বৃষ্টিতে ডুবল বাজার, সবজির আকাশচুম্বী দাম

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬
  • ১৮ বার
বৃষ্টিতে ডুবল বাজার, সবজির আকাশচুম্বী দাম

প্রকাশ: ১৬ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর প্রতিটি কাঁচাবাজারে এখন যেন এক অসহনীয় উত্তাপ। বৃষ্টির অঝোর ধারায় প্রকৃতি শীতল হলেও, সাধারণ মানুষের রান্নাঘরের বাজেট যেন আগুনের তাপে জ্বলছে। গত কয়েকদিনের লাগাতার বর্ষণ ও সরবরাহ সংকটের কারণে নিত্যপণ্যের বাজারে সবজির দাম এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের নাভিশ্বাস ওঠার উপক্রম হয়েছে। মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট থেকে শুরু করে নিউমার্কেট কিংবা আশকোনার হজক্যাম্প বাজার—সবখানেই চিত্র প্রায় অভিন্ন। বাজারে প্রবেশ করলেই সবজির চড়া দামের এই বাস্তবতায় ক্রেতারা কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন। বিশেষ করে কাঁচা মরিচের দাম ২০০ টাকার মাইলফলক স্পর্শ করায় সাধারণ মানুষ একে ‘ডাবল সেঞ্চুরি’ বলে উপহাস করলেও, তাদের পকেটে এই বাড়তি খরচ টানতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

টানা বৃষ্টিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সবজিখেতগুলো এখন জলমগ্ন। এর ফলে একদিকে যেমন বিপুল পরিমাণ সবজি পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে পরিবহন ব্যবস্থায় মারাত্মক বিঘ্ন ঘটায় রাজধানী পর্যন্ত সবজির সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় অর্ধেক। বিক্রেতারা বলছেন, আড়তগুলোতে পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই, ফলে পাইকারি বাজার থেকেই তাদের চড়া দামে সবজি কিনে আনতে হচ্ছে। এই বাড়তি ব্যয়ের বোঝা স্বভাবতই শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ছে সাধারণ ক্রেতার ওপর। মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারের সবজি বিক্রেতা আল নাহিয়ান খানের মতে, যেখানে আগে প্রতিদিন গড়ে ১০০ কেজি সবজি বাজারে আসত, সেখানে এখন সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৬০ কেজির মতো। চাহিদার তুলনায় সরবরাহের এই বিপুল ঘাটতিই দামকে আকাশমুখী করে তুলেছে।

সবজির এই অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির প্রভাব এখন রান্নাঘরের প্রতিটি উপকরণের ওপর পড়ছে। কিছু দিন আগেও যে শসা ৬০ থেকে ৮০ টাকা কেজিতে পাওয়া যেত, তা এখন প্রকারভেদে ১২০ থেকে ১৬০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। বেগুন, করলা, ফুলকপি কিংবা বরবটির মতো নিত্য প্রয়োজনীয় সবজিগুলো এখন অধিকাংশ ক্রেতার নাগালের বাইরে। ৮০ টাকার বেগুন এখন ১০০ থেকে ১২০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। করলার দামও একই হারে বেড়েছে। লাউয়ের মতো সাধারণ সবজি যা আগে ৬০ টাকায় মিলত, এখন তার জন্য গুনতে হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা। সরবরাহ সংকটের এই সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য বেড়েছে বলে অভিযোগ করছেন ক্রেতারা। তারা বলছেন, বৃষ্টির অজুহাতে দাম বাড়ানো স্বাভাবিক হলেও, বর্তমান দরবৃদ্ধির হার কোনো যুক্তিতেই গ্রহণযোগ্য নয়।

কাঁচা মরিচের দাম যেন নিয়ন্ত্রণের সকল সীমা অতিক্রম করেছে। কয়েকদিন আগেও যে মরিচ ১২০ টাকা দরে কেনা যেত, তা এখন ১৬০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত ঠেকেছে। রান্নায় মরিচের ব্যবহার যেটুকু না করলেই নয়, তাও যেন আজ বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। অথচ বাজারের অন্য প্রান্তে বিপরীত চিত্রও দেখা গেছে টমেটো ও পেঁপের ক্ষেত্রে। আমদানি বাড়ার কারণে টমেটোর দাম ২৪০ টাকা থেকে কমে ১৫০ টাকায় নেমে এলেও, পেঁপের দর পতনের ফলে কৃষকরা উপযুক্ত দাম না পাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন। পেঁয়াজ ও আলুর দাম অবশ্য আগের মতোই স্থিতিশীল রয়েছে, যা কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে ক্রেতাদের। তবে সব মিলিয়ে বাজারের এই অস্থিতিশীলতা মানুষের জীবনযাত্রায় এক গভীর সংকট তৈরি করেছে।

বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে সবজির দাম কমার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। কারণ হিসেবে তারা জানাচ্ছেন, বৃষ্টির কারণে নতুন করে যেসব সবজি চাষ করা হচ্ছে, তা বাজারে আসা পর্যন্ত এই সংকট জিইয়ে থাকবে। নরসিংদীর মতো জেলাগুলো থেকে সবজি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় রাজধানীর চাহিদার বড় একটি অংশ অপূরণীয় রয়ে যাচ্ছে। বন্যার পানি সরে গিয়ে জমির মাটি শুকানোর পরই পুনরায় সবজির সরবরাহ স্বাভাবিক হবে। ততদিন পর্যন্ত ভোক্তাদের এই বাড়তি মূল্যের সঙ্গে অভ্যস্ত হতে হবে অথবা তাদের মেনু কার্ডে পরিবর্তন আনতে হবে।

সবজির বাজারের এই অস্থিরতা সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভের সঞ্চার করেছে। মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা হুমায়রা হোসেন যেমন আক্ষেপ করে বলছিলেন, বৃষ্টি হবে এটা স্বাভাবিক, কিন্তু বৃষ্টিতে সবজির দাম ডাবল সেঞ্চুরি হাঁকাবে—এই অমানবিক পরিস্থিতি মেনে নেওয়া যায় না। মধ্যবিত্ত পরিবারের বাজেট নিয়ন্ত্রণ এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংসার চালাতে গিয়ে তারা তাদের খাদ্যতালিকা থেকে অনেক প্রিয় সবজি ছেঁটে ফেলতে বাধ্য হচ্ছেন। এদিকে বিক্রেতারাও তাদের অসহায়ত্বের কথা বলছেন, কারণ তাদের আড়ত থেকে চড়া দামে পণ্য কিনে এনে খুচরা বাজারে লোকসানে বিক্রি করার সুযোগ নেই।

পরিশেষে বলা যায়, আমাদের কৃষিব্যবস্থা এখনো জলবায়ুর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। টানা বৃষ্টি কিংবা বন্যার প্রভাব থেকে কৃষিকে রক্ষা করতে আধুনিক সংরক্ষণাগার বা কোল্ড স্টোরেজের অভাব আজকের এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। সবজির পচনশীলতা এবং দ্রুত সরবরাহের নিশ্চয়তা দিতে পারলে বাজারের এই অস্থিতিশীলতা অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব হতো। সরকারের নজরদারি ও বাজার তদারকি যদি আরও কঠোর হতো, তবে অসাধু ব্যবসায়ীরা দাম বৃদ্ধির সুযোগ নিতে পারত না। আগামী দিনগুলোতে সবজির বাজার পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে হলে কেবল সরবরাহ চেইন নয়, বরং অসাধু মুনাফাভোগীদের বিরুদ্ধেও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। আজকের এই চড়া মূল্যের বাজার যেন কেবল সাময়িক এক বিড়ম্বনা হয়েই থাকে এবং কৃষকের খেত থেকে ক্রেতার ঝুড়ি পর্যন্ত সহজলভ্য ও সুলভ পথে সবজি পৌঁছে দেওয়ার স্থায়ী বন্দোবস্ত করা এখন সময়ের দাবি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত