প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা ও ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যেই ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণের আগ্রহ প্রকাশ করেছে ভারত। ইরানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ককে নতুন বাস্তবতায় এগিয়ে নেওয়ার পথ খুঁজছে নয়াদিল্লি। তবে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, বিমা, পরিবহন ও অর্থায়নসংক্রান্ত জটিলতার কারণে এই লক্ষ্য বাস্তবায়ন কতটা সহজ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত ও বহুমুখী করার আগ্রহের কথা জানান। বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা, আঞ্চলিক পরিস্থিতি, শান্তি ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
বৈঠকের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী জানান, ইরানের সঙ্গে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারতের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আগামী দিনে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক পণ্যের পরিধি বাড়ানো এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও বহুমুখী করার সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করতে চায় ভারত।
এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অর্থনীতি ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের ওপর নতুন করে চাপ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ওয়াশিংটনের নতুন পদক্ষেপের আওতায় ইরানের সামরিক কার্যক্রম, জ্বালানি ও পেট্রোকেমিক্যাল খাতসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কঠোর নজরদারি ও নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব শুধু ইরানের ওপর সীমাবদ্ধ নেই; দেশটির সঙ্গে ব্যবসা করা বিদেশি প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদেরও নানা ধরনের আর্থিক ও বাণিজ্যিক জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
এই বাস্তবতায় ভারতের অবস্থান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে ভারত ও ইরানের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে আসছে। জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা, মধ্য এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক সংযোগ এবং আফগানিস্তানকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক সমীকরণে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থ রয়েছে।
ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য কীভাবে বাড়ানো সম্ভব হবে, সে বিষয়ে ভারতের পক্ষ থেকে এখনো বিস্তারিত কোনো পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়নি। তবে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি জানিয়েছেন, বিদ্যমান আন্তর্জাতিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নতুন সম্ভাবনা খুঁজে দেখার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, এমন বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্র চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হবে, যেখানে আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ মেনে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো সম্ভব।
তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে অর্থায়ন, ব্যাংকিং, বিমা, পরিবহন এবং লজিস্টিক ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠবে। আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিভিন্ন নিয়ম ও বিধিনিষেধ মেনে চলতে হয়। ফলে শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলেই বাণিজ্য দ্রুত বাড়ানো সম্ভব নয়; প্রয়োজন কার্যকর আর্থিক ও পরিবহন কাঠামো।
বর্তমানে ভারত ও ইরানের মধ্যে বাণিজ্যের একটি বড় অংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এসব প্রতিষ্ঠানকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক ব্যবস্থার জটিল নিয়ম মেনেই ব্যবসা করতে হয়। ফলে ইরানের ওপর নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে ভারতীয় ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
একসময় ভারত ও ইরানের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল অনেক বেশি বিস্তৃত। বিশেষ করে জ্বালানি খাতে ইরান ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে গত কয়েক বছরে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ভারত ও ইরানের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৭ দশমিক শূন্য ৩ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলারে। এই বড় পতন দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কতটা গভীর, তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
তবে বাণিজ্যিক সম্পর্কের পাশাপাশি ইরানের চাবাহার বন্দর ভারতীয় কৌশলগত পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভারত দীর্ঘদিন ধরে এই বন্দরের উন্নয়ন ও ব্যবহার নিয়ে আগ্রহী। চাবাহার বন্দরকে কেন্দ্র করে ভারত মধ্য এশিয়া ও আফগানিস্তানের সঙ্গে বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার সম্ভাবনা দেখছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চাবাহার শুধু একটি বন্দর নয়; এটি ভারতের আঞ্চলিক যোগাযোগ ও বাণিজ্য কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পাকিস্তানকে এড়িয়ে আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার বাজারের সঙ্গে সংযোগ তৈরির ক্ষেত্রে এই বন্দরের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ফলে ইরানের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বাড়লেও চাবাহার নিয়ে ভারতের আগ্রহ কমার সম্ভাবনা কম।
ভারতের পররাষ্ট্রসচিব জানিয়েছেন, চাবাহার বন্দরের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং বন্দরের কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনায় একটি টেকসই পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে। চাবাহার প্রকল্পে ভারত ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা থেকে ভারতের পাওয়া বিশেষ ছাড়ের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, ইরানের পক্ষ থেকেও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি বিজ্ঞান, সংস্কৃতি এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট অন্যান্য ক্ষেত্রেও দুই দেশের সম্পর্ক সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছে তেহরান।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞার প্রভাব মোকাবিলায় পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও সামনে এসেছে।
দুই নেতার বৈঠকে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যেকোনো ইতিবাচক প্রচেষ্টাকে সমর্থন করার কথা জানিয়েছে ভারত। বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে ভারত এমন একটি কূটনৈতিক অবস্থান ধরে রাখতে চাইছে, যেখানে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেও নিজের জাতীয় ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব হয়।
বিশকেক সফরে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গেও বৈঠক করেন নরেন্দ্র মোদি। সেখানে ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতির বিষয়টি আলোচনায় আসে। বিশেষ করে রাশিয়া থেকে ভারতের বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানির কারণে দুই দেশের বাণিজ্য ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
ভারতের পক্ষ থেকে রাশিয়ার বাজারে দেশটির রপ্তানি বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। মাংস, সামুদ্রিক পণ্য, দুগ্ধজাত পণ্যসহ বিভিন্ন ভারতীয় পণ্যের রুশ বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বাধা কমানোর চেষ্টা চলছে।
সব মিলিয়ে, ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ানোর ভারতের আগ্রহ শুধু অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আঞ্চলিক যোগাযোগ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক কৌশল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে নয়াদিল্লিকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হবে।
আগামী দিনে ভারত কীভাবে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণের বাস্তব পথ তৈরি করে, চাবাহার বন্দর নিয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রেখে তেহরানের সঙ্গে সহযোগিতা এগিয়ে নেয়—সেদিকেই এখন নজর থাকবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের। বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় ভারত-ইরান সম্পর্কের ভবিষ্যৎ শুধু দুই দেশের জন্য নয়, গোটা দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার ভূরাজনৈতিক সমীকরণের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।