চট্টগ্রামে লোডশেডিংয়ে জনজীবনে চরম দুর্ভোগ

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ৪ বার

প্রকাশ: ৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চট্টগ্রাম নগরজুড়ে বিদ্যুৎ সংকট এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বড় দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে গ্যাসের তীব্র সংকটে রান্নাবান্না ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা হয়ে পড়েছে কঠিন। নগরবাসীর অভিযোগ, দিনে কয়েকবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে, কখন ফিরবে তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। অনেক এলাকায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হচ্ছে।

চট্টগ্রাম নগরের কাজীর দেউড়ি এলাকার বাসিন্দা কোহিনূর বেগমের কাছে এই পরিস্থিতি যেন একের পর এক দুর্ভোগের শৃঙ্খল। গ্যাসের চাপ কম থাকায় রান্নার কাজ ব্যাহত হচ্ছিল আগে থেকেই। এখন নতুন করে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহ। গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় অসুস্থ হয়ে পড়ছেন তিনি।

কোহিনূর বেগম বলেন, বিদ্যুৎ কখন আসে আর কখন চলে যায়, তার কোনো ঠিক নেই। একবার চলে গেলে এক থেকে দেড় ঘণ্টার আগে অনেক সময় ফিরে আসে না। গ্যাস না থাকায় রান্নার বিকল্প ব্যবস্থাও করা যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ থাকলে অন্তত কিছুটা সমাধান করা সম্ভব হতো, কিন্তু এখন দুই দিক থেকেই সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।

শুধু কোহিনূর বেগম নন, চট্টগ্রামের অধিকাংশ এলাকার মানুষ এখন একই সমস্যার মুখোমুখি। দিনের মধ্যে ছয় থেকে আটবার পর্যন্ত বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একেকবার লোডশেডিং স্থায়ী হচ্ছে আধা ঘণ্টা থেকে দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত। ফলে বাসাবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, অফিস ও ছোট শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আরেকটি ভোগান্তি—বিদ্যুতের বিল বৃদ্ধি। নগরবাসীর অভিযোগ, সরবরাহ অনিয়মিত হলেও মাস শেষে বিদ্যুৎ বিল কমছে না, বরং বাড়তি খরচের চাপ তৈরি হচ্ছে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কর্মকর্তারা বলছেন, জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ না পাওয়ার কারণেই চট্টগ্রামে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। বর্তমানে চট্টগ্রামে দিনে গড়ে আড়াই থেকে তিন শ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ঘাটতি রয়েছে। তবে পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময় জানাতে পারছেন না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

বিদ্যুৎ সংকটের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি। দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর একটি বড় অংশ গ্যাসনির্ভর। কিন্তু গ্যাসের সংকটের কারণে এসব কেন্দ্রে উৎপাদন কমে গেছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায়।

দেশে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। এর একটি পরিচালনা করে মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি এবং অন্যটি সামিট এলএনজি টার্মিনাল। গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এর পর একটি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়। এই ঘাটতির প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও।

চট্টগ্রামের আতুরার ডিপো এলাকার বাসিন্দা ও একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তা আমরিন আলমের দিন কাটছে অনিশ্চয়তায়। অফিস শেষে বাসায় ফিরে তিনি প্রায়ই দেখেন বিদ্যুৎ নেই। দিনের বেলায় অফিসেও কয়েকবার লোডশেডিংয়ের মুখে পড়তে হয়।

আমরিন বলেন, গ্যাসের চাপ না থাকায় রান্নার সমস্যা আগে থেকেই ছিল। এখন বিদ্যুৎ না থাকায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। রাতে রাইস কুকারে রান্না বসালেও বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় খাবার তৈরি করা যায় না। সারাদিন অফিস করার পর বাসায় ফিরে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া খুবই কষ্টকর।

শুধু গৃহস্থালি জীবন নয়, লোডশেডিংয়ের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ব্যবসা ও অফিস কার্যক্রমও। নগরের প্রবর্তক মোড় এলাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা জানান, তাঁদের অফিসে নিজস্ব জেনারেটরের ব্যবস্থা থাকলেও ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ হচ্ছে।

তিনি বলেন, এক দিনে ১১ বার পর্যন্ত বিদ্যুৎ চলে গেছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় সাড়ে ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না। একবার টানা দুই ঘণ্টার বেশি সময়ও লোডশেডিং হয়েছে। এতে অফিসের স্বাভাবিক কাজ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

চট্টগ্রামের লালখান বাজার এলাকার রিকশাচালক মোহাম্মদ শাহজাহানের দুর্ভোগ আরও ভিন্ন ধরনের। বয়স ও শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেও তাঁকে প্রতিদিন রিকশা চালাতে হয়। দিনের পরিশ্রম শেষে বাসায় ফিরে একটু বিশ্রামের সুযোগও পাচ্ছেন না বিদ্যুতের কারণে।

তিনি বলেন, গরমের মধ্যে সারাদিন রিকশা চালানোর পর রাতে ঘরে গিয়েও শান্তি নেই। বিদ্যুৎ না থাকলে গরমে ঘরে থাকা যায় না।

পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম অঞ্চলে মোট ২৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্রের সর্বোচ্চ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৪ হাজার ৮৯৮ মেগাওয়াট। চট্টগ্রামের রাউজান তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র ছাড়া অন্যান্য কেন্দ্র চালু রয়েছে। তবে স্থানীয় উৎপাদন তুলনামূলক ভালো থাকলেও জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বিতরণ দক্ষিণাঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন আহমেদ জানান, সোমবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রামে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১ হাজার ২৫০ মেগাওয়াট। বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে পাওয়া গেছে ৯৫০ মেগাওয়াট। ফলে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই ঘাটতির কারণেই লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে দেশে গ্যাস সংকট চলছে। এর প্রভাব বিদ্যুৎ উৎপাদনে পড়েছে। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতিও স্বাভাবিক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, কবে শেষ হবে এই ভোগান্তি? গ্যাস ও বিদ্যুতের দ্বৈত সংকটে চট্টগ্রামের মানুষ এখন অপেক্ষা করছে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার। কারণ বিদ্যুৎ শুধু আলো নয়, এটি এখন মানুষের রান্না, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ। দীর্ঘস্থায়ী এই সংকট সমাধানে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে জনদুর্ভোগ আরও বাড়বে বলে মনে করছেন নগরবাসী।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত