এমসি কলেজ ধর্ষণ মামলায় একজনের মৃত্যুদণ্ড, তিনজনের যাবজ্জীবন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬
  • ৫ বার
এমসি কলেজ ধর্ষণ মামলায় একজনের মৃত্যুদণ্ড, তিনজনের যাবজ্জীবন

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সিলেটের মুরারিচাঁদ কলেজ (এমসি কলেজ) ছাত্রাবাসে স্বামীকে আটকে রেখে এক গৃহবধূকে দলবদ্ধ ধর্ষণের বহুল আলোচিত মামলার রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। দীর্ঘ পাঁচ বছর নয় মাসের বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল একজন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে মামলায় অভিযুক্ত আরও চারজনকে অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয়েছে। বহুল আলোচিত এই মামলার রায়কে ঘিরে আদালত প্রাঙ্গণে ছিল ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং রায় ঘোষণার পর বিষয়টি আবারও দেশজুড়ে আলোচনায় উঠে আসে।

মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক বিশেষ জজ স্বপন কুমার সরকার এ রায় ঘোষণা করেন। ২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর সংঘটিত নৃশংস ঘটনাটির পর থেকে এটি ছিল দেশের অন্যতম আলোচিত নারী নির্যাতন ও দলবদ্ধ ধর্ষণ মামলা। রায় ঘোষণার মাধ্যমে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি হলেও, সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের মতে, উচ্চ আদালতে আপিলের সুযোগ থাকায় মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া এখানেই শেষ হচ্ছে না।

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ভুক্তভোগী নারী তার স্বামীর সঙ্গে এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে বেড়াতে যান। এ সময় একদল দুর্বৃত্ত তাদের জিম্মি করে ছাত্রাবাসে নিয়ে যায়। সেখানে স্বামীকে আটকে রেখে গৃহবধূকে দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। ঘটনাটি দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে এবং নারী নিরাপত্তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।

ঘটনার পরদিন ভুক্তভোগীর স্বামী শাহপরাণ থানায় ছয়জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরও দুজনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। এরপর পুলিশ ও র‍্যাব যৌথ অভিযান চালিয়ে একে একে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করে। তদন্তের সময় এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে প্রধান অভিযুক্ত সাইফুর রহমানের কক্ষে তল্লাশি চালিয়ে একটি পাইপগান, চারটি রামদা এবং দুটি ধারালো ছুরি উদ্ধার করা হয়। এসব অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় পৃথকভাবে অস্ত্র আইনে মামলা করা হয়। একই সঙ্গে অপহরণ ও চাঁদাবাজির অভিযোগেও আরেকটি মামলা দায়ের করা হয়। পরবর্তীতে তিনটি মামলাতেই তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেয় পুলিশ।

তদন্ত চলাকালে ডিএনএ পরীক্ষায় আটজন অভিযুক্তের মধ্যে ছয়জনের বিরুদ্ধে ধর্ষণের আলামতের মিল পাওয়া যায়। তদন্ত কর্মকর্তা শাহপরাণ থানার পরিদর্শক ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য ২০২১ সালের ৩ ডিসেম্বর আটজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। মামলার অভিযোগপত্রে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কর্মী সাইফুর রহমান, শাহ মাহবুবুর রহমান ওরফে রনি, তারেকুল ইসলাম ওরফে তারেক, অর্জুন লস্কর, আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল, মিসবাউল ইসলাম ওরফে রাজন, রবিউল হাসান এবং মাহফুজুর রহমান মাসুমকে আসামি করা হয়।

ঘটনার পর অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়। সাইফুর রহমান, রনি, মাসুম এবং রবিউল এমসি কলেজের ছাত্র হওয়ায় কলেজ কর্তৃপক্ষ তাদের বহিষ্কার করে এবং ছাত্রত্ব বাতিল করে। পরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ও তাদের ছাত্রত্ব ও শিক্ষাসনদ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়।

মামলাটি প্রথমে সিলেটের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন ছিল। তবে বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার দাবিতে ২০২২ সালে বাদীপক্ষ উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়। ওই বছরের ১৫ ডিসেম্বর বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি আহমেদ সোহেলের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ দলবদ্ধ ধর্ষণ ও চাঁদাবাজির মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরের নির্দেশ দেন এবং এ বিষয়ে ৩০ দিনের মধ্যে গেজেট প্রকাশের নির্দেশও দেন।

তবে সে সময় তৎকালীন রাষ্ট্রপক্ষ ওই আদেশ বাস্তবায়নের পরিবর্তে লিভ টু আপিল দায়ের করলে মামলার বিচারপ্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়। বিষয়টি নিয়ে আইনজীবী মহলে ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হয়। অনেক আইনজীবী রাষ্ট্রপক্ষের সেই পদক্ষেপকে বিচারপ্রক্রিয়া বিলম্বিত করার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্রপক্ষ আপিল আবেদন প্রত্যাহার করলে মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরিত হয় এবং নতুন করে বিচার কার্যক্রম শুরু হয়।

দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে গত বছরের ৬ মে মামলার প্রথম শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। একই বছরের ১৩ মে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। বিচার চলাকালে ভুক্তভোগী নারী, তার স্বামী, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণকারী ম্যাজিস্ট্রেট, তদন্ত কর্মকর্তা, চিকিৎসক, এমসি কলেজের শিক্ষকসহ মোট ২৪ জন সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দেন। সাক্ষ্যপ্রমাণ, ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন, জব্দকৃত আলামত এবং অন্যান্য নথিপত্র বিশ্লেষণ করে আদালত দীর্ঘ শুনানি শেষে গত বৃহস্পতিবার উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক গ্রহণ সম্পন্ন করেন। এরপর মঙ্গলবার বহুল প্রতীক্ষিত রায় ঘোষণা করা হয়।

রায়ে আদালত একজন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেন। একই সঙ্গে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় চারজন আসামিকে খালাস দেওয়া হয়। আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর সাজাপ্রাপ্ত ও খালাসপ্রাপ্ত আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতের পর্যবেক্ষণ এবং আইনগত বিশ্লেষণ আরও স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা জানিয়েছেন।

এই মামলাটি শুধু একটি ফৌজদারি বিচার নয়, বরং দেশের নারী নিরাপত্তা ও বিচারব্যবস্থা নিয়ে জনমতের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন হিসেবেও বিবেচিত হয়েছে। ঘটনার সময় দেশজুড়ে প্রতিবাদ, মানববন্ধন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও নাগরিক সমাজ দ্রুত বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছিল।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, দলবদ্ধ ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধে বৈজ্ঞানিক তদন্ত, ডিএনএ বিশ্লেষণ, সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং বিচারিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে তারা মনে করেন, বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন হওয়া ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সমাজে আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা বজায় রাখতেও এটি অপরিহার্য।

রায় ঘোষণার পর সংশ্লিষ্ট আদালত প্রাঙ্গণে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। বিচার শেষে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলেন, আদালত সাক্ষ্যপ্রমাণ ও উপস্থাপিত তথ্যের ভিত্তিতে রায় দিয়েছেন। অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা জানান, পূর্ণাঙ্গ রায় হাতে পাওয়ার পর তারা উচ্চ আদালতে আপিল করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।

পাঁচ বছর নয় মাস ধরে চলা এই মামলার রায় বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে এটি নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো গুরুতর অপরাধের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার প্রয়োজনীয়তা এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় বৈজ্ঞানিক তদন্তের গুরুত্বও নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত