন্ন সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনগুলোতেও। গ্যাস পাইপলাইনে পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় ফিলিং স্টেশনগুলোর সামনে সকাল থেকে অটোরিকশা, মাইক্রোবাসসহ অন্যান্য সিএনজিচালিত যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে। চালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা তীব্র গরমে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেক সময় শেষ পর্যন্ত গ্যাস না পেয়েই খালি হাতে ফিরে যেতে হচ্ছে, যা তাদের দৈনিক উপার্জনে বড় ধরনের ধস নামাচ্ছে। পরিবহন খাতের এই স্থবিরতার কারণে সাধারণ যাত্রীদের যাতায়াতও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

গ্যাসের এই ভয়াবহ সংকটের সবচেয়ে বড় এবং মারাত্মক ধাক্কা এসে লেগেছে দেশের রপ্তানিমুখী ও ভারী শিল্প খাতে। কেজিডিসিএল সূত্রে জানা গেছে যে চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানা বা সিইউএফএলসহ বিভিন্ন বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানে গ্যাসের এই স্বল্পতার কারণে উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় পঁয়ত্রিশ থেকে পঞ্চাশ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে। অনেক কারখানায় বর্তমানে নির্ধারিত সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম উৎপাদন হচ্ছে, যা দেশের সার্বিক অর্থনীতিকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্প, ইস্পাত কারখানা, টেক্সটাইল মিল এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শিল্প প্রতিষ্ঠান আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। গ্যাস সংকটের পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় জ্বালানি গ্যাস সরবরাহ না থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদনও ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে চট্টগ্রামসহ পুরো অঞ্চলে ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

শিল্প ও ব্যবসার ওপর এই দ্বিমুখী সংকটের প্রভাব নিয়ে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির বা সিসিসিআইর সভাপতি আমিরুল হক গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে গণমাধ্যমকে জানান যে গ্যাসের অভাবে চট্টগ্রামের শিল্প খাত বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। অনেক কারখানাকে তাদের উৎপাদন মাত্রা জোরপূর্বক কমাতে হচ্ছে এবং কোথাও কোথাও উৎপাদন সাময়িকভাবে সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার উপক্রম তৈরি হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সময়মতো রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়ন করা, নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য সরবরাহ করা এবং উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে চট্টগ্রাম যেহেতু দেশের প্রধান শিল্প ও বন্দরনগরী, তাই এখানে গ্যাস সংকট শুধু স্থানীয় অর্থনীতিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং এটি জাতীয় অর্থনীতিতেও সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাই শিল্প উৎপাদন সচল রাখতে এবং দেশের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার জন্য সরকারের উচ্চপর্যায়ে কার্যকর ও জরুরি উদ্যোগ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।

অনুসন্ধানে জানা যায় যে গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত দেশের একমাত্র ভাসমান এলএনজি বা এফএসআরইউ টার্মিনালে হঠাৎ করে একটি অগ্নিকাণ্ড ও মারাত্মক কারিগরি ত্রুটির সৃষ্টি হয়। এর ফলশ্রুতিতে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি রিগ্যাসিফিকেশন ও সরবরাহ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পায়। পূর্বে যেখানে প্রতিদিন প্রায় একশো কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো, তা হঠাৎ করে প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। এর ওপর জাতীয় গ্রিডে সামগ্রিক গ্যাস ঘাটতি তৈরি হওয়ায় চট্টগ্রামে সরবরাহ করার কথা ছিল এমন গ্যাসের একটি বড় অংশ রাজধানী ঢাকার জরুরি চাহিদা মেটানোর জন্য সরিয়ে নেওয়া হয়। এতে স্থানীয় চট্টগ্রামের চাহিদা পুরোপুরি অপূর্ণ থেকে যায় এবং গত কয়েক দিনে এই সংকট আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। কেজিডিসিএলের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. তাজউদ্দিন ঢালী জানান যে জাতীয় গ্রিড থেকে পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না এবং সীমিত সরবরাহটুকু কঠোর রেশনিংয়ের মাধ্যমে বিতরণের চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত