প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরকে সামনে রেখে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে সরকারি পর্যায়ের যোগাযোগ আবারও সক্রিয় হয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুর এক প্রতিবেদনে কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, দুই দেশের কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীর নয়াদিল্লি সফরের সময়সূচি ও সম্ভাব্য আলোচ্যসূচি নির্ধারণে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নভেম্বর মাসে সফরের জন্য একটি উপযুক্ত সময় নির্ধারণের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে।
দুই দেশের সম্পর্কের সাম্প্রতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই এই নতুন কূটনৈতিক তৎপরতাকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে বাণিজ্য, পানি বণ্টন, সীমান্ত ও পারস্পরিক রাজনৈতিক আস্থার মতো দীর্ঘদিনের আলোচ্য বিষয়গুলোকে সামনে রেখে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যেই আলোচনা রয়েছে। সফরটি শেষ পর্যন্ত কবে এবং কীভাবে হবে, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক চূড়ান্ত ঘোষণা আসেনি। ফলে নভেম্বরের সম্ভাব্য সময়টি আপাতত আলোচনার পর্যায়েই রয়েছে।
দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকায় বাংলাদেশ ও ভারতের কর্মকর্তাদের মধ্যে ধারাবাহিক বৈঠক চলছে এবং সম্ভাব্য সফরের এজেন্ডা প্রস্তুতের কাজও এগোচ্ছে। এসব আলোচনায় দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যকে স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে। একই সঙ্গে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির নবায়ন নিয়েও আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের শেষ দিকে শেষ হওয়ার কথা থাকায় বিষয়টি দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চলতি মাসে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্ক সফর করবেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। এরপর অক্টোবর ও নভেম্বরজুড়ে তার একাধিক আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক কর্মসূচি রয়েছে। এসব কর্মসূচির মধ্য থেকে একটি উপযুক্ত সময় বের করে নয়াদিল্লি সফর আয়োজনের চেষ্টা চলছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে আগস্টেও প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে আলোচনা হয়েছিল, তবে তখন সফরের সময়সূচি চূড়ান্ত হয়নি। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছিল, দ্বিপাক্ষিক সফরের জন্য অনুকূল পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ।
সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর একাধিক বৈঠকও দুই দেশের যোগাযোগ বৃদ্ধির বিষয়টি সামনে এনেছে। তিনি বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এর মধ্যে পানিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমীনের সঙ্গে বৈঠকের কথাও প্রতিবেদনে এসেছে। এর আগে জুলাই ও আগস্টে ভারতীয় হাইকমিশনার প্রকাশ্যে বলেছিলেন, শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকের মাধ্যমে দুই দেশের বিভিন্ন অমীমাংসিত বিষয় নিয়ে অগ্রগতি সম্ভব এবং তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের বিষয়ে আশাবাদী।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বর্তমান পর্যায়টি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দুই দেশ দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্য, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, নদীর পানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা করে আসছে। একই সঙ্গে কিছু বিষয়ে মতপার্থক্যও রয়েছে। ফলে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য সফরকে কেবল আনুষ্ঠানিক সৌজন্য সফর হিসেবে না দেখে বিস্তৃত দ্বিপাক্ষিক আলোচনার একটি সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলেছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তার বিভিন্ন বক্তব্যকে ঘিরে ঢাকার প্রতিক্রিয়া। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশ ছাড়ার পর তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। আগস্টে তার একটি ভার্চুয়াল বক্তব্য বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার পক্ষ থেকে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়। এই বিষয়টি দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি সংবেদনশীল প্রশ্ন হিসেবে রয়ে গেছে।
অন্যদিকে, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ ছিল না। বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মকর্তা ও কূটনীতিকদের মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। ভারতের পক্ষ থেকেও প্রকাশ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার আগ্রহের কথা বলা হয়েছে। ফলে সাম্প্রতিক বিরোধ বা মতপার্থক্যের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোও আলোচনায় জায়গা পাচ্ছে।
সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল বলে ভারতীয় ও বাংলাদেশি বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ ওই সম্মেলনে কোনো প্রতিনিধি পাঠায়নি। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীরের বক্তব্য অনুযায়ী, ঢাকা এমন একটি সময়ে দ্বিপাক্ষিক সফরকে অগ্রাধিকার দিতে চায়, যখন দুই দেশের মধ্যে প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি হবে। এর ফলে বহুপাক্ষিক কোনো অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণের চেয়ে আলাদা দ্বিপাক্ষিক সফরকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার একটি কূটনৈতিক অবস্থানও স্পষ্ট হয়েছে।
সম্ভাব্য দিল্লি সফরের আলোচ্যসূচিতে গঙ্গার পানি বণ্টন বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে। বাংলাদেশ ও ভারত ৫৪টি অভিন্ন নদী ভাগ করে নেয়। পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা চলে আসছে। ভারতের পক্ষ থেকে এর আগে বলা হয়েছে, অভিন্ন নদীগুলোর পানি-সংক্রান্ত বিষয় বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক কাঠামোর মধ্যেই আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত।
বাণিজ্যও সম্ভাব্য বৈঠকের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে। রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে দুই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক যোগাযোগে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা কমিয়ে স্বাভাবিক কার্যক্রম জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বাংলাদেশের জন্য ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী ও বাণিজ্য অংশীদার। একইভাবে বাংলাদেশের বাজার, ভৌগোলিক অবস্থান ও আঞ্চলিক যোগাযোগ ভারতীয় অর্থনীতি ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন স্বার্থের সঙ্গেও যুক্ত।
তবে সম্ভাব্য সফরের ফলাফল কী হবে, তা এখনই নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। সফরের তারিখ, আলোচ্যসূচি কিংবা কোনো চুক্তি বা সমঝোতার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন প্রতিবেদন ও কূটনৈতিক সূত্রের তথ্যকে সম্ভাব্য পরিকল্পনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। দুই দেশের সম্পর্কের জটিল বিষয়গুলো এক বৈঠকে সমাধান হওয়ার সম্ভাবনাও সীমিত। বরং নিয়মিত রাজনৈতিক যোগাযোগ, কর্মকর্তা পর্যায়ের আলোচনা এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে ধাপে ধাপে অগ্রগতিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্ক বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির পাশাপাশি আঞ্চলিক রাজনীতি, অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গেও যুক্ত। সীমান্তের দুই পাশে ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, রোগী, পর্যটক ও বিভিন্ন পেশার মানুষের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। ফলে দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের স্থিতিশীলতা শুধু সরকারের কূটনৈতিক আলোচনার বিষয় নয়; এর প্রভাব পড়ে বাণিজ্য, যাতায়াত, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং সীমান্তবর্তী মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও।
এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য নয়াদিল্লি সফর সামনে রেখে নতুন করে সরকারি পর্যায়ের আলোচনা শুরু হওয়াকে দুই দেশের সম্পর্কের পরবর্তী পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক প্রস্তুতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। নভেম্বরের সম্ভাব্য সময় সামনে রেখে এখন মূল নজর থাকবে সফরের তারিখ চূড়ান্ত হওয়া, আলোচ্যসূচি নির্ধারণ এবং অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে দুই পক্ষ কতটা বাস্তবসম্মত অগ্রগতি করতে পারে তার ওপর। শেষ পর্যন্ত সফরটি কবে অনুষ্ঠিত হবে এবং সেখানে কী কী সিদ্ধান্ত আসে, সেটিই নির্ধারণ করবে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের পরবর্তী গতিপথের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।