বিচ্ছেদের মিছিলে স্থবির সমাজ: ভেঙে যাচ্ছে চিরায়ত সম্পর্কের বুনন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬
  • ১৯ বার
বিচ্ছেদের মিছিলে স্থবির সমাজ: ভেঙে যাচ্ছে চিরায়ত সম্পর্কের বুনন

প্রকাশ:  ১৬ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সময়ের সাথে সাথে বদলে যাচ্ছে আমাদের জীবনধারা, বদলে যাচ্ছে সম্পর্কের সমীকরণ। একসময়ের যৌথ পরিবারগুলোতে বয়োজ্যেষ্ঠদের ছায়াতলে যে দাম্পত্য কলহ নিমেষেই মিটে যেত, আধুনিক একক পরিবারগুলোতে সেই সংকট এখন বিচ্ছেদের চূড়ান্ত পরিণতির দিকে মোড় নিচ্ছে। রাজধানীর উপকণ্ঠে বসবাসকারী রুনার মতো অসংখ্য নারীর জীবনে আজ তালাকের নোটিস এক দুঃস্বপ্ন হয়ে হানা দিচ্ছে। দীর্ঘ দাম্পত্যের মায়া কাটিয়ে স্বামী যখন অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন, তখন রুনার মতো অনেক নারী ও তাদের নিষ্পাপ সন্তানরা এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি দাঁড়ায়। বিচ্ছেদ কেবল আইনি নথিপত্রে স্বাক্ষর নয়, বরং এটি একটি পরিবারের স্বপ্ন, নিরাপত্তা এবং আগামীর সমস্ত আশার সমাধি। এই বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলো এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন চিত্র নয়, বরং আমাদের সামাজিক বাস্তবতার এক রূঢ় ও ভয়াবহ আয়নায় পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিচ্ছেদের হার বর্তমানে এক উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২২ সালে প্রতি হাজার জনসংখ্যায় বিয়েবিচ্ছেদের হার ১ দশমিক ৪-এ পৌঁছানো এবং ২০২৩ সালেও সেই প্রবণতা অব্যাহত থাকা প্রমাণ করে যে আমাদের পারিবারিক কাঠামোর ভিত নড়বড়ে হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিন যে বিপুল সংখ্যক তালাকের আবেদন জমা পড়ে, তা আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের স্খলনকে সামনে নিয়ে আসে। গবেষকরা বলছেন, একসময় মানুষ সামাজিক লোকলজ্জা বা পারিপার্শ্বিক চাপের মুখে সংসার টিকিয়ে রাখতে বাধ্য হতো, কিন্তু এখন নারীর অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং সচেতনতা বাড়ার সাথে সাথে তারা আর নির্যাতন বা অসম্মানিত হয়ে টিকে থাকার পক্ষপাতী নয়। এটি একদিকে যেমন ইতিবাচক, অন্যদিকে এর নেতিবাচক প্রভাবও কম নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আজকের দাম্পত্য কলহের অন্যতম প্রধান অনুঘটক হয়ে দাঁড়িয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। প্রযুক্তির আশীর্বাদে আমরা একে অপরের কাছে আসার সুযোগ পেলেও, মানসিক দূরত্ব বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। ভার্চুয়াল জগতে নতুন মানুষের সাথে কথোপকথন বা পরিচয়ের আড়ালে যে মিথ্যে আকর্ষণের সৃষ্টি হয়, তা অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের বিশ্বাস ও ভালোবাসার সম্পর্কে ফাটল ধরায়। শামিমার মতো নারীরা যখন দেখেন তার স্বামী অর্থনৈতিক উন্নতির সাথে সাথে নতুন সম্পর্কের মোহে মগ্ন, তখন পুরো সংসার তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। আবার স্বামীর দীর্ঘ প্রবাস জীবন এবং একাকিত্বের সুযোগ নিয়ে স্ত্রীর অন্য সম্পর্কের দিকে ঝুঁকে পড়ার ঘটনাও অহরহ ঘটছে। এই পারস্পরিক সন্দেহের বাতাবরণ এবং সহনশীলতার অভাব দাম্পত্য জীবনকে এক অস্থির গন্তব্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

তবে বিচ্ছেদের কারণ কেবল পরকীয়া বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নয়, বরং আমাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও অহংকারও সমানভাবে দায়ী। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার ছোটখাটো ভুল বোঝাবুঝি যখন সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের পরিবর্তে ইগো বা অহংকারের লড়াইয়ে পরিণত হয়, তখনই বিচ্ছেদের পথ প্রশস্ত হয়। বর্তমান কর্মব্যস্ত জীবনে একে অপরকে সময় দেওয়া বা গভীর মানসিক সংযোগ তৈরি করার সুযোগ কমে আসছে। ফলে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে যে বন্ধন থাকার কথা ছিল, তা শিথিল হয়ে পড়ছে। ছোটখাটো বিষয়ে বিবাদ তৈরি হওয়া এবং মুহূর্তের আবেগের বশবর্তী হয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া আমাদের তরুণ প্রজন্মের জন্য বড় বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্তের শিকার হচ্ছে শিশুরা, যাদের শৈশব মা-বাবার বিচ্ছেদের প্রতিক্রিয়ায় বিষিয়ে উঠছে।

বিচ্ছেদের পর সবচেয়ে করুণ দশা হয় সন্তানদের। মা-বাবার আলাদা হয়ে যাওয়ার ফলে একটি শিশুর মনে যে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়, তার প্রভাব সারা জীবন থেকে যায়। তারা অনিরাপত্তা, বিষণ্ণতা এবং পড়াশোনায় অমনোযোগিতার শিকার হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মা-বাবার বিচ্ছেদ দেখে বড় হওয়া শিশুরা ভবিষ্যতে সুস্থ সম্পর্কের ওপর আস্থা রাখতে ভয় পায়। তারা নিজেরাই সম্পর্কের ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভোগে। নারীদের কথা যদি বলি, তবে সংসার ভেঙে যাওয়ার পর তারা অনেক সময় চরম আর্থিক ও সামাজিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন। যারা নতুন সম্পর্কে জড়িয়ে পুরোনো সংসার ছাড়েন, তারাও প্রায়শই নতুন জীবনের জটিলতায় পড়ে হারিয়ে ফেলেন নিজের ব্যক্তিত্ব ও মানসিক প্রশান্তি।

এই ক্রমবর্ধমান সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে হলে আমাদের আবার শেকড়ে ফিরতে হবে। দাম্পত্য জীবনে মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব অনুধাবন করা এবং একে অপরের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রাখা অপরিহার্য। পরিবার কেবল দুটি মানুষের সহাবস্থানের জায়গা নয়, এটি আবেগ, দায়িত্ব এবং ত্যাগের এক পবিত্র প্রতিষ্ঠান। বিচ্ছেদের আগে কাউন্সেলিং বা মনস্তাত্ত্বিক সহায়তার সংস্কৃতি চালু করা এখন সময়ের দাবি। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রতিনিয়ত স্বচ্ছ যোগাযোগ এবং মতভেদের ক্ষেত্রে সংলাপের পথ উন্মুক্ত রাখতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতি আমাদের আরও সতর্ক এবং দায়িত্বশীল হতে হবে, যাতে ভার্চুয়াল জগত বাস্তব জীবনকে গ্রাস করতে না পারে।

পরিশেষে একটি কথাই মনে রাখা প্রয়োজন, প্রতিটি বিচ্ছেদের প্রতিধ্বনি কেবল একটি বাড়ির দেয়ালেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা ছড়িয়ে পড়ে আগামী প্রজন্মের ভেতরে। যদি আমরা এখনই দায়িত্ববান না হই, তবে সম্পর্কের এই ভাঙন আমাদের সমাজকে একটি ভারসাম্যহীন গন্তব্যের দিকে নিয়ে যাবে। পারিবারিক মধ্যস্থতা, নৈতিক শিক্ষার প্রসার এবং একে অপরের প্রতি দায়িত্ববোধের পুনর্জাগরণই পারে একটি সুস্থ দাম্পত্য জীবনের ভিত্তি পুনরায় গড়ে দিতে। আমাদের মনে রাখতে হবে, সংসার ভাঙা সহজ, কিন্তু একটি সুস্থ ও সুন্দর সমাজ গড়তে সম্পর্ক রক্ষার সংস্কৃতিই আমাদের একমাত্র অবলম্বন। তাই আবেগের চেয়ে বিচারবুদ্ধি এবং স্বার্থপরতার চেয়ে পারস্পরিক শ্রদ্ধাকে প্রাধান্য দিয়ে আমাদের পথ চলতে হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত