একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে জামায়াতকে ঘিরে নতুন বিতর্ক

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৩ বার
একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে জামায়াতকে ঘিরে নতুন বিতর্ক

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক ভূমিকা এবং স্বাধীনতার পর সেই অবস্থান নিয়ে দলটির ভেতরে দীর্ঘদিনের বিতর্ক আবারও সামনে এসেছে। রাজধানীর গুলশানে আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের স্মৃতিকথাভিত্তিক বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, সংসদীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকা ও অবস্থান সঠিক ছিল না—এমন অবস্থান দলটি মেনে নিয়েছে।

শুক্রবার সকালে অনুষ্ঠিত ওই অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী বলেন, একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক যে ক্ষমা চাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তা জামায়াতে ইসলামী গ্রহণ করলে অনেক প্রশ্নেরই সমাধান হয়ে যেত। একই সঙ্গে তিনি বইটির লেখকের রাজনৈতিক ও আইন অঙ্গনে দীর্ঘদিনের ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন। অনুষ্ঠানে জামায়াতের আইনজীবীদের উপস্থিত না থাকার বিষয়েও তিনি মন্তব্য করেন।

একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে জামায়াতের অবস্থান প্রসঙ্গে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের স্মৃতিকথায়ও দীর্ঘ আলোচনা রয়েছে। তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী: ইটস হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিকস’ বইয়ে তিনি দলটির অতীত অবস্থান, অভ্যন্তরীণ আলোচনা এবং ১৯৭১ সালের বিষয়টি নিয়ে ক্ষমা চাওয়ার বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেছেন। প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, দলটির ভেতরে একাধিকবার এ বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার বা ক্ষমা চাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলো শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।

আব্দুর রাজ্জাক দীর্ঘ সময় জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্বও পালন করেছেন। তাঁর স্মৃতিকথায় উঠে এসেছে, ১৯৭১ সালের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে দলটির নেতৃত্বের মধ্যে মতপার্থক্য ছিল এবং পরবর্তী সময়ে বিষয়টি মোকাবিলার জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৯০-এর দশক থেকে শুরু করে পরবর্তী বছরগুলোতে একাধিকবার দলীয় পর্যায়ে ক্ষমা চাওয়ার প্রস্তাব সামনে আসে।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৪ সালে গোলাম আযমের নাগরিকত্ব ফিরে পাওয়ার পরও এ ধরনের একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পরে ২০০১ সালের নির্বাচনের পরও আব্দুর রাজ্জাকের উদ্যোগে একটি খসড়া বিবৃতি তৈরি করা হয়, যেখানে ১৯৭১ সালে জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থানের বিষয়ে ব্যাখ্যা এবং জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার প্রস্তাব ছিল। তাঁর স্মৃতিকথার বর্ণনা অনুযায়ী, কয়েকজন দলীয় নেতা ওই উদ্যোগকে সমর্থন করেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত তা দলীয়ভাবে প্রকাশিত হয়নি। ২০০৫ সালেও বিষয়টি দলীয় পর্যায়ে আলোচনায় এলেও প্রস্তাবটি গৃহীত হয়নি বলে বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

১৯৭১ সালের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে জামায়াতের ঐতিহাসিক অবস্থান বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের বিষয়। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে দলটির অবস্থান এবং পরবর্তী সময়ে দলটির কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাগুলো এ বিতর্ককে আরও গভীর করেছে। আব্দুর রাজ্জাক তাঁর স্মৃতিকথায় দলটির রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন এবং পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর কর্মকাণ্ডের সঙ্গে দলটির অবস্থানকে আলাদা করার প্রয়োজনীয়তার কথাও লিখেছেন।

তবে কোনো রাজনৈতিক দলের অতীত ভূমিকা নিয়ে বর্তমান অবস্থান বোঝার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক দলিল, দলীয় সিদ্ধান্ত, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পদক্ষেপ—সবগুলো বিষয় বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে আব্দুর রাজ্জাকের স্মৃতিকথা একটি ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও দলীয় অভ্যন্তরের বিবরণ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এতে উপস্থাপিত প্রতিটি ব্যাখ্যাকে আলাদাভাবে ঐতিহাসিক বা রাজনৈতিক গবেষণার অন্যান্য উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।

আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের পাশাপাশি অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরীও জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে মন্তব্য করেন। তিনি দলটির ভেতরে বিভিন্ন ধরনের সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে বলে মত দেন। তাঁর বক্তব্যও মূলত দলটির বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান এবং অতীতের বিভিন্ন প্রশ্নের সঙ্গে সম্পর্কিত আলোচনার অংশ হিসেবে উঠে আসে।

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের বই প্রকাশের ঘটনাটি তাই কেবল একটি নতুন বই প্রকাশের আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত একটি প্রশ্ন আবারও প্রকাশ্য আলোচনায় এসেছে—১৯৭১ সালের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে জামায়াতে ইসলামী কীভাবে তার অতীতকে মূল্যায়ন করে এবং সেই মূল্যায়নের সঙ্গে বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানের কী সম্পর্ক রয়েছে।

আব্দুর রাজ্জাকের স্মৃতিকথায় দেখা যায়, তিনি দলটির নেতৃত্বকে একাত্তরের রাজনৈতিক ভূমিকার বিষয়টি স্পষ্টভাবে মোকাবিলা করার জন্য দীর্ঘ সময় ধরে চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নে দলটির ভেতরে মতভেদ ছিল। কেউ কেউ মনে করতেন, পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে অবস্থান নেওয়া সে সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভুল ছিল না। আবার অন্য পক্ষ মনে করেছিল, বাংলাদেশের স্বাধীনতার বাস্তবতা এবং ১৯৭১ সালের ঘটনাবলির পর দলটির উচিত ছিল নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করা।

এই অভ্যন্তরীণ বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে কোনো দলের অতীত সিদ্ধান্ত পরবর্তী প্রজন্মের কাছে কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৭১ একটি কেন্দ্রীয় অধ্যায় হওয়ায় এ সময়ের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান এখনো জনপরিসরে আলোচিত হয়। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কাছে রাজনৈতিক দলগুলোর ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে তাদের অবস্থান এবং পরবর্তী সময়ে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো রাজনৈতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

আব্দুর রাজ্জাক ২০১৯ সালে জামায়াতে ইসলামী থেকে পদত্যাগ করেন। তাঁর পদত্যাগের পেছনে একাত্তরের বিষয়টি মোকাবিলায় দলের ব্যর্থতার পাশাপাশি দলীয় সংস্কারের বিভিন্ন প্রশ্নও ভূমিকা রেখেছিল বলে তাঁর স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়। পরবর্তীতে তিনি নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হন। তাঁর রাজনৈতিক জীবন তাই জামায়াতে ইসলামী, ১৯৭১-এর ইতিহাস এবং বাংলাদেশের ইসলামভিত্তিক রাজনীতির পরিবর্তন নিয়ে আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছে।

বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠানকে ঘিরে আইনমন্ত্রীর মন্তব্যের ফলে সেই পুরোনো বিতর্ক নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ফিরে এসেছে। বিশেষ করে জামায়াতের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান, দলটির সাংগঠনিক পরিবর্তন এবং অতীতের প্রশ্নগুলোর সঙ্গে বর্তমান রাজনীতির সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে এসব বিষয়ে দলটির বর্তমান নেতৃত্বের অবস্থান, আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এবং ঐতিহাসিক নথিপত্রও বিবেচনায় নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৭১ এমন একটি অধ্যায়, যার সঙ্গে রাষ্ট্রের জন্ম, মানুষের আত্মত্যাগ এবং স্বাধীনতার সংগ্রাম সরাসরি যুক্ত। ফলে সে সময়ের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে যেকোনো বক্তব্য স্বাভাবিকভাবেই জনপরিসরে বিশেষ গুরুত্ব পায়। আইনমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মন্তব্য এবং আব্দুর রাজ্জাকের স্মৃতিকথায় উঠে আসা তথ্য সেই দীর্ঘ বিতর্কেরই নতুন একটি অধ্যায় সামনে এনেছে।

এখন আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে অতীতের সেই রাজনৈতিক অবস্থান কীভাবে মূল্যায়িত হবে, দলীয় পর্যায়ে এ নিয়ে কী ধরনের ব্যাখ্যা সামনে আসে এবং ইতিহাসের বিভিন্ন প্রশ্নের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো ভবিষ্যতে কীভাবে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে। এসব প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি দলিল, ইতিহাস ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আনুষ্ঠানিক অবস্থানের ভিত্তিতেই মূল্যায়ন করার সুযোগ থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত