অপরাধ-আইনি দ্বন্দ্বে কারিনা-পৃথ্বীরাজের ‘দায়রা’

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১ বার
অপরাধ-আইনি দ্বন্দ্বে কারিনা-পৃথ্বীরাজের ‘দায়রা’

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বলিউডে ভিন্নধর্মী গল্প ও সামাজিক বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে নির্মিত সিনেমার তালিকায় নতুন সংযোজন হতে যাচ্ছে ‘দায়রা’। আলোচিত নির্মাতা মেঘনা গুলজারের পরিচালনায় নির্মিত এই থ্রিলার সিনেমার ট্রেলার ইতোমধ্যে প্রকাশ পেয়েছে। ট্রেলার প্রকাশের পর সিনেমাটির গল্প, চরিত্র এবং দুই কেন্দ্রীয় অভিনেতার অভিনয় নিয়ে দর্শকদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সিনেমাটিতে প্রধান দুই চরিত্রে অভিনয় করেছেন বলিউড অভিনেত্রী কারিনা কাপুর খান ও দক্ষিণ ভারতের জনপ্রিয় অভিনেতা পৃথ্বীরাজ সুকুমারন।

পুলিশি ক্ষমতার ব্যবহার, যৌন অপরাধ, ব্যক্তিগত প্রতিশোধ এবং আইনের সীমারেখা—এমন একাধিক সংবেদনশীল বিষয়কে গল্পের কেন্দ্রে রেখেছেন নির্মাতা। আগামী ১৮ সেপ্টেম্বর প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়ার কথা রয়েছে সিনেমাটির।

‘দায়রা’র ট্রেলার দেখলে বোঝা যায়, প্রচলিত অ্যাকশন কিংবা অপরাধভিত্তিক গল্পের বাইরে গিয়ে নির্মাতা ন্যায়বিচারের ধারণাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছেন। একজন অপরাধের বিচার কীভাবে পাবে, সেই সিদ্ধান্ত কি কেবল আইনের কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি পরিস্থিতির চাপে কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারে—গল্পের গুরুত্বপূর্ণ দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে এই প্রশ্নকে ঘিরেই।

সিনেমায় কারিনা কাপুর খানকে দেখা যাবে একজন নীতিবান, দায়িত্বশীল এবং নিয়ম মেনে চলা পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে। তার কাছে আইনের সীমারেখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অপরাধী যতই ভয়ংকর হোক, তাকে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই বিচারের মুখোমুখি করতে হবে—এমন বিশ্বাস থেকেই তিনি দায়িত্ব পালন করেন। অন্যদিকে পৃথ্বীরাজ সুকুমারনের চরিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন মানসিকতার। তিনি মনে করেন, অপরাধের দ্রুত জবাব দিতে প্রয়োজনে প্রচলিত আইনি কাঠামোর বাইরেও যেতে হতে পারে।

এই দুই বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গির সংঘাতই ‘দায়রা’র মূল আকর্ষণ হিসেবে সামনে এসেছে। একজন বিশ্বাস করেন আইনই শেষ কথা, অন্যজন মনে করেন কখনো কখনো আইন তার কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে ব্যর্থ হলে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপই ন্যায়বিচারের পথ তৈরি করতে পারে। ফলে দুজনের পেশাগত অবস্থান একই হলেও ন্যায়বিচার সম্পর্কে তাদের ধারণা একেবারেই আলাদা।

ট্রেলারে এই দ্বন্দ্বের পাশাপাশি পুলিশের কর্মকাণ্ড এবং অপরাধ তদন্তের নানা দিকও তুলে ধরা হয়েছে। যৌন অপরাধের মতো স্পর্শকাতর একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে গল্প এগিয়ে যাওয়ায় সিনেমাটিতে আবেগ, ক্ষোভ ও ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি আইনের জটিলতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দর্শকের সামনে প্রশ্ন রাখা হয়েছে, একজন অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার একজন সদস্য কতদূর যেতে পারেন এবং সেই সীমা অতিক্রম করলে তার দায় কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।

মেঘনা গুলজার এর আগেও সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে সিনেমার গল্পে রূপ দিয়েছেন। ‘রাজি’র মাধ্যমে তিনি দর্শকদের সামনে দেশপ্রেম, গুপ্তচরবৃত্তি ও ব্যক্তিগত ত্যাগের গল্প তুলে ধরেছিলেন। পরবর্তী কাজগুলোতেও বাস্তবতার সঙ্গে আবেগ এবং চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বকে গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। ‘দায়রা’তেও সেই নির্মাণশৈলীর ছাপ থাকার ইঙ্গিত মিলেছে ট্রেলারে।

কারিনা কাপুর খানের জন্যও সিনেমাটি অভিনয়ের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। দীর্ঘ অভিনয় ক্যারিয়ারে তিনি রোমান্টিক, কমেডি, পারিবারিক ও থ্রিলার—বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তবে ‘দায়রা’য় তার চরিত্রের মধ্যে কঠোর পেশাদারিত্বের পাশাপাশি নৈতিক অবস্থানের দৃঢ়তা তুলে ধরা হয়েছে। ট্রেলারে সংলাপ ও অভিব্যক্তির মাধ্যমে চরিত্রটির চাপ, দায়িত্ববোধ এবং সিদ্ধান্তের সংকট ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা দেখা গেছে।

অন্যদিকে পৃথ্বীরাজ সুকুমারনের উপস্থিতি সিনেমাটিতে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রে দীর্ঘদিন ধরে সফল এই অভিনেতা বিভিন্ন ধরনের জটিল ও শক্তিশালী চরিত্রে অভিনয়ের জন্য পরিচিত। ‘দায়রা’য় তার চরিত্রটি প্রচলিত নায়কোচিত ধারণার বাইরে। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর ও আক্রমণাত্মক এক পুলিশ কর্মকর্তার ভূমিকায় তাকে দেখা যাবে। অপরাধীর বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রবণতা এবং নিয়মের বাইরে যাওয়ার মানসিকতা চরিত্রটিকে আরও বিতর্কিত করে তুলেছে।

বিশেষ করে এনকাউন্টার কিলিংয়ের প্রসঙ্গ সিনেমাটির গল্পে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে অপরাধীর মৃত্যু সবসময় কি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে, নাকি বিচারব্যবস্থার নির্ধারিত প্রক্রিয়া এড়িয়ে গেলে তা নতুন ধরনের অন্যায়ের জন্ম দিতে পারে—এমন প্রশ্ন সিনেমাটির আলোচনায় আসতে পারে। ব্যক্তিগত প্রতিশোধ যখন দায়িত্বের সঙ্গে মিশে যায়, তখন একজন পুলিশ কর্মকর্তার সিদ্ধান্ত কতটা নিরপেক্ষ থাকে, সেটিও গল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক বলে মনে হচ্ছে।

ট্রেলার প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সিনেমাটি নিয়ে দর্শকদের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে কারিনা ও পৃথ্বীরাজের মুখোমুখি অভিনয় এবং গল্পের অন্ধকার আবহ দর্শকদের কৌতূহলী করেছে। দুজনের চরিত্র যে একই ঘটনার বিষয়ে সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান নেবে, সেটিই সিনেমার নাটকীয়তার বড় উৎস হতে পারে।

‘দায়রা’র আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর বিষয়বস্তুর বাস্তবতা। আইন ও ন্যায়বিচার নিয়ে সমাজে দীর্ঘদিন ধরেই নানা বিতর্ক রয়েছে। অপরাধের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি যেমন রয়েছে, তেমনি আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করার ঝুঁকি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সিনেমাটি এই দুই অবস্থানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে একজন পুলিশ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত বিবেক, পেশাগত দায়িত্ব এবং নৈতিকতার সংঘাতকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে।

সিনেমার গল্পে যৌন অপরাধের প্রসঙ্গ থাকায় ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এ ধরনের অপরাধের তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের ওপর যে মানসিক চাপ তৈরি হয়, সিনেমাটি সেই বাস্তবতাকেও সামনে আনতে পারে। একই সঙ্গে অপরাধ দমনের নামে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রয়োগ কতটা গ্রহণযোগ্য, সেই প্রশ্নও দর্শকদের ভাবাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কারিনা ও পৃথ্বীরাজের মতো দুই অভিজ্ঞ অভিনেতাকে একই সিনেমায় বিপরীত আদর্শের চরিত্রে হাজির করায় ‘দায়রা’ নিয়ে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তবে ট্রেলার কোনো সিনেমার পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের সুযোগ দেয় না। গল্পের শেষ পর্যন্ত নির্মাতা কীভাবে ন্যায়বিচার, আইন এবং ব্যক্তিগত প্রতিশোধের দ্বন্দ্বের সমাধান করেন, সেটিই মুক্তির পর সিনেমাটির মূল আলোচনার বিষয় হতে পারে।

সব মিলিয়ে ‘দায়রা’ শুধু একটি অপরাধ-থ্রিলার হিসেবে নয়, বরং ন্যায়বিচারের সংজ্ঞা ও আইন প্রয়োগের সীমা নিয়ে প্রশ্ন তোলা একটি সিনেমা হিসেবে দর্শকদের সামনে হাজির হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। মেঘনা গুলজারের নির্মাণশৈলী, কারিনা কাপুর খানের সংযত অভিনয় এবং পৃথ্বীরাজ সুকুমারনের তীব্র চরিত্রায়ণ—এই তিনটি উপাদান সিনেমাটিকে আলোচনায় রাখার মতো করে তুলেছে। আগামী ১৮ সেপ্টেম্বর প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির পরই বোঝা যাবে, ট্রেলারে তৈরি হওয়া প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে পারে ‘দায়রা’।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত