সর্বশেষ :

মানবাকৃতির রোবটের হাতে অস্ত্রোপচারে নতুন ইতিহাস

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬
  • ৪ বার
মানবাকৃতির রোবটের হাতে অস্ত্রোপচারে নতুন ইতিহাস

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে আরেকটি যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা হলো। প্রথমবারের মতো মানবাকৃতির বা হিউম্যানয়েড রোবট ব্যবহার করে জীবিত প্রাণীর সফল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের একদল গবেষক ও সার্জন। এই সাফল্য শুধু আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তির অগ্রযাত্রাকেই নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়নি, ভবিষ্যতের অস্ত্রোপচার পদ্ধতি নিয়েও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই প্রযুক্তি আরও উন্নত হলে একদিন প্রত্যন্ত অঞ্চল, যুদ্ধক্ষেত্র, দুর্যোগপূর্ণ এলাকা এমনকি মহাকাশেও দূর থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে জটিল অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, সান ডিয়েগো (ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান ডিয়েগো)–এর প্রকৌশলী ও শল্যবিদদের যৌথ গবেষণায় এ সাফল্য অর্জিত হয়েছে। গবেষণার ফলাফল আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার-এ প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় দেখানো হয়েছে, সার্জনের দূরনিয়ন্ত্রিত নির্দেশনায় দুটি মানবাকৃতির রোবট ল্যাপারোস্কোপিক বা ক্ষুদ্র ছিদ্রের মাধ্যমে পরিচালিত অস্ত্রোপচার পদ্ধতিতে জীবিত একটি শূকরের পিত্তথলি সফলভাবে অপসারণ করতে সক্ষম হয়েছে।

চিকিৎসা প্রযুক্তিতে রোবটের ব্যবহার নতুন নয়। বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত হাসপাতালে বহু বছর ধরেই দা ভিঞ্চি সার্জিক্যাল সিস্টেমের মতো উন্নত রোবোটিক বাহু ব্যবহার করে জটিল অস্ত্রোপচার করা হচ্ছে। তবে সেসব যন্ত্র মূলত স্থির অবস্থানে থাকা বিশেষায়িত রোবোটিক বাহু, যেগুলো মানুষের মতো চলাফেরা করতে পারে না। এবারের গবেষণার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, অস্ত্রোপচারে ব্যবহৃত হয়েছে সম্পূর্ণ মানবাকৃতির দুটি হিউম্যানয়েড রোবট, যাদের হাত-পা, দেহের গঠন এবং কাজের ধরন মানুষের কাছাকাছি।

গবেষণায় ব্যবহৃত রোবটগুলোর নাম দেওয়া হয়েছে ‘সার্জি’। এগুলো চীনের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইউনিট্রির জনপ্রিয় জি–১ (Unitree G1) হিউম্যানয়েড প্ল্যাটফর্মের ওপর ভিত্তি করে বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে। প্রায় পাঁচ ফুট উচ্চতার এবং প্রায় ২৭ কেজি ওজনের এই রোবটগুলোকে বিশেষ কনসোলের মাধ্যমে দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করেন সার্জনরা। উন্নত সেন্সর, ক্যামেরা এবং সূক্ষ্ম নড়াচড়ার সক্ষমতার কারণে রোবটগুলো অস্ত্রোপচারের সময় অত্যন্ত নির্ভুলভাবে চিকিৎসকের নির্দেশ অনুসরণ করতে পারে।

গবেষণার প্রথম ধাপে একজন মানব সার্জন এবং একটি হিউম্যানয়েড রোবট যৌথভাবে অস্ত্রোপচার পরিচালনা করে। সেখানে রোবটটি মূলত সহকারী হিসেবে কাজ করে এবং প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার সরঞ্জাম পরিচালনায় সহযোগিতা করে। পরবর্তী ধাপে আরও এক ধাপ এগিয়ে দুটি রোবটকে একসঙ্গে কাজ করানো হয়। এই পরীক্ষায় দুটি মানবাকৃতির রোবট পরস্পরের সঙ্গে সমন্বয় করে পুরো অস্ত্রোপচারের বিভিন্ন ধাপ সম্পন্ন করে। অস্ত্রোপচারের সময় সামান্য রক্তক্ষরণ হলেও সার্জনের নির্দেশনা অনুসারে রোবটগুলো দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং সফলভাবে পিত্তথলি অপসারণ করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অর্জনের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হলো হিউম্যানয়েড রোবটের বাস্তব চিকিৎসা সক্ষমতার প্রমাণ পাওয়া। এখন পর্যন্ত অধিকাংশ রোবোটিক সার্জারি নির্দিষ্ট ও ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু মানবাকৃতির রোবট মানুষের মতোই বিভিন্ন পরিবেশে চলাচল করতে পারে এবং সাধারণ অস্ত্রোপচারের সরঞ্জাম ব্যবহার করতে সক্ষম। ফলে ভবিষ্যতে হাসপাতালের বিদ্যমান অবকাঠামোতেই তুলনামূলক কম খরচে এসব রোবট ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে।

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত প্রচলিত সার্জিক্যাল রোবোটিক সিস্টেমগুলোর ওজন প্রায় ৮০০ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে এবং এগুলোর দামও কয়েক কোটি টাকা। এসব যন্ত্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজন হয় বড় অপারেশন থিয়েটার, বিশেষ প্রশিক্ষণ এবং জটিল প্রযুক্তিগত অবকাঠামো। বিপরীতে নতুন হিউম্যানয়েড রোবটগুলো অনেক হালকা, বহনযোগ্য এবং তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়বহুল। ফলে চিকিৎসা প্রযুক্তিকে আরও সহজলভ্য করার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

গবেষণার অন্যতম সদস্য সার্জারি বিশেষজ্ঞ ড. শ্যাংলেই লিউ বলেন, এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা এর বহনযোগ্যতা এবং কম খরচ। তাঁর মতে, ভবিষ্যতে এমন রোবট দূরবর্তী গ্রামাঞ্চল, যুদ্ধক্ষেত্র, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা কিংবা মহাকাশ অভিযানের সময়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক উপস্থিত থাকা সম্ভব নয়, সেখানে অভিজ্ঞ সার্জন হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে বসেই রোবট নিয়ন্ত্রণ করে অস্ত্রোপচার পরিচালনা করতে পারবেন।

গবেষক রায়ান ব্রোডেরিকও একই ধরনের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, পৃথিবীর বহু অঞ্চলে এখনো বিশেষজ্ঞ সার্জনের তীব্র সংকট রয়েছে। অনেক দুর্গম এলাকায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম বা দক্ষ জনবল না থাকায় জটিল রোগীরা সময়মতো চিকিৎসা পান না। ভবিষ্যতে উন্নত টেলি-সার্জারি প্রযুক্তির মাধ্যমে একজন সার্জন দূর থেকে একাধিক রোগীর অস্ত্রোপচার পরিচালনা করতে পারবেন, যা বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসেবায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে।

তবে গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, মানুষের শরীরে নিয়মিতভাবে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের আগে আরও বিস্তৃত গবেষণা ও নিরাপত্তা যাচাই প্রয়োজন। পরীক্ষায় দেখা গেছে, দূরনিয়ন্ত্রণের সময় মাঝে মাঝে সংকেত পৌঁছাতে সামান্য বিলম্ব হয়েছে এবং নির্দিষ্ট সময় পর রোবটগুলোকে পুনরায় রিক্যালিব্রেট করতে হয়েছে। চিকিৎসার মতো স্পর্শকাতর ক্ষেত্রে এসব সীমাবদ্ধতা পুরোপুরি দূর করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তাঁদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং উচ্চগতির নেটওয়ার্ক ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে ভবিষ্যতে এসব সীমাবদ্ধতা দূর করা সম্ভব হবে। বিশেষ করে ৫জি ও পরবর্তী প্রজন্মের যোগাযোগ প্রযুক্তি, উন্নত সেন্সর এবং আরও নিখুঁত রোবোটিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যুক্ত হলে হিউম্যানয়েড সার্জন রোবট আরও দ্রুত, নির্ভুল এবং নিরাপদভাবে কাজ করতে পারবে।

স্বাস্থ্য প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, এই গবেষণা চিকিৎসা বিজ্ঞানে নতুন যুগের সূচনা করেছে। আগামী এক দশকে রোবটিক সার্জারি শুধু উন্নত দেশেই নয়, বরং উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বাস্থ্যব্যবস্থাতেও বড় পরিবর্তন আনতে পারে। বিশেষ করে যেখানে দক্ষ চিকিৎসকের ঘাটতি রয়েছে, সেখানে দূরনিয়ন্ত্রিত রোবটিক অস্ত্রোপচার রোগীদের জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে মানবাকৃতির রোবটের এই সফল অস্ত্রোপচার প্রমাণ করেছে, প্রযুক্তি ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের সমন্বয় ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যসেবাকে আরও আধুনিক, কার্যকর এবং সহজলভ্য করে তুলতে পারে। যদিও মানুষের ওপর নিয়মিত প্রয়োগের আগে আরও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে, তবু গবেষকদের এই সাফল্য ইতোমধ্যেই বিশ্বজুড়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদদের মধ্যে ব্যাপক আশাবাদ সৃষ্টি করেছে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, একসময় যেটি ছিল কেবল বিজ্ঞান কল্পকাহিনির বিষয়, সেটিই ধীরে ধীরে বাস্তব চিকিৎসা ব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত