৫ বছরে ছানিজনিত অন্ধত্ব নির্মূলে জাতীয় রোডম্যাপ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬
  • ৯০ বার
৫ বছরে ছানিজনিত অন্ধত্ব নির্মূলে জাতীয় রোডম্যাপ

প্রকাশ:  ২৩ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশে আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে ছানিজনিত অন্ধত্ব (ক্যাটারাক্ট ব্লাইন্ডনেস) সম্পূর্ণ নির্মূলের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য ঘোষণা করেছে সরকার। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), আধুনিক প্রযুক্তি এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের দোরগোড়ায় উন্নত চক্ষুচিকিৎসা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত। সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শুধু অন্ধত্ব প্রতিরোধই নয়, বরং দেশের সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতায়ও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে অনুষ্ঠিত “বাংলাদেশে উন্নত চক্ষুসেবা: দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা হ্রাস এবং অন্ধত্ব প্রতিরোধে কর্মপরিকল্পনা” শীর্ষক স্টেকহোল্ডার কনসালটেশন কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এ পরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেশে সরকারি, বেসরকারি এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও)—এই তিন খাতেই চক্ষুচিকিৎসা নিয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ হচ্ছে। তবে এখন প্রয়োজন একটি সমন্বিত জাতীয় পরিকল্পনা, যাতে সব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম একই লক্ষ্যে পরিচালিত হয় এবং একটি অভিন্ন রিপোর্টিং ব্যবস্থার আওতায় আনা যায়।

ড. এম এ মুহিত বলেন, সরকার ইতোমধ্যে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে। এই পরিকল্পনার প্রথম ধাপেই দেশের প্রতিটি জেলা হাসপাতালের বিদ্যমান চক্ষুসেবার সক্ষমতা মূল্যায়ন করা হবে। কোথায় কী ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে, কোথায় নতুন জনবল প্রয়োজন এবং কোন হাসপাতালের অবকাঠামো উন্নয়ন জরুরি—এসব বিষয় পর্যালোচনা করে পর্যায়ক্রমে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, ছানিজনিত অন্ধত্ব বাংলাদেশে প্রতিরোধযোগ্য অন্ধত্বের অন্যতম প্রধান কারণ। সময়মতো অস্ত্রোপচার করা গেলে অধিকাংশ রোগীই স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি ফিরে পান। এ কারণে সরকার আগামী কয়েক বছরে ব্যাপকভিত্তিক ক্যাটারাক্ট সার্জারি কর্মসূচি হাতে নিতে যাচ্ছে। প্রতি বছর কয়েক লাখ মানুষের সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যেই দেশকে ছানিজনিত অন্ধত্বমুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, আধুনিক প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার চক্ষুচিকিৎসা ব্যবস্থাকে আরও সহজ, দ্রুত ও কার্যকর করে তুলতে পারে। বিশেষ করে ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথির মতো জটিল রোগ দ্রুত শনাক্ত করতে এআই-ভিত্তিক স্ক্রিনিং প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম। তিনি জানান, সরকারের লক্ষ্য হলো উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর চক্ষুসেবা শুধু বড় শহর বা বিত্তবান মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছেও পৌঁছে দেওয়া। স্বাস্থ্যসেবা নাগরিকের মৌলিক অধিকার—এই নীতিকে সামনে রেখেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।

তিনি আরও বলেন, শিশুদের চোখের যত্নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। দেশের স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের নিয়মিত চোখ পরীক্ষা, দৃষ্টিশক্তির সমস্যা দ্রুত শনাক্ত এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিনামূল্যে বা সহজলভ্য চশমা সরবরাহের জন্য সমন্বিত কর্মসূচি চালু করা হবে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় মনোযোগ বৃদ্ধি, শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং ভবিষ্যতে দৃষ্টিজনিত জটিলতা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

ড. এম এ মুহিত বলেন, শুধু শিক্ষার্থী নয়, কর্মজীবী মানুষের চোখের স্বাস্থ্য সুরক্ষাও সরকারের অগ্রাধিকারের মধ্যে থাকবে। বিভিন্ন শিল্পকারখানা, অফিস এবং কর্মস্থলে কর্মরত মানুষের চোখের নিয়মিত পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, সঠিক দৃষ্টিশক্তি নিশ্চিত করা গেলে কর্মক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। ফলে এটি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং জাতীয় অর্থনীতির জন্যও ইতিবাচক প্রভাব বয়ে আনবে।

তিনি বলেন, দেশের দ্রুত পরিবর্তনশীল স্বাস্থ্য পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি ও এনজিও পর্যায়েও উন্নত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা আরও বাড়িয়ে চিকিৎসক, নার্স ও সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকর্মীদের আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। দক্ষ জনবল ছাড়া আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ সুবিধা জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব নয়।

কর্মশালায় উপস্থিত চক্ষু বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাংলাদেশে প্রতিরোধযোগ্য অন্ধত্ব কমাতে ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তবে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, ডায়াবেটিসের প্রকোপ বৃদ্ধি এবং বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ার কারণে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি হচ্ছে। এসব মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বয় অপরিহার্য।

অনুষ্ঠানে জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক অধ্যাপক ড. এ.এস.এম.এম. ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক (অফথালমোলজি) ড. সৈয়দ মেহবুব উল কাদির বক্তব্য দেন। কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এআরকে ফাউন্ডেশন এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রতিনিধিরা। পরে অনুষ্ঠিত উন্মুক্ত আলোচনা পর্বে দেশের প্রবীণ চক্ষু বিশেষজ্ঞ, একাডেমিক ব্যক্তিত্ব, জেলা পর্যায়ে কর্মরত চিকিৎসক, বাংলাদেশ ন্যাশনাল সোসাইটি ফর দ্য ব্লাইন্ড (বিএনএসবি) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সময়োপযোগী পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, দক্ষ জনবল এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বিত প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই প্রতিরোধযোগ্য অন্ধত্ব কমানোর ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সফল দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। সরকারের ঘোষিত এই রোডম্যাপ বাস্তবায়ন হলে লাখো মানুষের দৃষ্টিশক্তি রক্ষা পাওয়ার পাশাপাশি দেশের স্বাস্থ্যখাতেও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অর্জিত হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com