প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের স্বাস্থ্যসেবাকে আরও মানবিক, দক্ষ ও জনমুখী করে তুলতে নতুন প্রজন্মের চিকিৎসকদের দেশসেবায় আত্মনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ও জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমান। তিনি বলেছেন, একজন চিকিৎসকের পরিচয় শুধু তাঁর পেশাগত দক্ষতায় সীমাবদ্ধ নয়; মানবিক মূল্যবোধ, দেশপ্রেম এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাই একজন চিকিৎসককে প্রকৃত অর্থে সফল করে তোলে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবার সংকট দূর করতে তরুণ চিকিৎসকদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) রাজধানীর হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতাল ও কলেজ অডিটরিয়ামে আয়োজিত বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে কৃতিত্বের জন্য ‘সম্মাননা-২০২৬’ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে শিক্ষক, চিকিৎসক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, চিকিৎসাবিজ্ঞান এমন একটি পেশা, যেখানে জ্ঞান ও দক্ষতার পাশাপাশি মানবিকতা সবচেয়ে বড় শক্তি। তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, দেশের অন্যতম মেধাবী তরুণ-তরুণীরা চিকিৎসাবিদ্যা অধ্যয়নের সুযোগ পান। তাই তাঁদের ওপর সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রত্যাশাও অনেক বেশি। একজন চিকিৎসক যখন অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ান, তখন তিনি শুধু একটি রোগের চিকিৎসাই করেন না, বরং একজন মানুষের জীবন, একটি পরিবারের আশা এবং সমাজের প্রতি নিজের দায়িত্বও পালন করেন।
তিনি বলেন, সংস্কৃতি একটি জাতির পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি। একজন ভালো চিকিৎসক হওয়ার পাশাপাশি একজন ভালো মানুষ হয়ে ওঠাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মানবিক মূল্যবোধ, সহমর্মিতা এবং দায়িত্ববোধ ছাড়া চিকিৎসা পেশার প্রকৃত মর্যাদা অর্জন করা সম্ভব নয়। তিনি শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি নৈতিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার বাস্তবতা তুলে ধরে ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ এখনো গ্রামাঞ্চলে বসবাস করেন। অথচ দেশের অধিকাংশ চিকিৎসক শহরকেন্দ্রিক হওয়ায় গ্রামীণ জনগোষ্ঠী প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হন। তিনি বলেন, নতুন প্রজন্মের চিকিৎসকেরা যদি শিক্ষাজীবন থেকেই দেশসেবার অঙ্গীকার নিয়ে এগিয়ে আসেন, তাহলে এই বৈষম্য অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, উচ্চশিক্ষা বা বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশে গেলেও চিকিৎসকেরা অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে ফিরে আসবেন। তাঁর মতে, দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নে দক্ষ মানবসম্পদের বিকল্প নেই। আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর দেশের মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করলে স্বাস্থ্যখাত আরও শক্তিশালী হবে এবং সাধারণ মানুষ উন্নত চিকিৎসাসেবা পাবে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ডা. জুবাইদা রহমান বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের বিভিন্ন পরিসংখ্যানও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেশে প্রতি এক হাজার মানুষের বিপরীতে চিকিৎসকের সংখ্যা মাত্র ০.৮৩, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় অনেক কম। একই সঙ্গে একজন চিকিৎসককে প্রায় এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৮০০ রোগীর সেবা দিতে হয়। এই বাস্তবতা চিকিৎসকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে এবং স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দেশের প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ চিকিৎসক শহরাঞ্চলে কর্মরত থাকলেও প্রায় ৭৮ শতাংশ মানুষ বসবাস করেন গ্রামে। ফলে শহর ও গ্রামের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। একই সঙ্গে নার্সের সংখ্যাও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মানের তুলনায় অনেক কম। পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীর অভাবে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতার বিষয়েও তিনি আলোকপাত করেন। তাঁর মতে, সরকারি চিকিৎসকের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম হওয়ায় অনেক মানুষ বাধ্য হয়ে ব্যয়বহুল বেসরকারি চিকিৎসাসেবার ওপর নির্ভর করছেন। এতে চিকিৎসা ব্যয় বহু পরিবারের জন্য আর্থিক চাপ তৈরি করছে এবং অনেক ক্ষেত্রে দারিদ্র্যের অন্যতম কারণ হয়ে উঠছে। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যসেবা এমন একটি মৌলিক অধিকার, যা সবার জন্য সহজলভ্য হওয়া উচিত।
ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে চিকিৎসার অভাবে কোনো গ্রামবাসী প্রাণ হারাবে না, কোনো অন্তঃসত্ত্বা মা বা নবজাতক প্রতিরোধযোগ্য কারণে মৃত্যুবরণ করবে না। মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুস্বাস্থ্য এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে আরও শক্তিশালী করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেন, চিকিৎসা পেশা শুধু একটি কর্মসংস্থান নয়; এটি মানুষের জীবন রক্ষার দায়িত্ব। তাই চিকিৎসকদের প্রতিটি সিদ্ধান্তে মানবিকতা, সততা এবং পেশাগত নৈতিকতা প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন। নতুন প্রজন্মের চিকিৎসকেরা যদি এই মূল্যবোধ ধারণ করেন, তাহলে দেশের স্বাস্থ্যখাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
অনুষ্ঠানে শিক্ষা ক্ষেত্রে কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের সম্মাননা প্রদান করা হয়। পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের পরিবেশনা উপস্থিত অতিথিদের মুগ্ধ করে। বক্তারা বলেন, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয়ে একজন শিক্ষার্থী পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতো মানবসেবামূলক পেশায় এই মূল্যবোধের গুরুত্ব আরও বেশি।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত বর্তমানে চিকিৎসক, নার্স ও অবকাঠামোগত সংকটের পাশাপাশি শহর-গ্রামের বৈষম্যের মতো নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এ অবস্থায় নতুন প্রজন্মের চিকিৎসকদের দক্ষতা, নৈতিকতা এবং দেশসেবার মানসিকতা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও জনবান্ধব করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অনুষ্ঠানে ডা. জুবাইদা রহমানের বক্তব্যে চিকিৎসা পেশার মানবিক দিক, গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন এবং দেশের মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধের যে বার্তা উঠে এসেছে, তা উপস্থিত শিক্ষার্থী ও অতিথিদের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ভবিষ্যতের চিকিৎসকদের শুধু আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তিতে দক্ষ হলেই চলবে না; তাঁদের সমাজের প্রতিটি মানুষের প্রতি সমান দায়িত্ববোধ নিয়ে কাজ করতে হবে। তবেই একটি সুস্থ, সমৃদ্ধ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।