প্রকাশ: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দিলে বাংলাদেশ কোনো ঝুঁকির মুখে পড়বে না বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তাঁর মতে, প্রস্তাবিত এই নিরাপত্তা সহযোগিতায় যুক্ত হলেও অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় অংশীদার, জোট বা আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পরিসর সীমিত হবে না।
রোববার (৩০ আগস্ট) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত ড. আবদুল্লাহ জাফর বিন আবিয়াহর সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
হুমায়ুন কবির বলেন, ‘মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট’ একটি অনন্য উদ্যোগ, যা বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। প্রস্তাবিত চুক্তিটিকে ঢাকা ইতিবাচকভাবে দেখছে এবং এ বিষয়ে বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় অংশীদারের সঙ্গে আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে।
‘মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট’ বা ‘মক্কা চুক্তি’ ২০২৬ সালের ৭ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়। এ পর্যন্ত সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক এ চুক্তির অংশীদার হয়েছে।
বাংলাদেশ এই নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যোগ দিলে সম্ভাব্য ঝুঁকি তৈরি হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রেখেই বাংলাদেশ সমন্বিত ও নমনীয় পররাষ্ট্রনীতি এবং নিরাপত্তানীতি অনুসরণ করবে।
তিনি বলেন, বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত গতিশীল। বাংলাদেশের মতো একটি দেশের জন্য পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তা সহযোগিতার বিষয়গুলো অত্যন্ত সমন্বিত এবং নমনীয় পদ্ধতিতে পরিচালনা করা প্রয়োজন।
চুক্তির সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে হুমায়ুন কবির বলেন, কোনো প্রক্রিয়া শুরু করার আগেই শুধু ঝুঁকি নিয়ে চিন্তা করলে নতুন সুযোগের বিষয়টি বিবেচনা করা কঠিন হয়ে যায়। তাঁর মতে, এটি একটি নতুন ও স্বতন্ত্র উদ্যোগ, যার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, কোনো একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে নিরাপত্তা সহযোগিতায় যুক্ত হওয়া বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির বিকল্পগুলো সীমিত করবে না। একইভাবে অন্য কোনো জোট বা অংশীদারের সঙ্গে সহযোগিতার পথও এতে বন্ধ হবে না।
তিনি বলেন, বর্তমান অস্থিতিশীল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে একটি নির্দিষ্ট সহযোগিতামূলক কাঠামোর অংশ হওয়া মানেই অন্য দেশ বা জোটের সঙ্গে সম্পর্ক কমিয়ে দেওয়া নয়। বরং প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সহযোগিতার পরিসর বজায় থাকবে।
হুমায়ুন কবির বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রতি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, যেখানে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা শান্তি ও স্থিতিশীলতায় অবদান রাখতে পারে, সেখানে ঢাকা কাজ করে যাবে।
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর মতে, শান্তিরক্ষা বাংলাদেশের জন্য নতুন কোনো বিষয় নয়। দেশটি দীর্ঘদিন ধরে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বড় আকারের কন্টিনজেন্ট পাঠিয়ে আসছে এবং এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।
হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশ যদি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতায় অবদান রাখতে পারে, তাহলে মুসলিম বিশ্বের শান্তি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও অবদান রাখার সুযোগ থাকা উচিত।
সৌদি আরব দুই পবিত্র মসজিদের খাদেম হওয়ায় মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশটির উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখা বাংলাদেশের জন্য স্বাভাবিক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে বাংলাদেশ এখনো মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিক কোনো আমন্ত্রণ পায়নি বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ পাওয়া গেলে বিষয়টি প্রকাশ্যে জানানো হবে।
গত সপ্তাহে অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন (ওআইসি) এর ২৩তম বিশেষ পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরিষদের বৈঠকে যোগ দিতে জেদ্দা সফর করেন হুমায়ুন কবির। সেখানে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদসহ দেশটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন তিনি।
জেদ্দায় এসব বৈঠকে প্রস্তাবিত প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়টি আলোচনায় এসেছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং তাঁর আলোচনাসঙ্গীদের প্রতিক্রিয়া ছিল ইতিবাচক।
সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠককে ‘অত্যন্ত ফলপ্রসূ’ হিসেবে বর্ণনা করে হুমায়ুন কবির জানান, সেখানে বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
ওআইসি বৈঠকের ফাঁকে কাতার, কুয়েত ও মালদ্বীপের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিদের সঙ্গেও তিনি বৈঠক করেন। এসব বৈঠকের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও জোরদার করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
হুমায়ুন কবির বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের সদিচ্ছার উপস্থিতি এখন দৃশ্যমান। এই সদিচ্ছাকে কাজে লাগিয়ে এ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে আরও শক্তিশালী ও ফলপ্রসূ সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব।
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের ইতিবাচক অবস্থানের পেছনে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অর্জিত দক্ষতা নতুন ধরনের বহুপক্ষীয় নিরাপত্তা সহযোগিতায় কাজে লাগানো যেতে পারে।
চুক্তিতে বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত যুক্ত হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, বিষয়টি নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে এবং সম্ভাব্য অংশীদারদের সঙ্গে যোগাযোগ ইতিবাচকভাবেই এগোচ্ছে।