চাকরি নিয়ে তদবিরে সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৩ বার
চাকরি নিয়ে তদবিরে সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নিজের চাকরিসংক্রান্ত কোনো বিষয়ে অন্য কাউকে দিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত তদবির করালে সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তদবিরের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর নির্ধারিত নথিপত্র বা ডোসিয়ারে সংরক্ষণ করা হবে। সরকারি চাকরিতে শৃঙ্খলা ও আচরণবিধি যথাযথভাবে অনুসরণের বিষয়টি নিশ্চিত করতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ নতুন করে এ নির্দেশনা দিয়েছে।

বৃহস্পতিবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এ-সংক্রান্ত একটি নির্দেশনাপত্র দেশের সব সচিব, মুখ্য সচিব, সিনিয়র সচিব, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে। এতে সরকারি কর্মচারীদের চাকরিসংক্রান্ত বিষয়ে তদবিরের প্রবণতা বন্ধে বিদ্যমান বিধিবিধান কঠোরভাবে অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সরকারি কর্মচারীরা কী ধরনের আচরণ করবেন, সে বিষয়ে সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এ সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, সরকারি কর্মচারীদের কারও কারও পক্ষে তাদের চাকরিসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে তদবির করতে বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তি বা ব্যক্তিরা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের কাছে যাচ্ছেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মতে, এ ধরনের তদবির সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

চাকরির ক্ষেত্রে বদলি, পদায়ন, পদোন্নতি, দায়িত্ব পরিবর্তন, ছুটি, চাকরির বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা কিংবা অন্য কোনো প্রশাসনিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত পাওয়ার জন্য ব্যক্তিগত প্রভাব বা বাইরের কোনো ব্যক্তির মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করার প্রবণতা প্রশাসনিক শৃঙ্খলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়। নতুন নির্দেশনায় এই ধরনের তদবিরকে নিরুৎসাহিত করার পাশাপাশি নিয়ম ভঙ্গের ক্ষেত্রে বিভাগীয় ব্যবস্থার বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।

সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। শুধু ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ থাকবে না; তদবিরের ঘটনাটিও কর্মচারীর ডোসিয়ারে সংরক্ষণ করা হবে। ফলে ভবিষ্যতে ওই কর্মচারীর চাকরিসংক্রান্ত নথি পর্যালোচনার সময় বিষয়টি প্রশাসনের বিবেচনায় আসতে পারে।

তবে নতুন নির্দেশনার অর্থ এই নয় যে সরকারি কর্মচারী নিজের চাকরিসংক্রান্ত কোনো বিষয়ে আবেদন করতে পারবেন না। বরং নির্ধারিত নিয়ম মেনে আবেদন করার সুযোগ বহাল রাখা হয়েছে। নির্দেশনায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারী তার চাকরিসংক্রান্ত বিষয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জমা দিতে পারবেন।

অর্থাৎ কোনো কর্মচারীর চাকরিসংক্রান্ত বৈধ বা যৌক্তিক দাবি থাকলে তা নির্ধারিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় উত্থাপন করা যাবে। তবে সেই আবেদনকে ব্যক্তিগত যোগাযোগ, প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত তদবিরের মাধ্যমে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা যাবে না। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নির্ধারিত চ্যানেল অনুসরণ করাই হবে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি।

নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, যথাযথ প্রক্রিয়ায় কোনো কর্মচারীর আবেদন পাওয়ার পর নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা কর্তৃপক্ষকে সর্বোচ্চ এক মাসের মধ্যে তা যৌক্তিকভাবে নিষ্পত্তি করতে হবে। এই সময়সীমার বিষয়টি সরকারি কর্মচারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ চাকরিসংক্রান্ত কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হলে অনেক ক্ষেত্রে কর্মচারীদের মধ্যে অনানুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ বা তদবিরের প্রবণতা তৈরি হতে পারে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন নিষ্পত্তির নির্দেশনা সেই পরিস্থিতি কমানোর একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

সরকারি চাকরিতে ব্যক্তিগত তদবিরের পরিবর্তে প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি প্রশাসনিক শৃঙ্খলার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। একজন কর্মচারীর বদলি, পদায়ন বা অন্য কোনো চাকরিসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত যদি নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পরিবর্তে ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা প্রভাবের মাধ্যমে প্রভাবিত হয়, তাহলে একই প্রতিষ্ঠানের অন্য কর্মচারীদের মধ্যে বৈষম্য বা অসন্তোষের অনুভূতি তৈরি হতে পারে। এ কারণে আচরণবিধিতে সরকারি কর্মচারীদের দায়িত্ব ও আচরণ সম্পর্কে নির্দিষ্ট কাঠামো রাখা হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাম্প্রতিক কার্যক্রমেও সরকারি কর্মচারীদের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং দাপ্তরিক কার্যক্রমকে নির্ধারিত কাঠামোর মধ্যে রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। সরকারি নথিতে প্রশাসন ও শৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিভাগীয় মামলা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শৃঙ্খলাবিষয়ক কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বের কথাও উল্লেখ রয়েছে।

নতুন নির্দেশনায় ‘তদবির’ বলতে বিশেষভাবে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে অন্য ব্যক্তির মাধ্যমে চাকরিসংক্রান্ত বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে যোগাযোগের বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে। ফলে নিয়মিত দাপ্তরিক আবেদন বা আপিলের সঙ্গে ব্যক্তিগত তদবিরকে এক করে দেখার সুযোগ নেই। কোনো কর্মচারীর যদি কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপত্তি থাকে বা কোনো দাবি থাকে, তাহলে তাকে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করার পথই অনুসরণ করতে হবে।

এ ধরনের নির্দেশনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সরকারি কর্মচারী বলতে শুধু সাধারণ পর্যায়ের কর্মচারীদের বোঝানো হয়নি। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, আইন অনুযায়ী কর্মকর্তারাও কর্মচারীর আওতাভুক্ত। ফলে পদমর্যাদা নির্বিশেষে সরকারি চাকরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেই আচরণবিধির এই বিধান প্রযোজ্য হবে।

সরকারি কর্মচারীদের চাকরির নিরাপত্তা ও অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নিয়ম, স্বচ্ছতা ও নির্ধারিত প্রক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কর্মচারী নিজের অধিকার বা চাকরিসংক্রান্ত বৈধ দাবি নিয়ে আবেদন করতে চাইলে তার জন্য নির্ধারিত ব্যবস্থা রয়েছে। সেই ব্যবস্থাকে কার্যকর রাখা এবং আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি করা প্রশাসনের দায়িত্বের অংশ।

একই সঙ্গে কর্মচারীদেরও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করার দায়িত্ব রয়েছে। কোনো আবেদন দীর্ঘদিন নিষ্পত্তি না হলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারী বিধি অনুযায়ী পরবর্তী কর্তৃপক্ষের কাছে যেতে পারবেন। কিন্তু ব্যক্তিগত পরিচয়, রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাব কিংবা অন্য কাউকে দিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ওপর চাপ সৃষ্টি করা হলে সেটি আচরণবিধির লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এ নির্দেশনা বাস্তবায়নের দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ। সচিবালয় থেকে মাঠ প্রশাসন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছে নির্দেশনা পাঠানোর ফলে মাঠপর্যায়ের সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি নজরদারির আওতায় আসবে।

সব মিলিয়ে নতুন নির্দেশনার মূল লক্ষ্য হচ্ছে সরকারি কর্মচারীদের চাকরিসংক্রান্ত বিষয়কে ব্যক্তিগত তদবিরের পরিবর্তে প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মধ্যে রাখা। কর্মচারীর বৈধ আবেদন করার অধিকার যেমন থাকছে, তেমনি সেই আবেদন নির্ধারিত পথে নিষ্পত্তির দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর থাকছে। অন্যদিকে, আবেদন বা দাবি আদায়ে অনাকাঙ্ক্ষিত তদবিরের আশ্রয় নেওয়া হলে তার প্রশাসনিক পরিণতির কথাও স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।

এখন এ নির্দেশনা মাঠপর্যায়ে কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং চাকরিসংক্রান্ত আবেদন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কতটা নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ তদবির বন্ধের পাশাপাশি কর্মচারীদের বৈধ দাবি দ্রুত ও ন্যায্যভাবে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা কার্যকর থাকলেই প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা আরও শক্তিশালী হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত