বিশ্বকাপের শেষ চারে কোচদের মেধার মহারণ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬
  • ৪ বার
বিশ্বকাপের শেষ চারে কোচদের মেধার মহারণ

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল মানেই বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের লড়াই—এমন ধারণা বহুদিনের। কিন্তু আধুনিক ফুটবলে শুধু মাঠের ২২ ফুটবলারের পারফরম্যান্সই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে না। ডাগআউটে দাঁড়িয়ে থাকা কোচদের কৌশল, মানসিক প্রস্তুতি, মুহূর্তের সিদ্ধান্ত এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও সমানভাবে নির্ধারণ করে দেয় কে উঠবে ফাইনালে আর কার স্বপ্ন থেমে যাবে শেষ চারে। ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে জায়গা করে নেওয়া চার দল—আর্জেন্টিনা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও স্পেন—যতটা তাদের তারকা ফুটবলারদের জন্য আলোচনায়, ঠিক ততটাই প্রশংসিত তাদের চার কোচের ফুটবল দর্শন ও নেতৃত্বের জন্য।

লিওনেল স্কালোনি, টমাস টুখেল, দিদিয়ের দেশম এবং লুইস দে লা ফুয়েন্তে—চারজনের কোচিং দর্শন ভিন্ন, কৌশল ভিন্ন, ব্যক্তিত্ব ভিন্ন। কিন্তু একটি জায়গায় তারা একেবারে অভিন্ন। সেটি হলো, দলকে সঠিক সময়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার অসাধারণ সক্ষমতা। বিশ্বকাপের সবচেয়ে কঠিন পর্যায়ে এসে তাদের প্রতিটি সিদ্ধান্তই হয়ে উঠেছে কোটি কোটি সমর্থকের আলোচনার বিষয়।

আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনিকে আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সফল নীরব বিপ্লবী বলা হয়। ২০১৮ বিশ্বকাপে হতাশাজনক পারফরম্যান্সের পর যখন তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন খুব কম মানুষই বিশ্বাস করেছিলেন যে তিনি আর্জেন্টিনাকে আবার বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষে ফিরিয়ে আনতে পারবেন। কিন্তু সময়ই প্রমাণ করেছে, তার পরিকল্পনা ছিল সুদূরপ্রসারী। কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা এবং বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে তিনি শুধু ট্রফিই জেতাননি, বরং একটি নতুন সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছেন, যেখানে ব্যক্তিগত অহংকারের চেয়ে দলগত ঐক্যকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

স্কালোনির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো পরিস্থিতি অনুযায়ী কৌশল পরিবর্তনের সক্ষমতা। প্রতিপক্ষের ধরন বুঝে তিনি কখনো ৪-৩-৩, কখনো ৪-৪-২ কিংবা ৪-২-৩-১ ফরমেশনে দল সাজান। বলের দখল ধরে রাখা, দ্রুত ট্রানজিশন এবং রক্ষণ থেকে আক্রমণে মুহূর্তেই রূপান্তর—এসব বৈশিষ্ট্য এখনকার আর্জেন্টিনাকে বিশ্বের সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ দলগুলোর একটিতে পরিণত করেছে। লিওনেল মেসির মতো কিংবদন্তির উপস্থিতিতেও দলকে ব্যক্তি নির্ভর না রেখে সম্মিলিত শক্তির ওপর দাঁড় করানো স্কালোনির অন্যতম বড় অর্জন।

ইংল্যান্ডের টমাস টুখেলকে ফুটবল বিশ্বের অনেকেই ‘ট্যাকটিক্যাল গ্র্যান্ডমাস্টার’ বলে অভিহিত করেন। কারণ তিনি শুধু ম্যাচ পরিচালনা করেন না, ম্যাচের ভেতরেই নতুন পরিকল্পনা তৈরি করতে পারেন। প্রতিপক্ষের দুর্বলতা শনাক্ত করে দ্রুত কৌশল বদলে দেওয়ার দক্ষতা তাকে আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা কোচে পরিণত করেছে।

জার্মান ক্লাব মাইনৎস থেকে শুরু করে বরুসিয়া ডর্টমুন্ড, পিএসজি, চেলসি এবং বায়ার্ন মিউনিখ—প্রতিটি ক্লাবেই তিনি নিজের কৌশলগত দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। চেলসিকে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতানোর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার সুনাম আরও দৃঢ় হয়। ইংল্যান্ডের দায়িত্ব নেওয়ার পরও তিনি একই দর্শন অনুসরণ করেছেন। তার কাছে ফুটবল মানে নিয়ন্ত্রণ। ম্যাচের গতি, বলের দখল, প্রেসিং এবং প্রতিপক্ষের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি—সবকিছুতেই তিনি নিখুঁত পরিকল্পনায় বিশ্বাসী। প্রয়োজন হলে ম্যাচ চলাকালেই ফরমেশন বদলে প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করার সাহসও দেখান তিনি।

ফ্রান্সের দিদিয়ের দেশম চার কোচের মধ্যে সবচেয়ে অভিজ্ঞ এবং সবচেয়ে সফলদের একজন। খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপ জয়ের পর কোচ হিসেবেও ফ্রান্সকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেছেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে একই দলের দায়িত্ব পালন করেও ধারাবাহিক সাফল্য ধরে রাখা তার অন্যতম বড় কৃতিত্ব। ২০১৮ সালে বিশ্বকাপ জয়, ২০২২ সালে রানার্সআপ এবং ২০২৬ সালে আবারও সেমিফাইনালে ওঠা তার নেতৃত্বের ধারাবাহিকতারই প্রমাণ।

দেশমের ফুটবল দর্শন বাস্তববাদী। তিনি অযথা সৌন্দর্যের পেছনে ছুটেন না; বরং জয়কেই সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হিসেবে দেখেন। প্রয়োজন হলে প্রতিপক্ষকে বলের দখল ছেড়ে দিয়ে দ্রুত পাল্টা আক্রমণে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন। তার দলে শৃঙ্খলা, রক্ষণাত্মক সংগঠন এবং সঠিক সময়ে আক্রমণের ভারসাম্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিলিয়ান এমবাপ্পের মতো বিশ্বসেরা তারকা থাকলেও দেশম সবসময় দলগত পারফরম্যান্সকেই অগ্রাধিকার দেন।

অন্যদিকে স্পেনের লুইস দে লা ফুয়েন্তে নতুন প্রজন্মের ফুটবলের প্রতীক। স্পেনের ঐতিহ্যবাহী টিকি-টাকা দর্শন ধরে রেখেও তিনি তাতে গতি, সরাসরি আক্রমণ এবং উচ্চমাত্রার প্রেসিং যুক্ত করেছেন। ফলে বর্তমান স্পেন শুধু বলের দখলেই সীমাবদ্ধ নয়; সুযোগ পেলেই দ্রুতগতির আক্রমণে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে সক্ষম।

২০২২ বিশ্বকাপের পর দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি লামিন ইয়ামাল, পেদ্রি, গাভি এবং নিকো উইলিয়ামসদের মতো তরুণ ফুটবলারদের ওপর আস্থা রাখেন। সেই সিদ্ধান্তই পরবর্তীতে স্পেনকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। ইউরো শিরোপা জয়ের পর বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠাও সেই পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন। দে লা ফুয়েন্তের দর্শনের মূল ভিত্তি হলো খেলোয়াড়দের স্বাধীনতা দেওয়া। তিনি বিশ্বাস করেন, সৃজনশীল ফুটবল খেলতে হলে ফুটবলারদের আত্মবিশ্বাসী হতে হবে এবং মাঠে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থাকতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল শুধু চারটি দেশের নয়, বরং চারটি ভিন্ন ফুটবল দর্শনের লড়াই। স্কালোনির দলগত ঐক্য, টুখেলের কৌশলগত প্রজ্ঞা, দেশমের বাস্তববাদী মানসিকতা এবং দে লা ফুয়েন্তের আক্রমণাত্মক সৌন্দর্য—সব মিলিয়ে বিশ্ব ফুটবল এক অনন্য কৌশলগত প্রতিযোগিতার সাক্ষী হতে যাচ্ছে।

বিশ্বকাপের মতো বড় টুর্নামেন্টে প্রতিটি ছোট সিদ্ধান্তও ম্যাচের ফল নির্ধারণ করতে পারে। কখন পরিবর্ত খেলোয়াড় নামানো হবে, কখন রক্ষণ শক্তিশালী করা হবে, কখন আক্রমণের গতি বাড়ানো হবে কিংবা কোন খেলোয়াড়কে নির্দিষ্ট দায়িত্ব দেওয়া হবে—এসব সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত ইতিহাস গড়ে দেয়। তাই আধুনিক ফুটবলে কোচদের ভূমিকা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী অপেক্ষা করছেন সেমিফাইনালের এই মহারণ দেখার জন্য। মাঠে মেসি, এমবাপ্পে, বেলিংহাম কিংবা লামিন ইয়ামালের মতো তারকারা নজর কাড়বেন ঠিকই, কিন্তু ম্যাচের অদৃশ্য চিত্রনাট্য লিখবেন ডাগআউটে দাঁড়িয়ে থাকা চারজন কোচ। শেষ পর্যন্ত কে পৌঁছাবেন বিশ্বকাপের ফাইনালে, সেটি নির্ধারণ করবে শুধু ফুটবলারদের পায়ের জাদু নয়, বরং কৌশল, নেতৃত্ব এবং দূরদর্শিতার সেই নীরব লড়াইও।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত