ওভারি ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায় যেসব কারণ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬
  • ৫ বার
ওভারি ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায় যেসব কারণ

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নারীদের প্রজননতন্ত্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ হলো ওভারি বা ডিম্বাশয়। এখান থেকেই ডিম্বাণু উৎপন্ন হয় এবং নারীদেহের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ হরমোন নিঃসৃত হয়। কিন্তু এই অঙ্গেই যখন ক্যানসার বাসা বাঁধে, তখন তা অনেক ক্ষেত্রেই দীর্ঘ সময় নীরবে শরীরের ভেতরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ কারণেই চিকিৎসাবিজ্ঞানে ওভারি ক্যানসারকে অনেক সময় ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়। রোগটি প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত স্পষ্ট কোনো লক্ষণ সৃষ্টি করে না। ফলে অধিকাংশ রোগীর ক্ষেত্রেই রোগটি ধরা পড়ে অপেক্ষাকৃত অগ্রসর পর্যায়ে, যখন চিকিৎসা আরও জটিল হয়ে যায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, নারীদের ক্যানসারজনিত মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণগুলোর একটি হলো ওভারি ক্যানসার। যদিও এ রোগের একক কোনো নির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি, তবে চিকিৎসকরা বেশ কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ কারণ চিহ্নিত করেছেন, যেগুলো থাকলে একজন নারীর ওভারি ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে বেড়ে যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পারিবারিক ইতিহাস ও জিনগত কারণ ওভারি ক্যানসারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি। যদি কোনো নারীর মা, বোন, খালা, ফুফু বা নানীর ওভারি কিংবা স্তন ক্যানসারের ইতিহাস থাকে, তাহলে তার ক্ষেত্রেও ঝুঁকি সাধারণ মানুষের তুলনায় বেশি হতে পারে। বিশেষ করে BRCA1 এবং BRCA2 জিনে পরিবর্তন বা মিউটেশন থাকলে ওভারি ক্যানসারের সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। এ কারণে যেসব পরিবারের একাধিক সদস্য ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে জিনগত পরীক্ষা ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বয়সও এ রোগের একটি উল্লেখযোগ্য ঝুঁকির কারণ। চিকিৎসা গবেষণায় দেখা গেছে, ৫০ বছর পার হওয়ার পর এবং বিশেষ করে মেনোপজের পর নারীদের মধ্যে ওভারি ক্যানসারের প্রবণতা বেড়ে যায়। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শরীরের কোষে বিভিন্ন ধরনের জিনগত পরিবর্তন জমা হতে থাকে, যা কখনো কখনো ক্যানসারে রূপ নিতে পারে। যদিও কম বয়সী নারীদের মধ্যেও এ রোগ হতে পারে, তবে অধিকাংশ রোগীই মধ্যবয়সী বা বয়স্ক।

চিকিৎসকদের মতে, যেসব নারী কখনো সন্তান জন্ম দেননি অথবা অনেক দেরিতে প্রথম সন্তান গ্রহণ করেছেন, তাদের ক্ষেত্রেও ওভারি ক্যানসারের ঝুঁকি কিছুটা বেশি দেখা যায়। ধারণা করা হয়, জীবদ্দশায় যত বেশি সংখ্যক ডিম্বস্ফোটন ঘটে, ওভারির কোষে তত বেশি পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়। তবে এটি একটি ঝুঁকির কারণ মাত্র, কোনোভাবেই নিশ্চিত কারণ নয়। সন্তান না হওয়া মানেই যে ওভারি ক্যানসার হবে, এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।

এন্ডোমেট্রিওসিস নামের একটি রোগও ওভারি ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। এন্ডোমেট্রিওসিসে জরায়ুর ভেতরের আবরণের মতো টিস্যু শরীরের অন্য স্থানে বৃদ্ধি পায়, যা দীর্ঘমেয়াদে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ রোগে আক্রান্ত নারীদের মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু ধরনের ওভারি ক্যানসারের ঝুঁকি সাধারণের তুলনায় বেশি হতে পারে। তাই এন্ডোমেট্রিওসিসে আক্রান্ত নারীদের নিয়মিত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকা উচিত।

জীবনযাপনের ধরনও ওভারি ক্যানসারের ঝুঁকিকে প্রভাবিত করতে পারে। অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, ধূমপান এবং দীর্ঘদিন অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করলে শুধু ওভারি ক্যানসার নয়, বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকিই বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত ব্যায়াম, ওজন নিয়ন্ত্রণ, সুষম খাদ্য গ্রহণ এবং ধূমপান থেকে বিরত থাকা ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

ওভারি ক্যানসারের বড় একটি সমস্যা হলো এর প্রাথমিক লক্ষণগুলো অনেক সময় সাধারণ শারীরিক সমস্যার মতো মনে হয়। ফলে রোগীরা এগুলোকে গুরুত্ব দেন না। দীর্ঘদিন ধরে পেট ফাঁপা বা পেট ভার লাগা, অল্প খাওয়াতেই পেট ভরে যাওয়ার অনুভূতি, তলপেট বা শ্রোণি অঞ্চলে ব্যথা, ঘন ঘন প্রস্রাবের চাপ, অকারণে ওজন কমে যাওয়া কিংবা দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি—এসব লক্ষণ দুই থেকে তিন সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

গাইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই উপসর্গগুলো অন্য অনেক রোগেও দেখা দিতে পারে। তবে দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে অবহেলা করা ঠিক নয়। প্রয়োজনে আল্ট্রাসনোগ্রাম, রক্তের নির্দিষ্ট পরীক্ষা, সিটি স্ক্যান বা অন্যান্য আধুনিক পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করা হয়। রোগ যত দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হয়, চিকিৎসার সফলতার সম্ভাবনাও তত বাড়ে।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে ওভারি ক্যানসার প্রতিরোধের শতভাগ কার্যকর কোনো উপায় নেই। তবে ঝুঁকি কমানোর জন্য স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং পারিবারিক ক্যানসারের ইতিহাস থাকলে জিনগত পরামর্শ গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যাদের পরিবারে BRCA জিনসংক্রান্ত ক্যানসারের ইতিহাস রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত স্ক্রিনিং বা পর্যবেক্ষণ জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশ্বজুড়ে নারীদের স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ানোর অংশ হিসেবে ওভারি ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। কারণ রোগটি যত আগে শনাক্ত হবে, তত দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হবে এবং রোগীর সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনাও তত বেশি থাকবে।

চিকিৎসকদের পরামর্শ হলো, নিজের শরীরে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তনকে কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়। বিশেষ করে পেটের অস্বস্তি, তলপেটের ব্যথা বা অকারণে ওজন কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ অব্যাহত থাকলে দ্রুত গাইনি বিশেষজ্ঞ বা ক্যানসার বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন। সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্তই ওভারি ক্যানসারের মতো জটিল রোগের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত