আগস্টে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ বেড়েছে ৭২ শতাংশ: এমএসএফ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৯ বার
আগস্টে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ বেড়েছে ৭২ শতাংশ: এমএসএফ

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশে নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনায় উদ্বেগজনক পরিস্থিতির চিত্র উঠে এসেছে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) সর্বশেষ প্রতিবেদনে। সংস্থাটির জুলাই ও আগস্ট মাসের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে ৭২ শতাংশ। একই সময়ে নারী ও শিশু হত্যা, আত্মহত্যা, অপহরণ ও নিখোঁজের ঘটনাসহ বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা বৃদ্ধির তথ্যও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

সোমবার, ৩১ আগস্ট প্রকাশিত এমএসএফের প্রতিবেদনে জুলাই ও আগস্ট মাসের বিভিন্ন মানবাধিকার পরিস্থিতির তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতার মোট ঘটনা জুলাই মাসের ৩০৬টি থেকে আগস্টে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২৭টিতে। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে এ ধরনের ঘটনা বেড়েছে ২১টি, যা শতকরা হিসাবে প্রায় ৬ দশমিক ৮ শতাংশ।

সংখ্যার এই বৃদ্ধি শুধু পরিসংখ্যানের বিষয় নয়, বরং প্রতিটি ঘটনার পেছনে রয়েছে ব্যক্তি ও পরিবারের নিরাপত্তাহীনতা, ক্ষতি এবং দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ও সামাজিক প্রভাব। বিশেষ করে নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা বাড়ার তথ্য দেশের আইনশৃঙ্খলা, সামাজিক সচেতনতা এবং ভুক্তভোগীদের সুরক্ষার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে।

প্রতিবেদনে নারী ও শিশু হত্যার ঘটনায় সবচেয়ে বড় বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। জুলাই মাসে নারী ও শিশু হত্যার ঘটনা ছিল ৫২টি, যা আগস্টে বেড়ে ৯১টিতে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ এক মাসে এ ধরনের ঘটনা ৩৯টি বেড়েছে, যা প্রায় ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধির সমান।

এমএসএফের তথ্য অনুযায়ী, সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পাশাপাশি ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাও আগস্টে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে ৭২ শতাংশ এবং ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা বেড়েছে ৬৭ শতাংশ।

মানবাধিকার সংগঠনটির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, একই সময়ে আত্মহত্যার ঘটনা বেড়েছে ৩৯ শতাংশ। অপহরণ ও নিখোঁজের ঘটনা বেড়েছে ৮ শতাংশ এবং বেআইনি সালিশের ঘটনা বেড়েছে ৩৩ শতাংশ। মাদক মামলায় আটকের ঘটনাও জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে ১২৯ শতাংশ বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার পাশাপাশি বিভিন্ন ঘটনায় আইনবহির্ভূত সামাজিক বিচার বা সালিশের অভিযোগও মানবাধিকার পরিস্থিতির জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। প্রতিবেদনে এমন কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মোকাবিলা না করে স্থানীয় পর্যায়ে সালিশের মাধ্যমে নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এমএসএফের প্রতিবেদনে গাইবান্ধার একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে ধর্ষণের অভিযোগের এক ঘটনায় ভুক্তভোগী নারীকে অভিযুক্ত ব্যক্তির সঙ্গে সাত লাখ টাকা দেনমোহরে বিয়ে দেওয়ার অভিযোগের কথা তুলে ধরা হয়েছে। মানবাধিকারকর্মীদের মতে, ধর্ষণ বা যৌন সহিংসতার মতো গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা, সম্মতি ও ন্যায়বিচারের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমন ঘটনায় সামাজিক চাপের মাধ্যমে সমঝোতা বা বিয়ের ব্যবস্থা করা হলে ভুক্তভোগীর অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

নোয়াখালীর একটি ঘটনার তথ্যও প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছে। সেখানে ১১ বছরের এক শিশুকে যৌন হয়রানির অভিযোগকে কেন্দ্র করে গ্রাম্য সালিশে শিশুটিকে ৫০ বেত্রাঘাত এবং ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগটি সত্য হলে শিশু অধিকার ও মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি গুরুতর উদ্বেগের কারণ।

অন্যদিকে শরীয়তপুরে ১২ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের ঘটনায় স্থানীয় সালিশে এক লাখ টাকার বিনিময়ে মীমাংসার অভিযোগও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে আর্থিক সমঝোতার চেষ্টা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রশ্নে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি করে।

আগস্ট মাসে তিনটি জীবিত নবজাতককে পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধারের তথ্যও দিয়েছে এমএসএফ। এসব ঘটনায় নবজাতকের প্রকৃত অভিভাবক এবং পরিত্যাগের পেছনের কারণ শনাক্ত করা জরুরি বলে প্রতিবেদনে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠনটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, এ ধরনের ঘটনায় প্রকৃত অভিভাবক বা দায়ীদের শনাক্ত করতে কার্যকর তদন্ত এবং তাঁদের আইনের আওতায় আনার ঘটনা তুলনামূলকভাবে বিরল। ফলে অনেক ক্ষেত্রে অপরাধের প্রকৃত কারণ, দায়ী ব্যক্তি এবং ঘটনার পেছনের সামাজিক বাস্তবতা পুরোপুরি সামনে আসে না।

আগস্টে অনলাইন জুয়া-সংক্রান্ত ঘটনাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এমএসএফের হিসাবে, অনলাইন জুয়াকে কেন্দ্র করে সংঘটিত ঘটনায় একজন নিহত, একজন আহত এবং চারজনকে আটক করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, লালমনিরহাটে অনলাইন জুয়ার প্রতিবাদ করাকে কেন্দ্র করে এক শিক্ষক নিহত এবং একজন আহত হন।

এ ছাড়া অনলাইন জুয়া-সংক্রান্ত ঘটনায় নেত্রকোনা, যশোর, রংপুর ও ঢাকায় একজন করে মোট চারজন আটকের তথ্য দেওয়া হয়েছে। প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে অনলাইনভিত্তিক অপরাধ ও অবৈধ কার্যক্রমের বিস্তার নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে উদ্বেগ বাড়ছে। মানবাধিকার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আলোচনায় এসব নতুন ধরনের অপরাধও ক্রমে গুরুত্ব পাচ্ছে।

এমএসএফের প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্যগুলো দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির একটি মাসভিত্তিক পর্যবেক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে মানবাধিকার সংস্থার সংগৃহীত পরিসংখ্যান এবং সরকারি অপরাধ পরিসংখ্যানের মধ্যে পদ্ধতিগত পার্থক্য থাকতে পারে। তাই ঘটনাগুলোর সংখ্যা ও বৃদ্ধির হার মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার পর্যবেক্ষণ কাঠামোকেও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

তবু নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা, হত্যা, যৌন নির্যাতন এবং বেআইনি সালিশের অভিযোগ নিয়ে একটি মানবাধিকার সংস্থার এমন পর্যবেক্ষণ সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত তদন্ত, ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা এবং আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

মানবাধিকার পরিস্থিতির সঙ্গে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নয়, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের দায়িত্বও জড়িত। সহিংসতা প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর দ্রুত ও কার্যকর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।

নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে অপরাধের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা অনেক সময় সামাজিক ভয়, পারিবারিক চাপ এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে অভিযোগ জানাতে পারেন না। ফলে প্রকৃত ঘটনার সংখ্যা প্রকাশিত পরিসংখ্যানের চেয়েও বেশি হতে পারে বলে বিভিন্ন মানবাধিকারকর্মী দীর্ঘদিন ধরে আশঙ্কা প্রকাশ করে আসছেন।

বিশেষ করে যৌন সহিংসতার ঘটনায় ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করার সামাজিক প্রবণতা এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার দীর্ঘ প্রক্রিয়া অনেককে আইনি সহায়তা নেওয়া থেকে বিরত রাখতে পারে। এ কারণে ভুক্তভোগীবান্ধব তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে।

এমএসএফের সর্বশেষ প্রতিবেদনে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ৭২ শতাংশ বৃদ্ধির যে তথ্য উঠে এসেছে, তা নারী নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে নারী ও শিশু হত্যার ঘটনা প্রায় ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধির তথ্য পরিস্থিতির আরও গভীর বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, প্রশাসন এবং বিচারব্যবস্থার পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধও এ ধরনের অপরাধ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পরিবার ও সমাজে নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি, ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে দ্রুত সহায়তা এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

অপরাধের পর স্থানীয়ভাবে বেআইনি সালিশ বা আর্থিক সমঝোতার পরিবর্তে প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা প্রয়োজন বলেও মানবাধিকার সংশ্লিষ্টরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন। কারণ গুরুতর অপরাধের ঘটনায় আইনের বাইরে সমাধানের চেষ্টা ভবিষ্যতে অপরাধের পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

সব মিলিয়ে, জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা বৃদ্ধির যে চিত্র এমএসএফের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, তা দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে গভীরভাবে ভাবার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যৌন সহিংসতার অভিযোগের দ্রুত তদন্ত, বেআইনি সালিশ বন্ধ করা এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতি শুধু অপরাধের সংখ্যা কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; প্রতিটি নাগরিক যেন নিরাপদে জীবনযাপন করতে পারেন এবং অপরাধের শিকার হলে ন্যায়বিচার পান, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আগস্ট মাসের তথ্য সেই দায়িত্বের কথাই নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত