সর্বশেষ :

গণহত্যার বিচার ত্বরান্বিতের দাবিতে ট্রাইব্যুনালে ১১ দলের স্মারকলিপি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬
  • ৭ বার
গণহত্যার বিচার ত্বরান্বিতের দাবিতে ট্রাইব্যুনালে ১১ দলের স্মারকলিপি

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জুলাই ২০২৪ সালের গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দায়ীদের দ্রুত বিচার, তদন্ত কার্যক্রমের গতি বাড়ানো এবং বিচারপ্রক্রিয়াকে কার্যকর করার দাবিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সামনে মানববন্ধন করেছে ১১ দলীয় ঐক্য। মানববন্ধন শেষে জোটের নেতারা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান ও চিফ প্রসিকিউটরের কাছে একটি স্মারকলিপি জমা দেন। স্মারকলিপিতে তদন্ত, গ্রেপ্তার, গুম-সংক্রান্ত মামলার অগ্রগতি, সাক্ষীদের নিরাপত্তা এবং বিচারপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণসহ বিভিন্ন বিষয়ে দাবি জানানো হয়।

বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) রাজধানীতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সামনে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য এবং সমর্থকেরা অংশ নেন। মানববন্ধনে বক্তারা জুলাই গণহত্যার অভিযোগে দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় বিলম্ব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, গণহত্যার অভিযোগে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিচার কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তিনি দাবি করেন, ফ্যাসিবাদের মূল নায়ক হিসেবে অভিযুক্ত শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে এবং আওয়ামী লীগকে দল হিসেবে বিচারের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে অভিযুক্ত অন্যদের বিরুদ্ধেও সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

হামিদুর রহমান আযাদ আরও বলেন, বিচারপ্রক্রিয়ায় বিলম্ব বা রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ জনগণের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, যদি বিচারকাজ দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে বা রাজনৈতিক বিবেচনায় বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে জনগণের মধ্যে অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে। তিনি দ্রুত গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংস্কার এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।

বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নতুন বাংলাদেশের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তার অন্যতম ভিত্তি ছিল ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা। তাঁর মতে, সে সময় সংস্কার, গণহত্যার বিচার এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের যে অঙ্গীকার করা হয়েছিল, তা বাস্তবায়নের গতি প্রত্যাশিত নয়। তিনি অভিযোগ করেন, বিচারকার্যে ধীরগতি সৃষ্টি হয়েছে এবং এতে বিচারহীনতার সংস্কৃতি ফিরে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, যদি দলীয় বিবেচনায় প্রসিকিউটর নিয়োগ বা বিচারপ্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের চেষ্টা করা হয়, তাহলে জনগণ সেটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করবে। তাঁর ভাষায়, বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখা রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এ বিষয়ে কোনো ধরনের আপস জনগণ মেনে নেবে না।

মানববন্ধনে বক্তব্য দেন এবি পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ। তিনি বলেন, গণহত্যার অভিযোগে আওয়ামী লীগকে দল হিসেবে বিচারের মুখোমুখি করা প্রয়োজন। তাঁর দাবি, গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসকে খাটো করা কিংবা অভিযুক্তদের দায়মুক্তির সুযোগ সৃষ্টি করা হলে জনগণ তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে। তিনি বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতি জনগণের আস্থা ধরে রাখতে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মহাসচিব অধ্যাপক ইকবাল হোসেন, বিডিপির মহাসচিব নিজামুল হক নাঈম, নেজামে ইসলাম পার্টির সহসভাপতি আব্দুল মাজেদ আতহারী, শহীদ আলিফের পিতা গাজীউর রহমান, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. নিয়ামুল বশির এবং জামায়াতের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারাও বক্তব্য রাখেন। তাঁরা বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার পাশাপাশি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।

পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান ও চিফ প্রসিকিউটরের কাছে জমা দেওয়া স্মারকলিপিতে জুলাই ২০২৪ সালের গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত দ্রুত শেষ করার আহ্বান জানানো হয়। স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাস্থলের তদন্ত এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। ফলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিচার কার্যক্রমও কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোচ্ছে না। তদন্ত দ্রুত শেষ করে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্টদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়।

স্মারকলিপিতে আরও বলা হয়, অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও বহু পুলিশ কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং বিভিন্ন পর্যায়ের অভিযুক্ত এখনো গ্রেপ্তার হননি কিংবা সরকারি দায়িত্বে বহাল রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তদন্তে যাঁদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাঁদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানানো হয়।

এছাড়া দেশের বিভিন্ন জেলায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথাও স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে। দাবি করা হয়, রাজধানীর বাইরে বহু ঘটনার তদন্ত এখনো সম্পূর্ণ না হওয়ায় অনেক অভিযুক্ত বিচারপ্রক্রিয়ার বাইরে রয়ে গেছেন। তাই সারা দেশে সংঘটিত অভিযোগগুলো সমান গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত সম্পন্ন করার অনুরোধ জানানো হয়।

স্মারকলিপিতে সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, অভিযুক্তদের অনেকেই এখনো গ্রেপ্তার না হওয়ায় ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে গণহত্যা বা মানবতাবিরোধী অপরাধকে সমর্থন, উসকানি বা বিচারপ্রক্রিয়া ব্যাহত করার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

গুম, গুম-পরবর্তী হত্যাকাণ্ড এবং মরদেহ গোপন বা ধ্বংস করার অভিযোগে জড়িত ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তদন্ত দ্রুত শেষ করে বিচার নিশ্চিত করার আহ্বানও স্মারকলিপিতে স্থান পেয়েছে। পাশাপাশি গুম-সংক্রান্ত মামলাগুলোর তদন্ত ও বিচারকাজে ধীরগতির কারণে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মধ্যে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে দ্রুত অগ্রগতি নিশ্চিত করার অনুরোধ জানানো হয়।

স্মারকলিপির শেষাংশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, আইনের শাসন সুসংহত করা, ভুক্তভোগীদের বিচার নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যকর ও জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়।

এদিকে, কর্মসূচি ঘিরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হওয়ার পর নেতারা স্মারকলিপি জমা দিয়ে স্থান ত্যাগ করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই গণহত্যার বিচার এবং বিচারপ্রক্রিয়ার গতি আগামী দিনের জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে থাকবে। একই সঙ্গে বিচারকাজের স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করার বিষয়টিও দেশের রাজনৈতিক ও বিচারিক অঙ্গনে বিশেষ গুরুত্ব বহন করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত