প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইউক্রেন যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার ওপর জোর দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে ‘আমার বন্ধু’ বলে সম্বোধন করে তিনি বলেছেন, মানবতার স্বার্থে ইউক্রেনের সংঘাতের অবসান প্রয়োজন। একই সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে যেকোনো শান্তি উদ্যোগে ভারতের সমর্থন অব্যাহত থাকবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
সোমবার (৩১ আগস্ট) কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) সম্মেলনের ফাঁকে পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে এসব কথা বলেন মোদি। দুই নেতার এই বৈঠকে ইউক্রেন যুদ্ধের পাশাপাশি ভারত ও রাশিয়ার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং পারস্পরিক স্বার্থের বিভিন্ন বিষয় গুরুত্ব পায়।
বৈঠকের শুরুতেই পুতিনকে বন্ধুত্বপূর্ণভাবে সম্বোধন করেন মোদি। তিনি বলেন, ভারত ও রাশিয়ার সম্পর্কের ক্ষেত্রে দুই দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘদিনের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার বিষয়েও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
ইউক্রেন যুদ্ধ প্রসঙ্গে মোদি বলেন, যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, মানবতার অগ্রগতি তত বাধাগ্রস্ত হবে। অন্যদিকে শান্তির দিকে নেওয়া প্রতিটি পদক্ষেপ মানুষের মধ্যে নতুন আশার সৃষ্টি করে। তাই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের পরিবর্তে যুদ্ধ বন্ধ করে শান্তি প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে যেসব শান্তি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, ভারত সেগুলোকে সমর্থন করে এসেছে এবং ভবিষ্যতেও এ ধরনের উদ্যোগে সমর্থন অব্যাহত রাখবে। তার বক্তব্যে যুদ্ধের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
মোদির এই অবস্থান এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নানা কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা সংঘাতের ফলে বিপুল প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি এবং অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়েছে। খাদ্য, জ্বালানি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপরও যুদ্ধের নানা ধরনের প্রভাব তৈরি হয়েছে।
বৈঠকে মোদির বক্তব্যের জবাবে পুতিন তাকে ধন্যবাদ জানান এবং বলেন, রাশিয়া এই পথেই এগিয়ে যাচ্ছে। রাশিয়ার সরকারি সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা যায়, বৈঠকে পুতিন ইউক্রেন যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন।
তবে যুদ্ধের অবসান নিয়ে মস্কো ও কিয়েভের অবস্থানের মধ্যে এখনও বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। রাশিয়া বিভিন্ন সময়ে জানিয়েছে, নিজেদের নির্ধারিত শর্তের ভিত্তিতে তারা সংঘাতের অবসান নিয়ে আলোচনায় প্রস্তুত। অন্যদিকে ইউক্রেন রাশিয়ার বিভিন্ন শর্তকে প্রত্যাখ্যান করে আসছে। কিয়েভের দৃষ্টিতে এসব শর্তের কিছু অংশ দেশটির সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার জন্য গ্রহণযোগ্য নয়।
ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ভারত একটি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। একদিকে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে, অন্যদিকে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গেও ভারতের কৌশলগত সম্পর্ক ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে ইউক্রেন সংকটের ক্ষেত্রে নয়াদিল্লি সরাসরি কোনো পক্ষের সঙ্গে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে যুক্ত না করে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ওপর জোর দিয়ে আসছে।
বিশেষ করে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের জ্বালানি বাণিজ্য এই সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো মস্কোর ওপর একাধিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ফলে রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানির বাজারে পরিবর্তন আসে এবং ভারত ও চীনের মতো বড় ক্রেতাদের কাছে রুশ তেল বিক্রি মস্কোর অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ভারতীয় অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার দিক থেকেও রাশিয়ার সঙ্গে এই বাণিজ্য নয়াদিল্লির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তুলনামূলকভাবে কম দামে রুশ জ্বালানি আমদানি ভারতের জ্বালানি চাহিদা পূরণে ভূমিকা রেখেছে। তবে একই সঙ্গে এই বাণিজ্য নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন সময়ে কূটনৈতিক আলোচনা ও চাপ তৈরি হয়েছে।
এর মধ্যেই মোদি ও পুতিনের বৈঠক দুই দেশের সম্পর্কের ধারাবাহিকতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ভারতের শান্তির আহ্বান এবং রাশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক—দুই বিষয়ই নয়াদিল্লির বর্তমান পররাষ্ট্রনীতির ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানকে সামনে নিয়ে এসেছে।
মোদি বৈঠকে ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের অর্থনৈতিক দিকেরও প্রশংসা করেন। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও অন্যান্য অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে বলে মনে করে উভয় পক্ষ। ভারত দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পাশাপাশি জ্বালানি, বাণিজ্য ও প্রযুক্তি খাতে সম্পর্ক বজায় রেখে আসছে।
অন্যদিকে পুতিনের সঙ্গে মোদির ব্যক্তিগত সম্পর্কও দুই দেশের কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে দুই নেতাকে একাধিকবার সরাসরি আলোচনায় দেখা গেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের মতো জটিল আন্তর্জাতিক সংকটের মধ্যেও এই যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
তবে মোদির বক্তব্যকে সরাসরি যুদ্ধের অবসানের কোনো নতুন চুক্তি বা সমঝোতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মূলত ভারতের দীর্ঘদিনের অবস্থানেরই পুনরুল্লেখ—সংঘাতের পরিবর্তে সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে নয়াদিল্লির অবস্থান।
বিশ্ব রাজনীতিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই বিভিন্ন দেশ সংঘাতের অবসানের জন্য কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে। ভারতও সেই বৃহত্তর আন্তর্জাতিক আলোচনার অংশ হিসেবে শান্তির পক্ষে নিজের অবস্থান তুলে ধরছে।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাশিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্বও শক্তিশালী রাখা। ইউক্রেন যুদ্ধ এই ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে নয়াদিল্লির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পরীক্ষা হয়ে আছে।
বিশকেকে মোদি-পুতিন বৈঠকে তাই শুধু দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কই নয়, ইউক্রেন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়েও আন্তর্জাতিক মনোযোগ ছিল। মোদির বার্তা ছিল স্পষ্ট—যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে মানবিক ক্ষতি বাড়বে, আর শান্তির পথে অগ্রসর হওয়াই মানুষের জন্য অধিক কল্যাণকর।
পুতিনের পক্ষ থেকেও মোদির বক্তব্যের প্রতি ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। তবে যুদ্ধের বাস্তব অবসান ঘটাতে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে গ্রহণযোগ্য সমঝোতা এবং কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন হবে। সেই প্রক্রিয়ায় ভারত কতটা ভূমিকা রাখতে পারে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সম্মতি এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।
ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রত্যাশা থাকলেও সংঘাতের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত জটিলতা এখনও বহাল। এর মধ্যেই রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে শান্তির পক্ষে ভারতের আহ্বান আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নয়াদিল্লির স্বতন্ত্র অবস্থানকেই আবারও সামনে এনেছে।