**প্রকাশ: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।**
উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট, দুর্বল রাজস্ব আহরণ এবং বেসরকারি খাতে উৎপাদন স্থবিরতার মধ্যে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম জাতীয় বেতন কাঠামো অনুমোদন করেছে সরকার। নতুন এই পে স্কেলে সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এতে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।
নতুন কাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে ২০২৮ সালের জানুয়ারি থেকে বেতন ও ভাতাসহ সরকারি কর্মচারীদের পেছনে সরকারের বার্ষিক ব্যয় প্রায় ২ লাখ কোটি টাকায় দাঁড়াবে। এই ব্যয় গত অর্থবছরে সরকারের আহরিত মোট রাজস্বের প্রায় অর্ধেকের সমান।
সরকার বলছে, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান এবং প্রশাসনে দক্ষতা ও কর্মোদ্দীপনা বাড়ানোর প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়েই নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন করা হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে নতুন এই ব্যয়ের অর্থায়ন এবং এর সম্ভাব্য মূল্যস্ফীতির প্রভাব নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে।
নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী, সরকারি চাকরির সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডে মূল বেতন ১৪২ শতাংশ বেড়ে ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে ২০ হাজার ১০ টাকা হবে। এ গ্রেডে সাধারণত অষ্টম শ্রেণি পাস কর্মীদের নিয়োগ দেওয়া হয়। বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াত ও মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন ভাতা যোগ হলে এই গ্রেডের মোট মাসিক আয় প্রায় ৩৫ হাজার টাকা হতে পারে।
অন্যদিকে সর্বোচ্চ প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে দ্বিগুণ হয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সচিবসহ প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা সাধারণত এই গ্রেডের আওতায় থাকেন।
বেতন বৃদ্ধির হিসাবে গত ১৭ বছরে ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৪৮৮ শতাংশ বাড়বে। ২০০৯ সালে এই গ্রেডের মূল বেতন ছিল ৮ হাজার ২৫০ টাকা। একই সময়ে প্রথম গ্রেডের কর্মকর্তাদের মূল বেতন ৪০ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হচ্ছে।
সরকারি চাকরির নবম গ্রেডেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিসিএস ক্যাডার ও নন-ক্যাডার প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তারা সাধারণত এই গ্রেডে চাকরিতে যোগ দেন। ২০০৯ সালে এই গ্রেডের মূল বেতন ছিল ১১ হাজার টাকা, ২০১৫ সালে তা বাড়িয়ে ২২ হাজার টাকা করা হয়েছিল। নতুন পে স্কেলে তা বেড়ে ৪৪ হাজার টাকা হবে।
নতুন বেতন কাঠামো একবারে পুরোপুরি কার্যকর করা হবে না। চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ১ জুলাই পর্যন্ত তিন ধাপে মূল বেতন কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে বিভিন্ন ভাতা একযোগে কার্যকর হবে।
এর ফলে গত জুলাই থেকে অবসরে যাওয়া সরকারি চাকরিজীবীরাও নতুন বেতন কাঠামোর আওতায় পেনশন সুবিধা পাবেন। অর্থাৎ নতুন কাঠামোর প্রভাব শুধু কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; অবসরপ্রাপ্তদের একটি বড় অংশও এর আওতায় আসবেন।
সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠকের পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি জানান, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান বিবেচনায় নিয়ে নতুন বেতন স্কেল অনুমোদন করা হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, সরকারের আর্থিক চাপ এবং জ্বালানি আমদানির ব্যয় মেটানোর চ্যালেঞ্জের কারণে মন্ত্রিসভার বৈঠকে কয়েকজন মন্ত্রী নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন নিয়ে আপত্তি জানান। পরে আলোচনার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রস্তাবটিতে অনুমোদন দেন।
নতুন পে স্কেলে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা অন্তর্ভুক্ত হবেন কি না, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানিয়েছেন, বিষয়টি নিষ্পত্তি হলে এ বিষয়ে আলাদা সিদ্ধান্ত জানানো হবে। সাংবাদিকদের বেতন কাঠামো নিয়েও সরকারের মধ্যে আলোচনা হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে পেনশন ব্যবস্থাতেও পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সামরিক ও অসামরিক ক্ষেত্রে ‘ওয়ান র্যাংক, ওয়ান পেনশন’ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে কিছু ক্ষেত্রে একই ব্যক্তি সামরিক ও বেসামরিক প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করলে দুই উৎস থেকে পেনশন সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় এই দ্বৈত সুবিধা বাতিল করা হবে।
২০১৯ সালের আগে অবসর নেওয়া বেসামরিক চাকরিজীবীদের তথ্যের সীমাবদ্ধতার কারণে নতুন পেনশন ব্যবস্থা পর্যায়ক্রমে ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
দীর্ঘদিন আগে অবসরে যাওয়া এবং তুলনামূলক কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের জন্যও নতুন সুবিধা রাখা হয়েছে। মাসিক নিট পেনশন ৯ হাজার টাকা পর্যন্ত হলে তা ১০০ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। ৯ হাজার ১ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশনে ৭৫ শতাংশ, ২০ হাজার ১ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬৫ শতাংশ, ৩০ হাজার ১ টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬০ শতাংশ এবং ৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশনে সর্বোচ্চ ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তান রয়েছে এমন সরকারি চাকরিজীবীরা প্রতিটি প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা ভাতা পাবেন। এতদিন পঞ্চম গ্রেড পর্যন্ত কর্মকর্তারা মোবাইল ফোন ভাতা পেলেও নতুন ব্যবস্থায় সব সরকারি কর্মচারীর জন্য এ সুবিধা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
নতুন পে স্কেলের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের বেতন কাঠামো পরিবর্তনের দাবি। ২০১৫ সালের অষ্টম জাতীয় বেতন কাঠামোতে সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছিল। ওই সময় মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট নির্ধারণের একটি ব্যবস্থার সুপারিশ করা হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
পরবর্তী সময়ে মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকায় সরকারি কর্মচারীদের জন্য নিয়মিত বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের পাশাপাশি অতিরিক্ত প্রণোদনা দেওয়া হয়। নতুন পে স্কেল পুরোপুরি কার্যকর হলে বর্তমান অতিরিক্ত প্রণোদনা সুবিধা আর বহাল থাকবে না।
নতুন কাঠামোর পক্ষে যুক্তি হলো, গত কয়েক বছরে মূল্যস্ফীতির কারণে সরকারি কর্মচারীদের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মীদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। ফলে বেতন সমন্বয়ের একটি যৌক্তিক প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।
তবে বেতন বাড়ানোর অর্থনৈতিক প্রভাব নির্ভর করবে সরকার কীভাবে এই বাড়তি ব্যয় মেটায় তার ওপর। রাজস্ব আহরণ না বাড়িয়ে ব্যাংক ঋণ, অতিরিক্ত অর্থ সৃষ্টির মতো পদ্ধতি বা উন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে বেতন-ভাতা মেটানো হলে অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে।
সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়লে তাঁদের ভোগব্যয়ও বাড়তে পারে। ফলে খাদ্য, আবাসন, পরিবহন ও অন্যান্য পণ্য-সেবার সরবরাহ যদি একই হারে না বাড়ে, তাহলে চাহিদাজনিত মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ কারণে নতুন বেতন কাঠামোর পাশাপাশি বাজারে পণ্য ও সেবার সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং মুদ্রা ও রাজস্বনীতির মধ্যে সমন্বয় রাখা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা কতটা বাড়বে। বেতন-ভাতা বাড়ানোর ফলে যদি সরকারি সেবা দ্রুত হয়, প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আসে, অপচয় কমে এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি হয়, তাহলে বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ অর্থনৈতিক সুফলে রূপ নিতে পারে।
অন্যদিকে সরকারি খাতের বাইরে থাকা কর্মীদের আয় একই হারে না বাড়লে আয়বৈষম্য আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা, প্রকল্পভিত্তিক কর্মী, শিক্ষক, সাংবাদিক এবং বেসরকারি খাতের কর্মীদের আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়ও বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
বিশেষ করে বর্তমানে জ্বালানি সংকট, উৎপাদন স্থবিরতা এবং দুর্বল রাজস্ব আহরণের কারণে বেসরকারি খাত চাপের মধ্যে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মচারীদের বড় ধরনের বেতন বৃদ্ধি বেসরকারি খাতে সরাসরি একই মাত্রার মজুরি বৃদ্ধির চাপ তৈরি না করলেও শ্রমবাজারে আয়বৈষম্যের প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সরকারের জন্য তাই নতুন পে স্কেলের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এর আর্থিক ভারসাম্য নিশ্চিত করা। চলতি বাজেটে এ উদ্দেশ্যে কিছু বরাদ্দ রাখা হলেও দীর্ঘমেয়াদে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক বেতন-ভাতা ব্যয় বহন করতে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাস করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে নতুন পে স্কেল সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের বেতন সমন্বয়ের দাবি পূরণ করলেও এর সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়ন পদ্ধতি, অর্থায়নের উৎস, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ওপর। সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি অর্থনীতির অন্যান্য খাতের আয় ও কর্মসংস্থানের ওপরও যাতে অতিরিক্ত চাপ না পড়ে, সেটিই হবে সরকারের সামনে বড় নীতিগত পরীক্ষা।