ধানমন্ডিতে ৩৮ লাখ টাকা ছিনতাই, গ্রেপ্তার ৩

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১ বার
ধানমন্ডিতে ৩৮ লাখ টাকা ছিনতাই, গ্রেপ্তার ৩

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর ধানমন্ডিতে স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে লক্ষ্য করে পরিকল্পিতভাবে ৩৮ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগে তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। স্বর্ণ কেনাবেচার প্রলোভন দেখিয়ে আগে থেকে পরিচয় তৈরি করার পর ব্যবসায়ীকে নির্ধারিত স্থানে ডেকে এনে অস্ত্রের মুখে টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। ঘটনার পর ভুক্তভোগীর তৎপরতা, স্থানীয়দের সহযোগিতা এবং জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করার পর পুলিশের দ্রুত পদক্ষেপে তিন সন্দেহভাজনকে আটক করা সম্ভব হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটি ঘটে গত রোববার দুপুরে ধানমন্ডির ১২ নম্বর সড়কে। ভুক্তভোগী স্বর্ণ ব্যবসায়ী খোরশেদ আলম ব্যাংক থেকে ৩৮ লাখ টাকা তুলে স্বর্ণ কেনার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁর গতিবিধি আগে থেকেই নজরে রেখেছিল একটি সংঘবদ্ধ চক্র। নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী মোটরসাইকেলে এসে কয়েকজন তাঁর পথরোধ করে এবং অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে টাকাভর্তি ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়।

ঘটনার আকস্মিকতায় প্রথমে হতভম্ব হয়ে পড়লেও খোরশেদ আলম দ্রুত দুর্বৃত্তদের পিছু নেন। এ সময় ঘটনাস্থল ও আশপাশের মানুষের মধ্যেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পালিয়ে যাওয়ার সময় মোটরসাইকেলে থাকা এক ব্যক্তি ভারসাম্য হারিয়ে রাস্তায় পড়ে যান বলে জানিয়েছে পুলিশ। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় তাঁকে আটক করা হয়।

আটক ব্যক্তিকে ঘিরে পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পর জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়। খবর পেয়ে ধানমন্ডি থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযানে নামে। পুলিশের তৎপরতায় প্রথমে তানভীর আবেদীন ওরফে জুঁই নামে একজনকে আটক করা হয়। এরপর তদন্ত ও প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তার অন্য দুই ব্যক্তি হলেন মজিবুর রহমান এবং জাকির হোসেন ওরফে ক্যাপ্টেন জাকির। পুলিশের দাবি, তাদের কাছ থেকে চার রাউন্ড গুলিসহ একটি রিভলভার জব্দ করা হয়েছে। এ ঘটনায় একটি বড় সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত থাকতে পারে বলে ধারণা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, ঘটনাটি আকস্মিক কোনো ছিনতাইয়ের ঘটনা ছিল না। বরং ব্যবসায়ীকে লক্ষ্য করে আগে থেকেই একটি পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছিল। প্রায় এক মাস আগে খোরশেদ আলমের সঙ্গে জাকিরের পরিচয় হয় বলে তদন্তে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, জাকির নিজেকে সাবেক সেনা কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিয়ে ব্যবসায়ীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করেন।

পরিচয়ের পর ধীরে ধীরে স্বর্ণ কেনাবেচা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। একপর্যায়ে ব্যবসায়িক লেনদেনের কথা বলে খোরশেদ আলমকে বিপুল পরিমাণ টাকা নিয়ে আসতে বলা হয়। পুলিশ বলছে, এই পরিকল্পনার মাধ্যমে ব্যবসায়ীকে এমন পরিস্থিতিতে নেওয়া হয়, যেখানে তিনি ব্যাংক থেকে নগদ টাকা তুলে নির্ধারিত স্থানে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের ধারণা, ব্যাংক থেকে টাকা তোলার বিষয়টিও চক্রের সদস্যদের জানা ছিল। খোরশেদ আলম ব্যাংক থেকে ৩৮ লাখ টাকা তুলে বের হওয়ার পর তাঁর গতিবিধির ওপর নজর রাখা হয়। পরে পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্ধারিত এলাকায় পৌঁছানোর সময় মোটরসাইকেলে থাকা সদস্যরা তাঁকে ঘিরে ফেলে।

অভিযোগ অনুযায়ী, দুর্বৃত্তরা অস্ত্র ঠেকিয়ে তাঁর কাছ থেকে টাকাভর্তি ব্যাগ ছিনিয়ে নেয় এবং দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগের চেষ্টা করে। কিন্তু টাকা নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার পরও খোরশেদ আলম তাদের পিছু ছাড়েননি। তাঁর এই তৎপরতাই ঘটনাটির মোড় ঘুরিয়ে দেয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পুলিশ জানায়, পালানোর সময় তানভীর আবেদীন ওরফে জুঁই মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে পড়ে যান। এরপর স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতায় তাঁকে আটক করা সম্ভব হয়। একই সময় মজিবুর রহমানকেও আটক করা হয়। পরে আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ দক্ষিণখান থানা এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে।

অভিযানের একপর্যায়ে জাকির হোসেন ওরফে ক্যাপ্টেন জাকিরকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের ধারণা, ব্যবসায়ীর সঙ্গে প্রাথমিক পরিচয় তৈরি এবং স্বর্ণ কেনাবেচার প্রস্তাব দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

ধানমন্ডি থানা পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ৮ থেকে ১০ সদস্যের একটি চক্র জড়িত থাকতে পারে। গ্রেপ্তার তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে চক্রের অন্য সদস্যদের পরিচয় ও অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চলছে। এ ছাড়া ছিনিয়ে নেওয়া অর্থ উদ্ধারের বিষয়েও তদন্ত চলছে।

ধানমন্ডি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইমদাদুল ইসলাম জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার তিনজনের বিরুদ্ধে ডাকাতি ও অস্ত্র আইনে পৃথক দুটি মামলা করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

রাজধানীতে ব্যবসায়ীদের লক্ষ্য করে পরিকল্পিত অপরাধের ঘটনা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বড় অঙ্কের নগদ অর্থ বহনের সময় একজন ব্যক্তির নিরাপত্তা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে, এই ঘটনাটি সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে। তদন্তে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, ভুক্তভোগীর সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে পরিচয় তৈরি এবং ব্যবসায়িক আস্থার সুযোগ নেওয়ার অভিযোগটি ঘটনাটিকে আরও গুরুতর করে তুলেছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা সাধারণত বড় অঙ্কের নগদ অর্থ বহনের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। পরিচিত বা নতুন ব্যবসায়িক অংশীদারের সঙ্গে লেনদেনের ক্ষেত্রেও যথাযথ যাচাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। কারণ সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র অনেক সময় বিশ্বাস ও পরিচয়ের সুযোগ নিয়ে পরিকল্পিত অপরাধ সংঘটিত করে।

এই ঘটনায় জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে দ্রুত পুলিশকে জানানো এবং পুলিশের তাৎক্ষণিক সাড়া দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করা হলে অপরাধীদের শনাক্ত ও আটকের সম্ভাবনা বাড়ে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ভুক্তভোগী খোরশেদ আলমের জন্য ঘটনাটি ছিল কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। স্বর্ণ কেনার উদ্দেশ্যে ব্যাংক থেকে বৈধভাবে তোলা বিপুল অঙ্কের টাকা নিয়ে বের হওয়ার পর এমন হামলার শিকার হওয়া তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও ব্যবসায়িক জীবনে বড় ধরনের ধাক্কা হয়ে এসেছে। তবে দুর্বৃত্তদের পিছু নেওয়া এবং ঘটনাটি দ্রুত প্রকাশ্যে আসার কারণে পুলিশ অল্প সময়ের মধ্যে তদন্তে অগ্রসর হতে পেরেছে।

পুলিশ এখন পুরো ঘটনার পরিকল্পনাকারী, সহযোগী এবং অর্থ বহনের তথ্য কীভাবে চক্রের কাছে পৌঁছেছিল, তা খতিয়ে দেখছে। ব্যবসায়ীর ব্যাংক থেকে টাকা তোলার খবর কোনোভাবে আগে থেকে চক্রের কাছে ছিল কি না, নাকি তাঁকে অনুসরণ করেই এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়েছে—এসব প্রশ্নও তদন্তের অংশ হতে পারে।

এ ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত প্রক্রিয়া চলবে এবং তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অন্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হওয়ার বিষয়টি বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে।

ধানমন্ডির ব্যস্ত এলাকায় দিনের বেলায় অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ৩৮ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রাজধানীর নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। একই সঙ্গে দ্রুত পুলিশি তৎপরতায় তিনজনকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় অপরাধী চক্রের বাকি সদস্যদেরও দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।

পুলিশ বলছে, এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্য সদস্যদের শনাক্ত করতে অভিযান চলছে। ছিনিয়ে নেওয়া অর্থ উদ্ধারের পাশাপাশি চক্রটির কার্যক্রম, পূর্বের কোনো অপরাধে তাদের সম্পৃক্ততা এবং অন্য ব্যবসায়ীদের একই ধরনের ফাঁদে ফেলার অভিযোগ রয়েছে কি না, সেসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে ধানমন্ডির এই ঘটনা একটি পরিকল্পিত অপরাধের চিত্র সামনে এনেছে, যেখানে ব্যবসায়িক পরিচয় ও বিশ্বাসকে ব্যবহার করে বিপুল অর্থ ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীর তৎপরতা, স্থানীয়দের সহযোগিতা এবং ৯৯৯-এ দ্রুত ফোন করার পর পুলিশের অভিযান ঘটনায় দ্রুত অগ্রগতির সুযোগ তৈরি করেছে। এখন তদন্তের মূল লক্ষ্য চক্রটির অন্য সদস্যদের গ্রেপ্তার করা এবং ছিনিয়ে নেওয়া ৩৮ লাখ টাকা উদ্ধার করা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত