প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার পণ্য আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম টানা তিন দিন ধরে বন্ধ রয়েছে। ভারতের ব্যবসায়ীদের ডাকা অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের কারণে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই স্থলবন্দরে কার্যত স্থবিরতা নেমে এসেছে। সীমান্তের দুই পাশে আটকা পড়েছে শত শত পণ্যবাহী ট্রাক, আর কাজ হারিয়ে বিপাকে পড়েছেন বন্দরের সঙ্গে জড়িত হাজারো শ্রমিক ও কর্মচারী।
টানা কয়েক দিনের এই অচলাবস্থায় সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সময়সংবেদনশীল ও পচনশীল পণ্য নিয়ে। নির্ধারিত সময়ে পণ্য বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারলে ব্যবসায়ীদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে যেসব ব্যবসায়ী ইতোমধ্যে ঋণপত্র বা এলসি খুলে পণ্য আমদানির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন, তাদের মধ্যেও অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর দুপুর পর্যন্ত ভারতীয় ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে ধর্মঘট প্রত্যাহার বা স্বাভাবিক বাণিজ্য কার্যক্রম চালুর বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। ফলে হিলি স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি কবে নাগাদ স্বাভাবিক হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভারতের হিলি এক্সপোর্টার অ্যান্ড কাস্টমস ক্লিয়ারিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের ডাকা এই আন্দোলনের মূল কারণ প্রশাসনিক জটিলতা ও বাণিজ্য পরিচালনায় বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার অভিযোগ। ভারতীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য স্থলবন্দরের তুলনায় হিলি সীমান্ত দিয়ে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে তারা তুলনামূলক বেশি সমস্যার মুখে পড়ছেন।
তাদের অভিযোগ, বিভিন্ন প্রশাসনিক কড়াকড়ি, বাণিজ্য পরিচালনায় জটিলতা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে হিলি স্থলবন্দর প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান হারাচ্ছে। এসব সমস্যার সমাধানের জন্য দীর্ঘদিন ধরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানানো হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের। এমন পরিস্থিতিতে গত ৩০ আগস্ট থেকে বাংলাদেশে সব ধরনের পণ্য রপ্তানি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ভারতের অংশ থেকে পণ্য রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের আমদানি কার্যক্রমেও। ফলে দুই দেশের মধ্যে এই সীমান্তপথে কার্যত বাণিজ্যিক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। প্রতিদিন যে বন্দরে ট্রাকের আনাগোনা, পণ্য খালাস এবং নানা ধরনের ব্যস্ততা দেখা যায়, সেখানে এখন অনেকটাই নীরব পরিবেশ বিরাজ করছে।
হিলি স্থলবন্দর শুধু বাংলাদেশ ও ভারতের ব্যবসায়ীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, এই বন্দরকে ঘিরে হাজারো মানুষের জীবিকা গড়ে উঠেছে। আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের পাশাপাশি কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং এজেন্ট, পরিবহন মালিক, চালক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন সেবাখাতের মানুষ এই বন্দরের ওপর নির্ভরশীল।
বাণিজ্য বন্ধ থাকায় সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছেন দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করা শ্রমিকরা। প্রতিদিন পণ্য খালাস ও পরিবহনের কাজ করে যাদের সংসার চলে, তিন দিন ধরে কাজ না থাকায় তাদের আয়ও বন্ধ হয়ে গেছে।
হিলি বন্দরের একাধিক শ্রমিক জানান, প্রতিদিনের উপার্জনের ওপরই তাদের পরিবারের খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজন নির্ভর করে। কয়েক দিন কাজ বন্ধ থাকলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। দীর্ঘ সময় এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে নিম্নআয়ের শ্রমিক পরিবারগুলোর মধ্যে আর্থিক সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরাও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। কারণ, অনেক ব্যবসায়ী ইতোমধ্যে ভারত থেকে পণ্য আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন। কিন্তু সীমান্তে বাণিজ্য বন্ধ থাকায় পণ্য নির্ধারিত সময়ে দেশে পৌঁছাতে পারছে না।
হিলি স্থলবন্দরের ব্যবসায়ী মহলের আশঙ্কা, শত শত পণ্যবাহী ট্রাক দীর্ঘ সময় আটকে থাকলে ব্যবসায়িক ক্ষতির পরিমাণ দ্রুত বাড়বে। বিশেষ করে কৃষিপণ্য ও অন্যান্য পচনশীল পণ্য দীর্ঘ সময় আটকে থাকলে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এতে একদিকে ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতি হবে, অন্যদিকে বাজারে পণ্যের সরবরাহেও প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশের হিলি কাস্টমস সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. শাহিনুর ইসলাম মণ্ডল জানিয়েছেন, ভারতীয় ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বন্দর চালুর বিষয়ে এখনো কোনো ইতিবাচক খবর পাওয়া যায়নি। টানা তিন দিন বাণিজ্য বন্ধ থাকায় বন্দরের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত সবাই ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
তার মতে, বাণিজ্যিক কার্যক্রম যত দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকবে, ক্ষতির পরিমাণ তত বাড়বে। কারণ, সীমান্ত বাণিজ্য একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। কয়েক দিনের স্থবিরতাও পণ্য সরবরাহ, পরিবহন এবং আর্থিক লেনদেনের পুরো ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের দিকে তাকিয়ে আছেন। দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাটে অনুষ্ঠিতব্য ওই বৈঠকে হিলি স্থলবন্দরের ব্যবসায়ীরা তাদের বিভিন্ন সমস্যা ও দাবির কথা তুলে ধরার প্রস্তুতি নিয়েছেন।
তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রশাসনিক জটিলতা দূর করা, বাণিজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে বিদ্যমান বাধা কমানো এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়নের দাবি তুলে ধরা হবে। ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদের সমস্যাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করলে ধর্মঘট প্রত্যাহারের পথ তৈরি হতে পারে।
ভারতের হিলি এক্সপোর্টার অ্যান্ড কাস্টমস ক্লিয়ারিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে তারা বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করলেও প্রত্যাশিত ফল পাননি। তাই দাবি আদায়ে বাণিজ্য বন্ধ রাখার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
তবে এই আন্দোলনের সরাসরি প্রভাব পড়ছে সীমান্তের দুই পাশের সাধারণ মানুষের ওপর। বাণিজ্য বন্ধের সিদ্ধান্ত ব্যবসায়িক দাবি আদায়ের একটি মাধ্যম হলেও এর কারণে কর্মহীন হয়ে পড়া শ্রমিকদের জন্য প্রতিটি দিনই কঠিন হয়ে উঠছে।
এদিকে সীমান্ত দিয়ে নতুন করে পণ্য আমদানি-রপ্তানি বন্ধ থাকলেও হিলি স্থল কাস্টমস স্টেশনের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। কাস্টমস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগে আমদানি করা পণ্যের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে নিয়ম অনুযায়ী খালাসের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।
অর্থাৎ, বাণিজ্যিক অচলাবস্থা থাকলেও কাস্টমসের প্রশাসনিক কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তবে নতুন পণ্যবাহী যানবাহন সীমান্ত অতিক্রম করতে না পারায় বন্দরের স্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্য অনেকটাই কমে গেছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা কারও জন্যই লাভজনক হবে না। কারণ, সীমান্ত বাণিজ্যের সঙ্গে শুধু দুই দেশের ব্যবসায়ী নয়, বিপুলসংখ্যক শ্রমজীবী মানুষ এবং বিভিন্ন পরিবহন ও সেবাখাত জড়িত। দ্রুত সমাধান না হলে এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে।
ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের প্রধান প্রত্যাশা এখন দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান। ভারতীয় অংশের প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন করে ধর্মঘট প্রত্যাহার হলে আবারও সচল হতে পারে হিলি স্থলবন্দর। সীমান্তের দুই পাশে অপেক্ষায় থাকা পণ্যবাহী ট্রাকগুলো চলাচল শুরু করলে স্বস্তি ফিরবে ব্যবসায়ী, শ্রমিক এবং বন্দরের সঙ্গে জড়িত হাজারো মানুষের জীবনে।
হিলি স্থলবন্দর বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের সীমান্ত বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তাই এই বন্দরে দীর্ঘ সময় বাণিজ্য বন্ধ থাকা শুধু স্থানীয় অর্থনীতির জন্য নয়, বৃহত্তর আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের জন্যও উদ্বেগের বিষয়।
এখন সবার চোখ প্রশাসনিক আলোচনার দিকে। ব্যবসায়ীদের দাবি নিয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হলে দ্রুত ধর্মঘট প্রত্যাহার এবং আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম পুনরায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যথায় অচলাবস্থা দীর্ঘ হলে সীমান্ত বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত হাজারো পরিবারের অনিশ্চয়তা আরও বাড়বে।