প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য আয়কর রিটার্ন জমাদানে বড় ধরনের আর্থিক প্রণোদনা ও উৎসাহিতকরণের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই অর্থাৎ আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আয়কর রিটার্ন জমা দিলে করদাতারা অত্যন্ত আকর্ষণী এই সুবিধা উপভোগ করতে পারবেন। ২০২৬ সালের অর্থ আইনের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো চালু করা এই যুগান্তকারী প্রণোদনার আওতায় করদাতারা তাদের প্রদেয় করের ওপর সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ অথবা ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত সরাসরি কর রেয়াত বা ছাড় পাওয়ার সুযোগ লাভ করবেন। কর প্রশাসনকে আরও কার্যকর, জনবান্ধব ও সুশৃঙ্খল করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বেচ্ছায় কর পরিপালনের সংস্কৃতি জোরদার করার লক্ষ্যেই এই বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এক বিশেষ সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই ঘোষণা প্রচার করা হয় যা দেশজুড়ে সচেতন করদাতা মহলে ব্যাপক ইতিবাচক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সাধারণত দেখা যায় যে করদাতারা বছরের শেষ মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করেন এবং শেষ পর্যন্ত নানা জটিলতার কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করতে ব্যর্থ হন। এই মানসিকতা ও সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য মূলত এই সময়ভিত্তিক প্রণোদনা প্যাকেজ সাজানো হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে বছরের মাঝামাঝি সময়ে অর্থাৎ পহেলা জুলাই থেকে শুরু করে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে যারা নিজেদের বার্ষিক আয়কর রিটার্ন সফলভাবে দাখিল করতে সক্ষম হবেন, কেবল তারাই এই বিশেষ কর রেয়াতের যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। এই সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে একজন করদাতা তার প্রদেয় মূল করের ৫ শতাংশ পর্যন্ত রেয়াত পাবেন, যার সর্বোচ্চ আর্থিক সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। এর ফলে একদিকে যেমন করদাতাদের ওপর আর্থিক চাপ অনেকাংশে হ্রাস পাবে, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে সঠিক সময়ে রাজস্ব সংগ্রহের গতিও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে বলে সংশ্লিষ্ট মহল আশা প্রকাশ করছে।
তবে এই প্রণোদনা সুবিধার পাশাপাশি নির্ধারিত সময়সীমা লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তিমূলক বা অতিরিক্ত করের বিধানও রাখা হয়েছে। সরকারের নতুন নীতিমালার আলোকে জানানো হয়েছে যে কোনো করদাতা যদি নির্ধারিত প্রথম ধাপ অতিক্রান্ত হওয়ার পর অর্থাৎ পহেলা অক্টোবর থেকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে তাদের বার্ষিক রিটার্ন জমা দেন, তবে তারা কোনো ধরনের কর রেয়াত সুবিধা পাবেন না। শুধু তাই নয়, যারা নির্দিষ্ট সময়সীমা সম্পূর্ণ পার করে আরও পরে রিটার্ন দাখিল করবেন, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত জরিমানা বা কর পরিশোধের বাধ্যবাধকতা কার্যকর হবে। বিশেষ করে ২০২৭ সালের পহেলা জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চের মধ্যে যারা রিটার্ন জমা দেবেন, তাদের প্রদেয় করের অতিরিক্ত ২ শতাংশ অথবা তিন হাজার টাকা যেটি বেশি হবে, সেই পরিমাণ অর্থ অতিরিক্ত কর হিসেবে পরিশোধ করতে হবে। একইভাবে ২০২৭ সালের পহেলা এপ্রিল থেকে ৩০ জুনের মধ্যে যারা রিটার্ন দাখিল করবেন, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত করের পরিমাণ আরও বাড়িয়ে প্রদেয় করের ৫ শতাংশ অথবা পাঁচ হাজার টাকার মধ্যে যেটি বেশি হয়, সেটি ধার্য করা হবে। এই কড়াকড়ি পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য হলো করদাতাদের মধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে রিটার্ন জমা দেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা এবং দীর্ঘসূত্রিতা দূর করা।
ডিজিটাল বাংলাদেশের আধুনিক সুযোগ-সুবিধার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ২০২৬-২৭ করবর্ষের জন্য ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের অনলাইনভিত্তিক ই-রিটার্ন সেবা ইতিমধ্যে গত ২২ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। ফলে করদাতাদের আর আগের মতো দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে কষ্ট করে রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রয়োজন পড়ছে না। আগ্রহী করদাতারা ঘরে বসেই খুব সহজে নির্ধারিত অফিসিয়াল পোর্টালের মাধ্যমে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে অনলাইনে নিজেদের বার্ষিক রিটার্ন দাখিল করতে পারছেন। বর্তমান আধুনিক ডিজিটাল ব্যবস্থায় কর পরিশোধের প্রক্রিয়াটিও অত্যন্ত সহজ ও বহুমুখী করা হয়েছে। করদাতারা ব্যাংক ট্রান্সফার, ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস বা এমএফএস এবং অন্যান্য আধুনিক ডিজিটাল মাধ্যমের সাহায্যে খুব সহজেই তাদের নির্ধারিত করের টাকা পরিশোধ করতে পারছেন। সবচেয়ে বড় স্বস্তির বিষয় হলো, অনলাইনে রিটার্ন সফলভাবে জমা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই করদাতারা তাৎক্ষণিকভাবে তাদের ডিজিটাল অ্যাকনলেজমেন্ট রিসিপ্ট বা প্রাপ্তি স্বীকারপত্র এবং অফিসিয়াল আয়কর সনদ নিজের কম্পিউটারে বা মোবাইলে ডাউনলোড করে নিতে পারছেন।
অনলাইনভিত্তিক এই কার্যক্রমে করদাতারা যাতে কোনো ধরনের প্রযুক্তিগত জটিলতা বা বাধার মুখে না পড়েন, সে বিষয়েও বিশেষ নজর রেখেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। সেবাগ্রহীতাদের সুবিধার্থে জানানো হয়েছে যে অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের পুরো প্রক্রিয়া চলাকালীন যদি কেউ কোনো ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হন, তবে কর্মদিবসে অফিস চলাকালীন নির্দিষ্ট সময়ে এনবিআরের নিবেদিত কল সেন্টার এবং অন্যান্য ইলেকট্রনিক যোগাযোগের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক প্রয়োজনীয় সহায়তা ও গাইডলাইন প্রদান করা হবে। দেশের অর্থনৈতিক খাতকে আরও স্বচ্ছ, গতিশীল ও জবাবদিহিতামূলক করে তোলার ক্ষেত্রে এই ডিজিটাল রূপান্তর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সাধারণ মানুষ এখন কোনো ধরনের দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিজেদের করদায়িত্ব পালন করতে পারছেন। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে এই ধরনের সময়োপযোগী প্রণোদনা ও সহজ অনলাইন সেবামূলক ব্যবস্থা দেশের সামগ্রিক কর সংস্করণে এক বিপ্লব ঘটাবে এবং ভবিষ্যতে আরও বেশি মানুষ স্বেচ্ছায় কর প্রদানে এগিয়ে আসবে।