প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশে ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ে তোলা এবং নগদ অর্থের ব্যবহার কমিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক লেনদেন সম্প্রসারণের লক্ষ্যে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে পূবালী ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘এক দেশ, এক কিউআর’ কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাজশাহীতে একযোগে ১৪টি ইলেকট্রনিক (ই-বুথ) উদ্বোধনের মাধ্যমে নগদহীন বা ক্যাশলেস লেনদেনের পরিধি বাড়ানোর কার্যক্রম শুরু করেছে ব্যাংকটি। একই সঙ্গে ‘ক্যাশলেস রাজশাহী’ শীর্ষক একটি সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, যেখানে ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থার সুবিধা এবং নিরাপদ লেনদেনের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
পূবালী ব্যাংকের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ‘লেনদেন হচ্ছে ক্যাশলেস, এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আয়োজিত এ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল সাধারণ গ্রাহক, ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ডিজিটাল লেনদেন সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। অনুষ্ঠানে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে রাজশাহী অঞ্চলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্থাপিত ১৪টি ই-বুথ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশ দ্রুত একটি স্মার্ট ও ডিজিটাল অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই অগ্রযাত্রাকে আরও গতিশীল করতে ব্যাংকিং খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং নগদহীন লেনদেনের সংস্কৃতি গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, ক্যাশলেস লেনদেন শুধু সময় সাশ্রয়ই করে না, বরং আর্থিক ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নিরাপত্তাও নিশ্চিত করে।
তিনি আরও বলেন, ডিজিটাল আর্থিক সেবার সম্প্রসারণ দেশের অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধি, কর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং দুর্নীতি প্রতিরোধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে ডিজিটাল লেনদেনকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশে পরিণত করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানে পূবালী ব্যাংকের পরিচালক আজিজুর রহমান বলেন, পরিবর্তিত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় আধুনিক ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামো গড়ে তোলা অপরিহার্য। পূবালী ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরেই গ্রাহকদের জন্য নিরাপদ, সহজ এবং দ্রুত ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারণে কাজ করে যাচ্ছে। রাজশাহীতে ১৪টি নতুন ই-বুথ চালুর মাধ্যমে সেই প্রচেষ্টায় নতুন মাত্রা যুক্ত হলো।
ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ আলী বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা এবং সরকারের ডিজিটাল রূপান্তরের লক্ষ্য বাস্তবায়নে পূবালী ব্যাংক বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর সেবা চালু করছে। তিনি বলেন, নতুন ই-বুথগুলো গ্রাহকদের জন্য নগদ উত্তোলন, বিভিন্ন ধরনের ব্যাংকিং সেবা গ্রহণ এবং ডিজিটাল লেনদেনকে আরও সহজ ও দ্রুত করবে। একই সঙ্গে ‘এক দেশ, এক কিউআর’ উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অভিন্ন কিউআরভিত্তিক লেনদেন ব্যবস্থাও আরও কার্যকর হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রাজশাহী অফিসের নির্বাহী পরিচালক মো. আমজাদ হোসেন খান অনুষ্ঠানে বলেন, দেশের আর্থিক খাতকে আরও আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো শক্তিশালী করা হচ্ছে। ‘এক দেশ, এক কিউআর’ উদ্যোগের ফলে ভোক্তা ও ব্যবসায়ীরা একই কিউআর কোড ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে সহজেই অর্থ লেনদেন করতে পারবেন। এতে লেনদেনের গতি যেমন বাড়বে, তেমনি খরচও কমবে।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের রাজশাহী অফিসের পরিচালক মো. বায়েজীদ সরকার এবং মো. নাজিম উদ্দিন। এছাড়া পূবালী ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহনেওয়াজ খান, উপমহাব্যবস্থাপক মো. রবিউল আলম, মো. সাজিদুর রহমান, বিভিন্ন শাখার ব্যবস্থাপক এবং প্রধান কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে অংশ নেন। তারা ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারণ এবং গ্রাহকবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল লেনদেনের প্রসার শুধু ব্যাংকিং সেবাকে আধুনিক করছে না, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকেও আরও গতিশীল করছে। নগদ অর্থ ব্যবহারের পরিবর্তে ইলেকট্রনিক লেনদেন বাড়লে অর্থ পরিবহন, সংরক্ষণ এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত ব্যয় কমে আসে। পাশাপাশি লেনদেনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত হওয়ায় অর্থপাচার, জালিয়াতি এবং কর ফাঁকির ঝুঁকিও হ্রাস পায়।
বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করেন, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও যদি ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা সহজলভ্য করা যায়, তাহলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি আরও বৃদ্ধি পাবে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী, কৃষক এবং সাধারণ মানুষ দ্রুত ও নিরাপদভাবে ব্যাংকিং সেবা গ্রহণের সুযোগ পাবেন। এর ফলে নগদ অর্থের ওপর নির্ভরশীলতা কমে একটি প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠবে।
বাংলাদেশ সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে ক্যাশলেস লেনদেন সম্প্রসারণে বিভিন্ন নীতিগত উদ্যোগ গ্রহণ করে আসছে। এর অংশ হিসেবে ‘এক দেশ, এক কিউআর’ ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে দেশের সব ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস এবং পেমেন্ট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বিত ডিজিটাল লেনদেন নিশ্চিত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এই ব্যবস্থার ফলে একজন গ্রাহক একটি কিউআর কোড ব্যবহার করেই বিভিন্ন ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করতে পারবেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য বাস্তবায়নে ডিজিটাল আর্থিক সেবার বিস্তার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং সেবা বৃদ্ধি পেলে ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসবে, বিনিয়োগ পরিবেশ আরও উন্নত হবে এবং সরকারি-বেসরকারি আর্থিক ব্যবস্থায় দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে একটি আধুনিক, স্বচ্ছ এবং টেকসই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলাও সহজ হবে।
রাজশাহীতে পূবালী ব্যাংকের ১৪টি নতুন ই-বুথ উদ্বোধন সেই বৃহত্তর লক্ষ্য বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, এই উদ্যোগের মাধ্যমে রাজশাহীতে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের ব্যবহার আরও বাড়বে এবং সাধারণ মানুষ ক্যাশলেস লেনদেনের সুবিধা সম্পর্কে আরও সচেতন হবেন।