প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশে কোলোরেক্টাল বা বৃহদন্ত্র ও মলাশয়ের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে। একসময় এই ক্যানসারকে তুলনামূলকভাবে উন্নত দেশগুলোর রোগ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বর্তমানে পরিবর্তিত খাদ্যাভ্যাস, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, স্থূলতা, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং জনসংখ্যার গড় আয়ু বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশেও এর প্রকোপ বাড়ছে বলে চিকিৎসকরা মনে করছেন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ক্যানসারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এটি প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সফলভাবে চিকিৎসা এবং অনেক ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোলোরেক্টাল ক্যানসার সাধারণত হঠাৎ করে সৃষ্টি হয় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বৃহদন্ত্রের ভেতরে ছোট একটি পলিপ বা অতিরিক্ত মাংসপিণ্ড তৈরি হওয়ার মাধ্যমে এর সূচনা হয়। বছরের পর বছর ধরে এসব পলিপের কিছু অংশ ক্যানসারে রূপ নিতে পারে। নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে এসব পলিপ ক্যানসারে পরিণত হওয়ার আগেই শনাক্ত করে অপসারণ করা সম্ভব হয়। ফলে কেবল ক্যানসার দ্রুত শনাক্তই নয়, অনেক ক্ষেত্রে রোগটি হওয়ার আগেই প্রতিরোধ করা যায়।
চিকিৎসকদের মতে, অনেক রোগীর শরীরে দীর্ঘ সময় কোনো উপসর্গ দেখা যায় না। ফলে রোগটি নীরবে অগ্রসর হতে থাকে। যখন রক্তপাত, তীব্র পেটব্যথা, মলত্যাগের অভ্যাসে পরিবর্তন কিংবা ওজন দ্রুত কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়, তখন অনেক ক্ষেত্রে রোগটি অপেক্ষাকৃত জটিল পর্যায়ে পৌঁছে যায়। এ কারণেই লক্ষণ প্রকাশের আগেই নির্দিষ্ট বয়স ও ঝুঁকির ব্যক্তিদের স্ক্রিনিং করানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, যাঁদের পরিবারের নিকটাত্মীয়ের কোলোরেক্টাল ক্যানসারের ইতিহাস রয়েছে, যাঁদের আগে অন্ত্রে পলিপ ধরা পড়েছে অথবা যাঁরা ফ্যামিলিয়াল অ্যাডেনোমেটাস পলিপোসিস কিংবা লিঞ্চ সিনড্রোমের মতো বংশগত রোগে আক্রান্ত, তাঁদের ঝুঁকি সাধারণ মানুষের তুলনায় বেশি। এ ধরনের ব্যক্তিদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তুলনামূলক কম বয়স থেকেই নিয়মিত স্ক্রিনিং শুরু করা প্রয়োজন হতে পারে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের আন্তর্জাতিক নির্দেশিকা অনুযায়ী, গড় ঝুঁকির ব্যক্তিদের নির্দিষ্ট বয়সের পর নিয়মিত স্ক্রিনিং শুরু করার পরামর্শ দেওয়া হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কোলনোস্কোপি, মলে লুকানো রক্ত পরীক্ষাসহ বিভিন্ন পদ্ধতিতে স্ক্রিনিং করা হয়। রোগীর বয়স, পারিবারিক ইতিহাস, পূর্ববর্তী পরীক্ষার ফল এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত অবস্থা বিবেচনায় চিকিৎসক উপযুক্ত পরীক্ষার ধরন নির্ধারণ করেন।
প্রাথমিক পর্যায়ের পরীক্ষাগুলোর মধ্যে রক্তের বিভিন্ন পরীক্ষা এবং মলের লুকানো রক্ত শনাক্ত করার পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসব পরীক্ষায় সন্দেহজনক ফল পাওয়া গেলে পরবর্তী ধাপে কোলনোস্কোপি করা হয়। এই পরীক্ষায় ক্যামেরাযুক্ত একটি নমনীয় নলের মাধ্যমে বৃহদন্ত্রের ভেতরের অংশ সরাসরি দেখা সম্ভব হয়। একই সঙ্গে প্রয়োজন হলে পরীক্ষার সময়ই ছোট পলিপ অপসারণ কিংবা বায়োপসির জন্য নমুনা সংগ্রহ করা যায়।
চিকিৎসকদের মতে, অনেক মানুষ কোলনোস্কোপি নিয়ে অযথা ভয় বা ভুল ধারণায় ভোগেন। বাস্তবে এটি একটি বহুল প্রচলিত ও নিরাপদ পরীক্ষা। প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হলে জটিলতার ঝুঁকি অত্যন্ত কম থাকে। পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ দ্রুত শনাক্ত হওয়ার যে সুফল পাওয়া যায়, তা সম্ভাব্য ক্ষুদ্র ঝুঁকির তুলনায় অনেক বেশি।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, কোলোরেক্টাল ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে কেবল স্ক্রিনিং নয়, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন পর্যাপ্ত শাকসবজি, ফলমূল ও আঁশসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া, অতিরিক্ত লাল মাংস ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য কম গ্রহণ, নিয়মিত শরীরচর্চা, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ্যপান থেকে বিরত থাকা এবং দীর্ঘসময় বসে থাকার অভ্যাস কমানো ক্যানসারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করতে পারে।
চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলেছেন, মলদ্বার দিয়ে রক্তপাত, দীর্ঘদিন কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া, মলত্যাগের স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিবর্তন, অকারণে রক্তস্বল্পতা, পেটে অস্বস্তি কিংবা কোনো কারণ ছাড়াই দ্রুত ওজন কমে গেলে বিষয়টিকে অবহেলা করা উচিত নয়। অনেকেই এসব উপসর্গকে সাধারণ গ্যাস্ট্রিক বা পাইলসের সমস্যা ভেবে দীর্ঘদিন চিকিৎসা নেন না। এতে রোগ শনাক্ত হতে দেরি হয় এবং চিকিৎসাও জটিল হয়ে ওঠে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে এখনো কোলোরেক্টাল ক্যানসার সম্পর্কে সচেতনতা তুলনামূলক কম। অনেক মানুষ স্ক্রিনিংয়ের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জানেন না। আবার অনেকে সামাজিক সংকোচ কিংবা ভুল ধারণার কারণে পরীক্ষা করাতে আগ্রহী হন না। ফলে রোগের উল্লেখযোগ্য অংশই দেরিতে শনাক্ত হয়। সচেতনতা বৃদ্ধি, সহজলভ্য স্ক্রিনিং সুবিধা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় এ বিষয়ে পরামর্শ প্রদান রোগ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ক্যানসারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্রগুলোর একটি হলো সময়মতো পরীক্ষা। কোলোরেক্টাল ক্যানসার এমন একটি রোগ, যা অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিরোধযোগ্য এবং প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে সফলভাবে চিকিৎসাযোগ্য। তাই নির্দিষ্ট বয়স পার হওয়ার পর কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত স্ক্রিনিং করানো, স্বাস্থ্যকর জীবনধারা অনুসরণ করা এবং কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণই হতে পারে সুস্থ থাকার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।