প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
তিন মাসের দীর্ঘ বিরতির পর আবারও সবার জন্য উন্মুক্ত হলো বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর থেকে জেলে, বাওয়ালি, মৌয়াল ও পর্যটকদের জন্য বনটিতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। প্রতিবছরের মতো এবারও মাছ ও বন্যপ্রাণীর প্রজনন, বংশবৃদ্ধি এবং স্বাভাবিক বিচরণ নিশ্চিত করতে তিন মাস সুন্দরবনে মানুষের প্রবেশ ও বিভিন্ন ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখা হয়েছিল।
গত ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত চলা এ নিষেধাজ্ঞার সময় সুন্দরবনের নদী-খাল ছিল অনেকটাই মানুষের কোলাহলমুক্ত। বন্ধ ছিল মাছ ধরা, কাঁকড়া আহরণ, মধু সংগ্রহ এবং পর্যটন কার্যক্রম। দীর্ঘ তিন মাস মানুষের আনাগোনা কম থাকায় বন ও বন্যপ্রাণী নিজেদের স্বাভাবিক পরিবেশে বিচরণ ও প্রজননের সুযোগ পেয়েছে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ।
নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সুন্দরবননির্ভর মানুষের জীবনেও ফিরতে শুরু করেছে কর্মচাঞ্চল্য। দীর্ঘদিন কর্মহীন থাকার পর জেলে ও বনজীবীরা আবার নদী ও খালে নামার প্রস্তুতি নিয়েছেন। একইভাবে প্রকৃতিপ্রেমী পর্যটকদের কাছেও আবার খুলে গেছে সুন্দরবনের অপরূপ সৌন্দর্য দেখার সুযোগ।
সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়; এটি বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন, জীবিকা ও প্রকৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এক বিশাল জীববৈচিত্র্যের আধার। রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ, কুমির, বানর, অসংখ্য প্রজাতির পাখি, মাছ ও জলজ প্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল এই বন। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় উপকূলীয় অঞ্চলকে সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রেও সুন্দরবনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিন মাসের নিষেধাজ্ঞার সময়ে পর্যটকবাহী নৌযানের শব্দ, জেলে ও বনজীবীদের নিয়মিত আনাগোনা এবং বিভিন্ন মানবিক কর্মকাণ্ড বন্ধ থাকায় বনের ভেতরের পরিবেশ অনেকটাই শান্ত ছিল। বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, মানুষের উপস্থিতি কমে যাওয়ায় বন্যপ্রাণীরা স্বাভাবিকভাবে চলাচল ও প্রজননের সুযোগ পেয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার এই সময় সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণের পরিবেশ তৈরি হয়। বনের চরে হরিণের পাল নির্ভয়ে খাবার সংগ্রহ করেছে, নদী ও খালের তীরে কুমিরের স্বাভাবিক উপস্থিতি দেখা গেছে। গহিন বনের ভেতরে বাঘসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীর চলাচলও ছিল তুলনামূলক নির্বিঘ্ন।
বন বিভাগ জানিয়েছে, চলতি বছরের জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় বনরক্ষীরা মোট ৬৩টি অভিযান পরিচালনা করেছেন। এসব অভিযানে বন অপরাধের অভিযোগে ৩৯টি মামলা করা হয়েছে এবং ৩৭ জনকে আটক করা হয়েছে।
অভিযানকালে বনরক্ষীরা ১২টি ট্রলার, ৫০টি নৌকা এবং বিপুল পরিমাণ মাছ ধরার সরঞ্জাম জব্দ করেন। এর মধ্যে রয়েছে ৫৫টি মাছ ধরার জাল, হরিণ শিকারে ব্যবহৃত ছয় হাজার ২৯০টি ফাঁদ এবং বিষ প্রয়োগের কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপকরণ। উদ্ধার করা হয়েছে ২৮ বোতল ও দুই লিটার তরল বিষ।
এ ছাড়া বন বিভাগ অভিযান চালিয়ে ১৮৬ কেজি বিষযুক্ত মাছ, ৭৩৬ কেজি কাঁকড়া, এক হাজার ৫৬২টি চারু, দুই হাজার বড়শি, ১৭০ কেজি মধু এবং বিভিন্ন ধরনের অবৈধভাবে সংগ্রহ করা বনজ সম্পদ উদ্ধার করেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নিষেধাজ্ঞার সময় সুন্দরবনে অপরাধ দমনে বিশেষ নজরদারি চালানো হয়েছে। দুর্গম এলাকাগুলোতে নিয়মিত টহলের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে। ফলে অবৈধ শিকার, বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরা এবং বনজ সম্পদ পাচারের মতো কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে।
বাগেরহাট সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানিয়েছেন, তিন মাস মানুষের চাপ কম থাকায় সুন্দরবনের নদী ও খালে মাছের স্বাভাবিক প্রজননের সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে বাঘ, হরিণসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীও নির্বিঘ্নে চলাচল ও প্রজননের পরিবেশ পেয়েছে।
তার মতে, শব্দদূষণ, অতিরিক্ত পর্যটন এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ কমে যাওয়ায় সুন্দরবনের গহিন অঞ্চলের স্বাভাবিক পরিবেশ অনেকটাই ফিরে এসেছে। বনাঞ্চলের উদ্ভিদ ও প্রাণীজগতের জন্য এ ধরনের নিরিবিলি সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল বনাঞ্চল রক্ষায় বন বিভাগ এখন আগের তুলনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়েছে। দুর্গম এলাকাগুলোতে বিশেষ অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি স্মার্ট প্যাট্রলিং কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। আকাশপথ থেকে নজরদারির জন্য ড্রোন প্রযুক্তিও ব্যবহার করা হচ্ছে।
বন বিভাগের আশা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে হরিণ শিকারি, বন্যপ্রাণী পাচারকারী এবং বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরার সঙ্গে জড়িত চক্রগুলোর বিরুদ্ধে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
তবে সুন্দরবন উন্মুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন করে মানুষের চাপ বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যটন ও জীবিকার প্রয়োজনে বন ব্যবহার করা হলেও পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। নির্ধারিত নিয়ম না মেনে নৌযান চলাচল, শব্দদূষণ, প্লাস্টিক ও বর্জ্য ফেলা কিংবা বন্যপ্রাণীকে বিরক্ত করা সুন্দরবনের পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
এ কারণে বন বিভাগ সুন্দরবনে প্রবেশকারী সবাইকে নির্ধারিত নিয়মকানুন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে। জেলে, পর্যটক ও বনজীবীদের দায়িত্বশীল আচরণই এই বন রক্ষার অন্যতম শর্ত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সুন্দরবনে প্রবেশে মৌসুমি নিষেধাজ্ঞা নতুন কোনো বিষয় নয়। ইন্টিগ্রেটেড রিসোর্সেস ম্যানেজমেন্ট প্ল্যানের সুপারিশ অনুযায়ী ২০১৯ সাল থেকে নির্দিষ্ট সময়ে সুন্দরবনে মানুষের প্রবেশ সীমিত করা শুরু হয়। পরবর্তীতে মৎস্য বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা আরও বাড়ানো হয়।
২০২২ সাল থেকে প্রতিবছর ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে প্রবেশ ও বিভিন্ন ধরনের বননির্ভর কার্যক্রম বন্ধ রাখা হচ্ছে। এ সময় জীবিকার ওপর নির্ভরশীল নিবন্ধিত জেলেদের জন্য সরকারি খাদ্য সহায়তার ব্যবস্থাও করা হয়।
তিন মাসের নীরবতার পর আবারও মানুষের পদচারণায় মুখর হতে যাচ্ছে সুন্দরবন। নদীপথে চলবে নৌযান, জেলেরা ফিরবেন জীবিকার সন্ধানে, পর্যটকরা ছুটবেন সবুজের গহিনে। তবে সুন্দরবনের এই ফিরে আসা যেন প্রকৃতির জন্য নতুন কোনো হুমকি না হয়ে ওঠে, সেই দায়িত্ব এখন সবার।
প্রকৃতির এই অনন্য সম্পদ শুধু বর্তমান প্রজন্মের নয়, ভবিষ্যৎ বাংলাদেশেরও। তাই সুন্দরবনকে ব্যবহার করতে হবে সংরক্ষণের দায়িত্ববোধ নিয়ে। জীবিকা, পর্যটন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য রক্ষার ভারসাম্য বজায় রাখতে পারলেই বিশ্বের বৃহত্তম এই ম্যানগ্রোভ বন তার স্বাভাবিক প্রাণপ্রবাহ ধরে রাখতে পারবে।
তিন মাসের বিশ্রাম শেষে আবার উন্মুক্ত সুন্দরবন যেন নতুন করে সেই বার্তাই সামনে নিয়ে এসেছে—প্রকৃতিকে সময় দিলে প্রকৃতি নিজেই ফিরে পায় তার শক্তি, সৌন্দর্য ও প্রাণের স্বাভাবিক ছন্দ।