কুমিল্লায় হত্যা মামলায় স্বামী-স্ত্রীর যাবজ্জীবন

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৪ বার
কুমিল্লায় হত্যা মামলায় স্বামী-স্ত্রীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কুমিল্লার চান্দিনায় জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে এক নারীকে হত্যার ঘটনায় স্বামী-স্ত্রীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে দণ্ডপ্রাপ্ত দুজনকে ১০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড করা হয়েছে। অর্থদণ্ড অনাদায়ে তাদের প্রত্যেককে আরও দুই মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। একই মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় অপর এক আসামিকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে।

সোমবার, ৩১ আগস্ট কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ প্রথম আদালতের বিচারক মিথিলা ইসলাম এ রায় ঘোষণা করেন। কুমিল্লার অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মো. ইসমাইল মিয়া রতন রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার মহিচাইল বারইপাড়া এলাকার মৃত ক্ষিতিশ দাশের ছেলে সমির চন্দ্র দাশ এবং তাঁর স্ত্রী রূপালী রাণী দাশ। আদালতের রায়ে দুজনকেই শিল্পী রাণী দাশ হত্যা মামলায় দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।

একই মামলায় বকুল রাণী দাশ নামে অপর এক আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় আদালত তাঁকে খালাস দিয়েছেন। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া, সাক্ষ্য গ্রহণ এবং মামলার বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনার পর আদালত এই রায় দেন।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, ঘটনাটি ঘটে ২০১৮ সালের ১০ জানুয়ারি সকালে। চান্দিনা উপজেলার মহিচাইল এলাকায় একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে জায়গা-জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে ওই ঘটনার সূত্রপাত হয়।

সেদিন সকাল সাড়ে ৭টার দিকে জমি সংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে একই বাড়ির রনজিৎ চন্দ্র দাশ ও তাঁর স্ত্রী শিল্পী রাণী দাশের সঙ্গে অপর পক্ষের কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। পারিবারিক বিরোধের এই পরিস্থিতি একপর্যায়ে সংঘর্ষে রূপ নেয় বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে সমির চন্দ্র দাশ, তাঁর স্ত্রী রূপালী রাণী দাশ এবং বকুল রাণী দাশ ধারালো অস্ত্র দিয়ে রনজিৎ চন্দ্র দাশ ও শিল্পী রাণী দাশের ওপর হামলা করেন। হামলায় দুজনই গুরুতর আহত হন।

স্থানীয় লোকজন আহতদের উদ্ধার করে দ্রুত চান্দিনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক শিল্পী রাণী দাশকে মৃত ঘোষণা করেন। অন্যদিকে আহত রনজিৎ চন্দ্র দাশ চিকিৎসা নেন।

একটি জমি নিয়ে বিরোধ যে শেষ পর্যন্ত প্রাণঘাতী ঘটনায় রূপ নেবে, তা হয়তো ওই পরিবারের কেউই কল্পনা করেননি। পারিবারিক ও প্রতিবেশী বিরোধের জেরে সংঘটিত সহিংসতার এমন ঘটনা সমাজে জমি সংক্রান্ত বিরোধের ভয়াবহ পরিণতির বিষয়টিও সামনে নিয়ে আসে।

নিহত শিল্পী রাণী দাশের মৃত্যুর পর পরিবারের সদস্যরা গভীর শোকের মধ্যে পড়েন। ঘটনার পর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। নিহতের ভাসুর নিতাই চন্দ্র দাশ বাদী হয়ে তিনজনকে আসামি করে চান্দিনা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।

মামলা দায়েরের পর পুলিশ ঘটনার তদন্ত শুরু করে। তদন্তের দায়িত্ব পান এসআই মো. শাহজাহান। তদন্ত শেষে তিনি ২০১৮ সালের ১৮ আগস্ট আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

এরপর মামলাটি বিচারিক প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে সাক্ষ্য গ্রহণ, বিভিন্ন তথ্য ও প্রমাণ পর্যালোচনা এবং আইনি যুক্তিতর্কের মধ্য দিয়ে মামলার শুনানি সম্পন্ন হয়।

রাষ্ট্রপক্ষের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মো. ইসমাইল মিয়া রতন জানিয়েছেন, মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের ১৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। এসব সাক্ষ্য, মামলার অন্যান্য প্রমাণ এবং স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিসহ সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে আদালত রায় দিয়েছেন।

আদালত সমির চন্দ্র দাশ ও রূপালী রাণী দাশের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করেন এবং তাদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। একই সঙ্গে প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়। জরিমানার অর্থ পরিশোধ না করলে তাদের আরও দুই মাস করে বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।

তবে একই মামলায় অভিযুক্ত বকুল রাণী দাশের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণের জন্য পর্যাপ্ত সাক্ষ্য ও প্রমাণ না পাওয়ায় আদালত তাঁকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন। একই মামলায় ভিন্ন ভিন্ন আসামির ক্ষেত্রে আদালতের এই সিদ্ধান্ত বিচারিক প্রক্রিয়ায় সাক্ষ্য-প্রমাণের গুরুত্বকে সামনে এনেছে।

রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন না বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী। ফলে রায়ের পর তাদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাংলাদেশে জমি সংক্রান্ত বিরোধ দীর্ঘদিন ধরেই পারিবারিক ও সামাজিক সংঘাতের অন্যতম কারণ হিসেবে পরিচিত। জমির মালিকানা, দখল, সীমানা এবং উত্তরাধিকার নিয়ে বিরোধ অনেক সময় পারিবারিক সম্পর্ককে তিক্ত করে তোলে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব বিরোধ সহিংসতায় রূপ নেয় এবং প্রাণহানির মতো ঘটনাও ঘটে।

আইনজীবী ও সংশ্লিষ্টদের মতে, জমি নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে সহিংসতার পথ এড়িয়ে আইনি ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধানের চেষ্টা করা জরুরি। কারণ একটি মুহূর্তের উত্তেজনা কখনো কখনো একটি পরিবারের পুরো ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে।

শিল্পী রাণী দাশ হত্যা মামলার ঘটনাও সেই কঠিন বাস্তবতার একটি উদাহরণ। পারিবারিক বিরোধ থেকে শুরু হওয়া সংঘর্ষে একজন নারীর প্রাণহানি ঘটে এবং পরে দীর্ঘ আট বছরের বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মামলাটির রায় আসে।

এই দীর্ঘ সময়ে নিহতের পরিবারকে অপেক্ষা করতে হয়েছে বিচারিক সিদ্ধান্তের জন্য। অন্যদিকে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণের জন্য তদন্ত, সাক্ষ্য এবং আদালতের আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত আদালত দুইজনকে দোষী সাব্যস্ত করলেও একজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাঁকে খালাস দেওয়া হয়েছে।

বিচারিক ব্যবস্থায় এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ যে, অভিযোগ ওঠা মাত্র কাউকে দোষী হিসেবে বিবেচনা করা হয় না; আদালতে সাক্ষ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরই শাস্তি দেওয়া হয়। একই কারণে এই মামলায় একজন আসামি খালাস পেয়েছেন, অন্যদিকে দুজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

কুমিল্লার চান্দিনার এই হত্যা মামলার রায় স্থানীয় পর্যায়েও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিনের একটি হত্যাকাণ্ডের মামলায় আদালতের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল।

রাষ্ট্রপক্ষ জানিয়েছে, মামলায় উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও অন্যান্য তথ্য আদালত বিস্তারিতভাবে বিবেচনা করেছেন। তবে রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিলের সুযোগ রয়েছে এবং মামলার পরবর্তী আইনি কার্যক্রম প্রচলিত আইন অনুযায়ী চলবে।

সব মিলিয়ে, ২০১৮ সালে জমি সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে সংঘটিত শিল্পী রাণী দাশ হত্যা মামলায় আট বছর পর আদালতের দেওয়া এই রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আদালত দুই আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন এবং একজনকে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় খালাস দিয়েছেন।

জমি নিয়ে বিরোধের মতো পারিবারিক ও সামাজিক সমস্যাগুলো দ্রুত আইনগত ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধানের প্রয়োজনীয়তাও এই ঘটনা নতুন করে সামনে এনেছে। কারণ বিরোধ ও উত্তেজনা যখন সহিংসতায় রূপ নেয়, তখন তার ক্ষতি শুধু একটি পক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং একটি পরিবারের সদস্য, স্বজন এবং পুরো সমাজকেই দীর্ঘ সময় এর পরিণতি বহন করতে হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত