প্রকাশ: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ডলারের বিনিময় হার কয়েক দিনের ব্যবধানে বেড়ে যাওয়ায় দুই সপ্তাহ আগে ফরওয়ার্ড বুকিং করা আমদানিকারকরা এখন প্রতি ডলারে সর্বোচ্চ প্রায় ১ টাকা পর্যন্ত সুবিধা পাচ্ছেন। ব্যাংকারদের মতে, ১০ দিন আগে যেখানে ডলারের দর ছিল ১২২ টাকা, সেখানে ২৭ আগস্ট তা বেড়ে ১২৩ টাকা ৫০ পয়সায় উঠেছে।
ফলে ভবিষ্যৎ আমদানি বিল পরিশোধের জন্য আগেই ডলার হেজ করে রাখা ব্যবসায়ীরা বর্তমান বাজারদরের তুলনায় কম দামে বৈদেশিক মুদ্রা কিনে দায় পরিশোধের সুযোগ পাচ্ছেন। বিশেষ করে বড় পণ্য আমদানিকারক ও দ্রুত বিক্রয়যোগ্য ভোগ্যপণ্য বা এফএমসিজি ব্যবসায়ীরা ডলারের সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি কমাতে এই ধরনের চুক্তি করে থাকেন।
ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, ফরওয়ার্ড বুকিং আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত একটি পদ্ধতি। আমদানিকারকরা যখন মনে করেন ডলারের দর অস্থির অথবা আরও বাড়তে পারে, তখন তারা আগেই নির্ধারিত বিনিময় হারে ডলার বুক করে রাখেন।
ফরওয়ার্ড চুক্তিতে নির্ধারিত সময়ে বাজারদর চুক্তিতে নির্ধারিত দরের চেয়ে বেশি হলে আমদানিকারক লাভবান হন। তবে বাজারদর কমে গেলেও চুক্তিতে নির্ধারিত হারেই তাকে অর্থ পরিশোধ করতে হয়।
রেফাত উল্লাহ খান জানান, বর্তমানে ব্যাংকগুলো মূলত ভালো ট্র্যাক রেকর্ড এবং দীর্ঘদিনের ব্যাংকিং সম্পর্ক রয়েছে—এমন আমদানিকারকদের কাছ থেকেই ফরওয়ার্ড বুকিংয়ের আবেদন গ্রহণ করছে। অতিরিক্ত ফরওয়ার্ড বুকিং বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ব্যাংক এশিয়ার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরফান আলী বলেন, ফরওয়ার্ড বুকিংয়ের সুবিধা পাওয়ার নিশ্চয়তা ব্যবসায়ীদের আস্থা বাড়ায়। একটি সুষ্ঠু বৈদেশিক মুদ্রার বাজার নিশ্চিত করতে এ ব্যবস্থা যথাযথভাবে চালু রাখা প্রয়োজন।
বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানান, গত দুই সপ্তাহে তারা প্রায় এক মাস পর পরিশোধযোগ্য আমদানি ঋণপত্রের জন্য ডলার বুক করেছেন। ফলে ওই সময়ের মধ্যে ডলারের দর আরও বাড়লেও তাদের নির্ধারিত হারে অর্থ পরিশোধ করার সুযোগ থাকবে।
একটি শীর্ষস্থানীয় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা জানান, প্রতিষ্ঠানটি আগস্টে ৩০ দিনের জন্য ২ কোটি ডলার হেজ করেছে। এ ক্ষেত্রে প্রতি ডলারের নির্ধারিত দর ছিল ১২২ টাকা ৬০ পয়সা।
ডলার লক-ইনের ক্ষেত্রে ফরওয়ার্ড প্রিমিয়ামও গুরুত্বপূর্ণ। একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ নির্বাহী জানান, দুই সপ্তাহ আগে ডলারের দর ১২২ টাকায় নেমে আসার পর এক মাস পরের একটি পেমেন্টের জন্য তারা ডলার বুক করেন। ৩০ দিনের ফরওয়ার্ড প্রিমিয়াম যোগ করার পর কার্যকর বিনিময় হার দাঁড়ায় ১২২ টাকা ৬০ পয়সা।
অন্য একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা জানান, প্রায় একই সময়ে একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান এক মাস পরের পেমেন্টের জন্য ১২২ টাকা ২০ পয়সা দরে ডলার বুক করেছিল। ফরওয়ার্ড প্রিমিয়াম যোগ করার পর কার্যকর ব্যয় দাঁড়ায় ১২২ টাকা ৮০ পয়সা।
ব্যাংকারদের তথ্য অনুযায়ী, ১৩ আগস্ট ডলারের দর এক টাকা পর্যন্ত কমে যাওয়ার পর বিভিন্ন ব্যাংকে ফরওয়ার্ড বুকিংয়ের চাহিদা বেড়ে যায়। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ডলারের দর ধারাবাহিকভাবে কমে আসায় ব্যবসায়ীরা তখন তুলনামূলক কম দরে ভবিষ্যৎ পেমেন্টের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা নিশ্চিত করার সুযোগ নেন।
এর ফলে দুই সপ্তাহ আগে যারা ডলার বুক করেছিলেন, তারা এখন প্রতি ডলারে ১২৩ টাকার কম কার্যকর দরে তাদের পেমেন্ট নিষ্পত্তি করতে পারছেন। অথচ প্রায় এক মাস আগে একই ধরনের পেমেন্টের জন্য তাদের ১২৪ টাকার বেশি ব্যয় করতে হতো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের স্পট ডলার বাজারে সাম্প্রতিক অনুপস্থিতিও বিনিময় হারের ওঠানামায় প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা। তাদের মতে, ডলারের দর কমার সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনে হস্তক্ষেপ করলে দর আরও স্থিতিশীলভাবে ১২২ টাকার আশপাশে নামতে পারত।
ব্যাংকারদের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক সর্বশেষ ১২২ টাকা ৮০ পয়সা দরে ডলার কিনেছিল। এতে বাজারে ধারণা তৈরি হয়েছিল, এই পর্যায়ের কাছাকাছি এলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আবার ডলার কিনতে পারে। কিন্তু ২৭ আগস্ট পর্যন্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে নতুন করে ডলার কেনেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
অনেক ব্যাংকের এখনও তুলনামূলক উচ্চ নেট ওপেন পজিশন বা এনওপি রয়েছে। অর্থাৎ তাৎক্ষণিক লেনদেনের প্রয়োজনের তুলনায় তাদের হাতে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা রয়েছে। ফলে কম দরে ডলার বিক্রি করলে হাতে থাকা বৈদেশিক মুদ্রার মূল্য কমে গিয়ে লোকসানের আশঙ্কায় কিছু ব্যাংক বিক্রিতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে।
একজন ব্যাংকার বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারের বাইরে থাকলে ডলারের দর আরও কমতে পারে। তাই ব্যাংকগুলো এমন একটি পর্যায়ের দিকে নজর রাখছে, যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আবার ডলার কেনা শুরু করতে পারে।
অন্যদিকে, ডলারের দর বাড়ার সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিক্রেতা হিসেবেও বাজারে হস্তক্ষেপ করলে বাজারের কার্যকারিতা বাড়তে পারে বলে মনে করছেন কয়েকজন ব্যাংকার। এতে ব্যাংকগুলো অতিরিক্ত ডলার ধরে রাখতে নিরুৎসাহিত হবে এবং বিনিময় হার তুলনামূলক নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে রাখা সম্ভব হবে।
সরকারের বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধের বাধ্যবাধকতার পরিবর্তনও সাম্প্রতিক বাজার পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলছে। ব্যাংকারদের মতে, এক সপ্তাহের মধ্যে রেমিট্যান্সের বিনিময় হার প্রায় এক টাকা কমে ১২৩ টাকা ৬০ পয়সা থেকে ১২২ টাকা ৬০ পয়সায় নেমেছে। পরে তা আরও কমে ১২২ টাকায় দাঁড়ায়।
ব্যাংকাররা জানান, চলতি মাসে সরকারের ১০০ কোটি ডলারের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা পরিশোধের কথা রয়েছে। এর মধ্যে গত সপ্তাহেই প্রায় ৫০ কোটি ডলারের পেমেন্ট নিষ্পত্তি হয়েছে। এর আগে গত মাসে সরকার প্রায় ২০০ কোটি ডলারের পেমেন্ট করায় বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি হয়েছিল, যা ডলারের দর বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রেখেছিল।
তবে সরকারের কিছু এলসি পেমেন্ট চলতি সপ্তাহে নিষ্পত্তি হওয়ার কথা রয়েছে। এসব পেমেন্ট শেষ হলে ডলারের চাহিদা কমতে পারে বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা। এর ফলে বিনিময় হারের ওপর আরও নিম্নমুখী চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে বড় আমদানিকারকদের মধ্যে ডলারের ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে নতুন করে হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। ডলারের দর আরও কমবে—এমন প্রত্যাশা তৈরি হলে ফরওয়ার্ড বুকিংয়ের চাহিদা বাড়তে পারে। আবার বিপরীতে দর বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিলে আগাম ডলার হেজ করার প্রবণতাও শক্তিশালী হতে পারে।
সুতরাং, সাম্প্রতিক বাজারে ফরওয়ার্ড বুকিং শুধু আমদানিকারকদের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার হাতিয়ার নয়; ডলারের বিনিময় হার কোন দিকে যাবে, তার ওপর ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।