রূপপুরের বিদ্যুৎ কি আসবে নভেম্বরে?

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১ বার
রূপপুরের বিদ্যুৎ কি আসবে নভেম্বরে?

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ ও শেষ পর্যায়ের প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের সময় নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে পরিবর্তন এলেও প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের সর্বশেষ প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় কারিগরি পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন করা গেলে আগামী নভেম্বরের মধ্যে কেন্দ্রটি থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদনের পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব হতে পারে।

তবে রূপপুরের মতো একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়সীমাকে চূড়ান্ত নিশ্চয়তা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ প্রতিটি ধাপে কঠোর কারিগরি পরীক্ষা, নিরাপত্তা যাচাই এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন প্রয়োজন হয়। কোনো পরীক্ষায় জটিলতা দেখা দিলে উৎপাদনের সময়সূচি পরিবর্তিত হতে পারে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে বড় ও প্রযুক্তিগতভাবে জটিল প্রকল্পগুলোর একটি। প্রকল্পটির প্রথম ইউনিটের সক্ষমতা এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট এবং দুটি ইউনিট মিলিয়ে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদনক্ষমতা দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক জ্বালানি লোডিং ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং এখন কমিশনিং ও বিভিন্ন নিরাপত্তা পরীক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলো এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

গত এপ্রিলে প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক জ্বালানি লোডিং শুরু হয় এবং মে মাসে এই গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন হওয়ার তথ্য প্রকাশ করা হয়। জ্বালানি লোডিং পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে বড় একটি মাইলফলক হলেও এর অর্থ সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হওয়া নয়। এরপর রিঅ্যাক্টরের বিভিন্ন সিস্টেম পরীক্ষা, নিরাপত্তা যাচাই, নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় রিঅ্যাক্টর পরিচালনা এবং ধাপে ধাপে ক্ষমতা বাড়ানোর মতো জটিল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়।

পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল প্রক্রিয়া হলো নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক ফিশন বা বিভাজন বিক্রিয়া। জ্বালানির ভেতরে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিভাজনের মাধ্যমে বিপুল তাপশক্তি উৎপন্ন হয়। সেই তাপ দিয়ে পানি উত্তপ্ত করে বাষ্প তৈরি করা হয় এবং বাষ্পের শক্তিতে টারবাইন ঘোরানো হয়। টারবাইনের সঙ্গে যুক্ত জেনারেটরের মাধ্যমে উৎপন্ন হয় বিদ্যুৎ।

অর্থাৎ রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ফিউশন বা সংযোজন বিক্রিয়া নয়, নিয়ন্ত্রিত ফিশন বিক্রিয়া ব্যবহার করা হবে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রযুক্তিগত কার্যক্রম ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে এই পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রকল্পটির সামনে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো চলমান পরীক্ষা ও কমিশনিং কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন করা। রিঅ্যাক্টরের বিভিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং প্রাইমারি সার্কিটের কার্যকারিতা যাচাইয়ের পাশাপাশি জটিল কারিগরি পরীক্ষাগুলো সম্পন্ন করতে হচ্ছে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর আগে কোনো পরীক্ষার ক্ষেত্রে সামান্য ত্রুটি বা অসঙ্গতি পাওয়া গেলেও সেটি সমাধান না করে পরবর্তী ধাপে এগোনো যায় না। কারণ পারমাণবিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সময়সীমার চেয়ে নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।

রূপপুরের প্রথম ইউনিটকে ধাপে ধাপে এমন একটি পর্যায়ে নেওয়া হবে, যেখানে রিঅ্যাক্টর নিয়ন্ত্রিতভাবে শক্তি উৎপাদন শুরু করবে। এরপর ধীরে ধীরে উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানো হবে। পরীক্ষামূলক উৎপাদনের পর জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযোগ এবং বিভিন্ন ক্ষমতা পর্যায়ে সিস্টেমের কার্যকারিতা যাচাই করা হবে।

এরপরও পূর্ণ সক্ষমতায় বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে আরও সময় লাগতে পারে। প্রথম পর্যায়ে সীমিত পরিমাণ বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের পর ধাপে ধাপে উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

রূপপুর থেকে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের বিষয়টি বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনায় এসেছে। তবে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটের পূর্ণ সক্ষমতা এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট। ফলে সীমিত পরীক্ষামূলক সরবরাহ এবং পূর্ণ বাণিজ্যিক সক্ষমতায় উৎপাদনের মধ্যে সময়ের পার্থক্য থাকবে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং রূপপুর প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের সাম্প্রতিক কার্যক্রমে কেন্দ্রটির বাকি কাজ দ্রুত সম্পন্ন করে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন রোসাটমের সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের সঙ্গেও প্রকল্পের অগ্রগতি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

রূপপুরের বিদ্যুতের সম্ভাব্য দাম নিয়েও রয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের ধারণা অনুযায়ী, উৎপাদন ব্যয়, পরিচালন ব্যয়, রক্ষণাবেক্ষণ এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট খরচ বিবেচনায় প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১০ টাকার নিচে রাখার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে চূড়ান্ত দাম নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে প্রয়োজনীয় আর্থিক ও বাণিজ্যিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া জরুরি।

পারমাণবিক বিদ্যুতের সবচেয়ে বড় সুবিধাগুলোর একটি হলো, একবার একটি কেন্দ্র স্থিতিশীলভাবে উৎপাদনে গেলে দীর্ঘ সময় ধরে তুলনামূলক নিরবচ্ছিন্নভাবে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব। বাংলাদেশের মতো দ্রুত বাড়তে থাকা বিদ্যুৎ চাহিদার দেশে এটি জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ শুধু উৎপাদনক্ষমতার বিষয় নয়; এর সঙ্গে নিরাপত্তা, দক্ষ জনবল, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি ব্যবস্থাপনার মতো জটিল বিষয়ও জড়িত।

রূপপুর প্রকল্পের ক্ষেত্রে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নগুলোর একটি হলো ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি বা স্পেন্ট ফুয়েলের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা। রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতা কাঠামোর মধ্যে ব্যবহৃত জ্বালানি ব্যবস্থাপনা ও ফেরত নেওয়ার বিষয়ে নীতিগত সহযোগিতার কথা রয়েছে। তবে এ-সংক্রান্ত বাণিজ্যিক ও বাস্তবায়নসংক্রান্ত সব বিষয় পুরোপুরি চূড়ান্ত হওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

স্পেন্ট ফুয়েল ব্যবহারের পরও দীর্ঘ সময় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সংরক্ষণ করতে হয়। এ কারণে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক নিরাপত্তা নীতিমালা অনুসরণ করে এর সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

এদিকে বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ বিদ্যুৎকেন্দ্রের অন্যান্য তেজস্ক্রিয় ও ভারী বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়েও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে তৈরি হওয়া বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য নিরাপদভাবে পৃথকীকরণ, সংরক্ষণ এবং ব্যবস্থাপনার জন্য আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলামও ভারী বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হওয়ার আগে থেকেই এসব বর্জ্যের নিরাপদ ব্যবস্থাপনার জন্য সুস্পষ্ট প্রস্তুতি থাকা জরুরি।

রূপপুর প্রকল্প বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়; এটি দেশের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামো উন্নয়নের একটি বড় পরীক্ষা। কেন্দ্রটি সফলভাবে চালু হলে বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশগুলোর তালিকায় নতুন একটি অবস্থান তৈরি করবে।

তবে এই অর্জনের সঙ্গে দায়িত্বও বাড়বে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য দক্ষ প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদ প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্বাধীন ও কার্যকর নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান অনুসরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে।

সাম্প্রতিক অগ্রগতিতে রূপপুরের প্রথম ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন হওয়ার পর এখন কেন্দ্রটি একাধিক কারিগরি ও নিরাপত্তা পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন হলে প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং পরে ধীরে ধীরে উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হবে।

আগামী নভেম্বরের সময়সীমা নিয়ে আশাবাদ থাকলেও শেষ পর্যন্ত উৎপাদন শুরুর বিষয়টি নির্ভর করবে সব কারিগরি পরীক্ষা, নিরাপত্তা মূল্যায়ন এবং নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের ওপর। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে দ্রুততার চেয়ে নিরাপদ ও নির্ভুল কমিশনিং প্রক্রিয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের মানুষের কাছে রূপপুর বহু বছরের প্রত্যাশার নাম। নির্মাণকাজ, অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত জটিলতা এবং দীর্ঘ প্রস্তুতির পর এখন কেন্দ্রটি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে বাস্তব বিদ্যুৎ উৎপাদনের অপেক্ষা ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে।

তবে জাতীয় গ্রিডে প্রথম বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক উৎপাদন—এই দুটি ধাপকে আলাদাভাবে দেখতে হবে। প্রথম বিদ্যুৎ সরবরাহের পরও কেন্দ্রটির বিভিন্ন ক্ষমতায় পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হবে।

সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে রূপপুর বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। আর যদি কোনো কারিগরি পরীক্ষা বা নিরাপত্তা যাচাইয়ে অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন হয়, তাহলে সময়সূচি পরিবর্তন হলেও সেটিকে নিরাপত্তাভিত্তিক পারমাণবিক কমিশনিং প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।

বাংলাদেশ এখন অপেক্ষা করছে সেই মুহূর্তের জন্য, যখন দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। রূপপুরের সফল যাত্রা শুধু বিদ্যুতের নতুন উৎস নয়, দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত