ঢাবির ছাত্রী হল ১১টায় বন্ধ, সাময়িক বরখাস্ত ৪ শিক্ষক

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৬ বার
ঢাবির ছাত্রী হল ১১টায় বন্ধ, সাময়িক বরখাস্ত ৪ শিক্ষক

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হলগুলোর গেট বন্ধের সময় এক ঘণ্টা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এখন থেকে রাত ১১টায় ছাত্রী হলগুলোর গেট বন্ধ হবে। এত দিন পর্যন্ত হলগুলোর প্রবেশদ্বার রাত ১০টায় বন্ধ করা হতো। একই সঙ্গে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে বিরোধিতার অভিযোগে তিন শিক্ষক এবং নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতা পূরণ না করে শিক্ষক হওয়ার অভিযোগে আরও একজন শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিন্ডিকেটের সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী সভার সিদ্ধান্তগুলোর বিষয়ে তথ্য জানিয়েছেন।

ছাত্রী হলের গেট বন্ধের সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্তটি দীর্ঘদিন ধরে নারী শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত দাবির সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে রাতের বেলায় ক্যাম্পাসের বাইরে একাডেমিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক কিংবা ব্যক্তিগত কাজে অংশ নেওয়ার পর হলে ফেরার ক্ষেত্রে সময়সীমা নিয়ে অসুবিধার কথা জানিয়ে আসছিলেন। গত ২৭ জুলাই ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীবৃন্দ’ প্ল্যাটফর্মের পক্ষ থেকে উপাচার্যের কাছে হলের প্রবেশের সময়সীমা বাড়ানোসহ কয়েকটি দাবিতে স্মারকলিপিও দেওয়া হয়েছিল।

পরবর্তীতে নারী শিক্ষার্থীদের হলগুলোতে আরও দীর্ঘ সময় প্রবেশাধিকার দেওয়ার দাবি নিয়ে বিভিন্ন মহলেও আলোচনা হয়। শিক্ষক নেটওয়ার্কের পক্ষ থেকেও ছাত্রী হলগুলোতে ২৪ ঘণ্টা প্রবেশাধিকারের দাবি তোলা হয়েছিল। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গেট বন্ধের সময় রাত ১০টা থেকে বাড়িয়ে রাত ১১টা করার সিদ্ধান্ত নিল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক জীবনে সময়সীমা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ক্লাস, গবেষণা, লাইব্রেরি, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, সংগঠন, টিউশন কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজে শিক্ষার্থীদের অনেক সময় রাত পর্যন্ত ক্যাম্পাসে থাকতে হয়। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে আবাসিক হলের নিরাপত্তা ও চলাচলের স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য রাখার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত সেই বাস্তবতার একটি অংশকে বিবেচনায় নেওয়ার উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে একই সিন্ডিকেট সভায় চার শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে, তারা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিরোধিতা করেছিলেন। প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এম ওয়াহিদুজ্জামান চাঁন, অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান এবং সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মশিউর রহমানের বিরুদ্ধে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এ সিদ্ধান্তের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের কেউ কেউ আপত্তি জানিয়েছেন। সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সাময়িক বরখাস্ত হওয়া অধ্যাপক মশিউর রহমান দাবি করেছেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভিত্তিহীন। তিনি বলেছেন, জুলাই আন্দোলনের সময় তিনি শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কোনো বক্তব্য দেননি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তকে তিনি মুক্তবুদ্ধির চর্চার পরিপন্থী বলেও মন্তব্য করেছেন।

অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমানও সিদ্ধান্তে হতাশা প্রকাশ করেছেন। তার দাবি, জুলাই আন্দোলনের সময় তিনি শিক্ষার্থীদের পক্ষেই ছিলেন। এমনকি তার বিভাগের এক শিক্ষার্থীকে জামিন করানোর জন্য তিনি থানায় গিয়েছিলেন বলেও জানিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, তার বিরুদ্ধে যে বিষয়গুলো উত্থাপন করা হয়েছে, তার মধ্যে সাত থেকে আট বছর আগের অভিযোগও রয়েছে।

অধ্যাপক এম ওয়াহিদুজ্জামান চাঁনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে, সাময়িক বরখাস্ত হওয়া চতুর্থ শিক্ষক সংগীত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. জিয়াউর রহমান, যিনি সায়েম রানা নামেও পরিচিত, তার বিরুদ্ধে ভিন্ন ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতা পূরণ না করেই তিনি শিক্ষক পদে নিয়োগ পেয়েছেন কি না, তা খতিয়ে দেখতে তার বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জিয়াউর রহমান ইসলামিক স্টাডিজ বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর এবং সংগীত বিষয়ে এমফিল ও পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন। তবে সংগীত বিভাগে শিক্ষক নিয়োগের সময় প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে সংগীত বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি বাধ্যতামূলক ছিল। এই শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়টি নিয়েই এখন তদন্ত করা হচ্ছে।

সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্তের অর্থ কোনো অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা প্রমাণিত হয়ে গেছে—এমন নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগের বিভিন্ন দিক যাচাই করার সুযোগ থাকে। ফলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা অভিযোগের বিরুদ্ধে নিজেদের বক্তব্য ও প্রমাণ উপস্থাপনের সুযোগ পাবেন। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তদন্ত ও পরবর্তী প্রক্রিয়ার ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের অধিকার, আবাসিক নিরাপত্তা, শিক্ষকদের জবাবদিহি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। একদিকে ছাত্রীদের হলের গেট বন্ধের সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবির আংশিক প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া, তদন্তের নিরপেক্ষতা এবং সংশ্লিষ্টদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হবে দুটি বিষয়েই আস্থা বজায় রাখা। ছাত্রী হলের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক চলাচলের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। একইভাবে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রমাণ যাচাই এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য বিবেচনায় নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ববিদ্যালয় কেবল শিক্ষা ও গবেষণার প্রতিষ্ঠান নয়; এটি তরুণদের চিন্তা, মতপ্রকাশ, স্বাধীনতা ও দায়িত্ববোধ বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিসর। তাই আবাসিক হলের সময়সীমা কিংবা শিক্ষকদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত—দুই ক্ষেত্রেই নিয়ম ও নিরাপত্তার পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অধিকার এবং মর্যাদার বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

ছাত্রী হলের গেট রাত ১১টায় বন্ধ করার সিদ্ধান্তে শিক্ষার্থীরা আগের তুলনায় কিছুটা বাড়তি সময় পাবেন। তবে ২৪ ঘণ্টা প্রবেশাধিকারের দাবি থেকে এটি এখনো এক ধাপ দূরের সিদ্ধান্ত। অন্যদিকে চার শিক্ষকের সাময়িক বরখাস্তের পর তদন্ত ও ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম কীভাবে এগোয়, সেটিও নজরে থাকবে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে।

সব মিলিয়ে একই সিন্ডিকেট সভায় নেওয়া দুই ধরনের সিদ্ধান্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসনিক বাস্তবতার দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এনেছে। শিক্ষার্থীদের আবাসিক সুবিধা ও নিরাপত্তার ভারসাম্য যেমন জরুরি, তেমনি শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ন্যায়সংগত ও স্বচ্ছ নিষ্পত্তিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আগামী দিনের সিদ্ধান্তগুলোতে এসব বিষয় কতটা গুরুত্ব পায়, তার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ ও প্রশাসনের প্রতি অংশীজনদের আস্থা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত