চেক ডিজঅনারের মামলায় জামিন পেলেন সালমান এফ রহমান

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬
  • ১৮ বার
চেক ডিজঅনারের মামলায় জামিন পেলেন সালমান এফ রহমান

প্রকাশ: ১৬ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরবর্তী রাজনৈতিক ও আইনি প্রেক্ষাপটে আলোচিত নানা ঘটনাবলির মধ্যে আরও একটি নতুন মাত্রা যুক্ত হলো সালমান এফ রহমানের জামিন লাভের মধ্য দিয়ে। দীর্ঘ সময় ধরে কারাগারে বন্দি থাকা এই প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টার বিরুদ্ধে থাকা ১১২ কোটি টাকার চেক ডিজঅনারের একটি মামলায় আদালত আজ জামিন মঞ্জুর করেছেন। ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলামের আদালত শুনানি শেষে এক হাজার টাকার মুচলেকায় এই আদেশ প্রদান করেন। আইন অঙ্গনের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই জামিন আদেশ আইনি লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলেও তার বিরুদ্ধে থাকা অন্যান্য মামলার জটিলতা এখনো বহাল রয়েছে।

মামলার বিবরণে জানা যায়, চলতি বছরের শুরুর দিকে এক্সপোর্ট ইমপোর্ট ব্যাংক অব বাংলাদেশের (এক্সিম) প্রিন্সিপাল অফিসার উজ্জ্বল মণ্ডল বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, বেক্সিমকো এলপিজি ইউনিট-১ লিমিটেডের পক্ষ থেকে ব্যাংক ঋণের বিপরীতে ১১২ কোটি টাকার একটি চেক প্রদান করা হয়েছিল। কিন্তু ব্যাংকের করপোরেট শাখায় চেকটি জমা দেওয়া হলে অপর্যাপ্ত তহবিলের কারণে তা ডিজঅনার হয়। পরবর্তীতে নিয়মানুযায়ী আইনি নোটিশ প্রদান করা সত্ত্বেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ পরিশোধ না হওয়ায় নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট অনুযায়ী মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়। এই মামলায় সালমান এফ রহমানসহ সংশ্লিষ্ট পাঁচ প্রতিষ্ঠানের মোট ১০ জনকে বিবাদী করা হয়েছে, যাদের মধ্যে অনেকেই ইতিমধ্যে আইনি প্রক্রিয়ায় জামিন লাভ করেছেন।

উল্লেখ্য যে, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকেই সালমান এফ রহমান কারাগারে রয়েছেন। আইনি জটিলতার দীর্ঘ পরিক্রমায় গত মে মাসে তার বিরুদ্ধে এই চেক ডিজঅনার মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আদালত তার আইনজীবীদের যুক্তি এবং মামলার সার্বিক দিক বিবেচনা করে জামিন মঞ্জুর করার সিদ্ধান্ত নেন। এদিকে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে, চেক ডিজঅনারের এই মামলায় জামিন মিললেও তার বিরুদ্ধে থাকা বড় বড় দুর্নীতির অভিযোগ ও সন্ত্রাসবিরোধী মামলাগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে। কারণ আইনি বিশেষজ্ঞরা বারবারই উল্লেখ করছেন যে, চেক ডিজঅনারের মামলাটি মূলত একটি বাণিজ্যিক বিরোধের অংশ, যেখানে আপস-মীমাংসার সুযোগ থাকে, কিন্তু ফৌজদারি মামলার গুরুত্ব ভিন্ন।

সালমান এফ রহমানের এই মামলার প্রেক্ষাপটটি কেবল আর্থিক লেনদেনের ব্যর্থতা নয়, বরং এটি দেশের বর্তমান শিল্প খাতের বিদ্যমান সংকটকেও প্রতিফলিত করে। বেক্সিমকো গ্রুপের মতো একটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর সাথে ব্যাংকের এই আইনি লড়াই দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রেও নানাবিধ প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের যে পাহাড় জমেছে, এই চেক ডিজঅনারের মামলাটি তারই একটি অংশ বলে ধারণা করেন অর্থনীতিবিদরা। মামলার বিবাদীদের মধ্যে এসকর্প হোল্ডিংস লিমিটেড, এএফআর হোল্ডিং লিমিটেড এবং বেক্সিমকো হোল্ডিংস লিমিটেডের মতো প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে আসায় এটি স্পষ্ট যে, তাদের ব্যবসায়ী কাঠামো ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের অস্বচ্ছতা ছিল।

আইনি বিশ্লেষকরা মনে করেন, চেক ডিজঅনারের মামলাটি যখন আদালত গ্রহণ করেন, তখন আসামিপক্ষকে অবশ্যই নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্টের ১৩৮ ও ১৪০ ধারার বিধানগুলো কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হয়। এখানে অর্থ পরিশোধের একটি চূড়ান্ত সুযোগ থাকলেও তা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হওয়ার কারণেই বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। আজকের জামিন আদেশের পর সাধারণ মানুষের মনে অনেক প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। জনমনে কৌতূহল রয়েছে যে, বিশাল অঙ্কের ঋণের টাকা কীভাবে ফেরত আসবে এবং এই ধরনের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়াটি কতটা স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ থাকবে। আদালত আইন অনুযায়ী তার বিচারিক প্রক্রিয়া চালিয়ে নিচ্ছেন এবং জামিন পাওয়া তার আইনি অধিকারের অংশ হলেও মামলার মূল অপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় পাওয়ার অবকাশ নেই।

মানবিক দিক থেকে বিচার করলে, রাষ্ট্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বপালনকারী ব্যক্তির কারাগারে থাকা এবং তার বিরুদ্ধে একের পর এক মামলার অভিযোগ উত্থাপন হওয়াটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। অন্যদিকে, দেশের সাধারণ আমানতকারীদের অর্থ ব্যাংকের মাধ্যমে বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো কতটা দায়িত্বশীলতার সাথে ব্যবহার করেছে, সেটিও এখন এক বড় জিজ্ঞাসার বিষয়। চেক ডিজঅনারের এই মামলাটি যদি কেবল আর্থিক বিরোধেই সীমাবদ্ধ না থেকে দীর্ঘমেয়াদী আইনি লড়াইয়ে রূপ নেয়, তবে তা দেশের বিচার বিভাগের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। আদালতের রায়ের প্রতি সকলের শ্রদ্ধা থাকা জরুরি, তবে আইন যাতে তার আপন গতিতে চলে এবং সাধারণ মানুষের আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়, সেটাই এখন সময়ের দাবি।

পরিশেষে বলা যায়, চেক ডিজঅনারের মামলায় জামিন পাওয়া মানেই অভিযোগ থেকে মুক্তি পাওয়া নয়। সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে অন্যান্য যে গুরুগম্ভীর অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোর সুরাহা হওয়া এখনো বাকি। দেশের আইন ও বিচার ব্যবস্থার ওপর মানুষের অগাধ আস্থা রয়েছে যে, আইনের শাসনে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকলের জন্য সমান বিচার নিশ্চিত হবে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে দুর্নীতি ও অনিয়মের কোনো জায়গা নেই এবং যেকোনো আইনি প্রক্রিয়ার ফলাফলই দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির মেরুদণ্ডকে মজবুত করতে সহায়তা করবে। সালমান এফ রহমানের জামিন ও মামলার পরবর্তী ধাপগুলো এখন দেশবাসীর নজর কেড়েছে, যা বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত