জুলাইয়ে ঋণ ছাড়ের দ্বিগুণের বেশি পরিশোধ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬
  • ২ বার
জুলাইয়ে ঋণ ছাড়ের দ্বিগুণের বেশি পরিশোধ

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতেই বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের জন্য নতুন করে চাপের চিত্র সামনে এসেছে। অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বাংলাদেশ যে পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ পেয়েছে, তার দ্বিগুণেরও বেশি অর্থ পুরোনো ঋণের দায় পরিশোধে ব্যয় করতে হয়েছে। এ সময়ে নতুন করে ১৮০ দশমিক ১৮ মিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ ছাড় হলেও আগের নেওয়া ঋণের আসল ও সুদ বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে ৪৫৩ দশমিক ২৩ মিলিয়ন ডলার।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য থেকে এ চিত্র পাওয়া গেছে। হিসাব অনুযায়ী, জুলাইয়ে নতুন করে পাওয়া বৈদেশিক ঋণের চেয়ে পুরোনো ঋণ পরিশোধে ২৭৩ দশমিক ০৫ মিলিয়ন ডলার বেশি ব্যয় হয়েছে। অর্থাৎ উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে নতুন করে যে পরিমাণ অর্থ এসেছে, তার তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ অর্থ আগের দায় মেটাতে দেশের বাইরে চলে গেছে।

বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রে অর্থছাড় ও পরিশোধের এই ব্যবধান অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সূচক। কারণ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচিতে বিদেশি অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নতুন ঋণের অর্থছাড় কমে গেলে একদিকে প্রকল্পের অর্থায়ন ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হতে পারে, অন্যদিকে পুরোনো ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধের পরিমাণ বাড়তে থাকলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও বাড়তি চাপ পড়ার আশঙ্কা থাকে।

ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ে বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী বাংলাদেশের অনুকূলে ১৮০ দশমিক ১৮ মিলিয়ন ডলার ঋণ ছাড় করেছে। আগের অর্থবছরের একই মাসে অর্থাৎ ২০২৫-২৬ সালের জুলাইয়ে এই অর্থছাড়ের পরিমাণ ছিল ২০৮ দশমিক ০৪ মিলিয়ন ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে নতুন বৈদেশিক ঋণ ছাড় কমেছে ২৭ দশমিক ৮৬ মিলিয়ন ডলার। শতাংশের হিসাবে কমার হার প্রায় ১৩ দশমিক ৩৯ শতাংশ।

অর্থাৎ অর্থবছরের শুরুতেই নতুন বৈদেশিক অর্থায়নের প্রবাহ আগের বছরের তুলনায় দুর্বল হয়েছে। তবে এর বিপরীতে পুরোনো ঋণের দায় পরিশোধের চাপ কমেনি; বরং কিছুটা বেড়েছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাইয়ে বাংলাদেশ বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ বাবদ ৪৪৬ দশমিক ৬৮ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছিল। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে এই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫৩ দশমিক ২৩ মিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঋণ পরিশোধ বেড়েছে ৬ দশমিক ৫৫ মিলিয়ন ডলার, যা প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি।

নতুন ঋণ ছাড় কমা এবং পুরোনো ঋণ পরিশোধ বাড়ার ফলে জুলাইয়ে বৈদেশিক অর্থায়নের নিট চিত্র নেতিবাচক হয়েছে। নতুন করে পাওয়া ১৮০ দশমিক ১৮ মিলিয়ন ডলারের বিপরীতে পরিশোধ করতে হয়েছে ৪৫৩ দশমিক ২৩ মিলিয়ন ডলার। ফলে নিট হিসাবে ২৭৩ দশমিক ০৫ মিলিয়ন ডলার বেশি অর্থ ঋণ পরিশোধের দিকে গেছে।

এ ধরনের পরিস্থিতিকে সরাসরি বৈদেশিক ঋণ সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ না থাকলেও এটি ঋণ ব্যবস্থাপনায় সতর্কতার প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে দেয়। কারণ ঋণ গ্রহণের সময় যে অর্থ উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যবহারের জন্য পাওয়া যায়, নির্দিষ্ট সময় পর সেই ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধের দায় তৈরি হয়। প্রকল্পের অর্থনৈতিক সুফল বা রাজস্ব আয় প্রত্যাশিত সময়ে না এলে ঋণ পরিশোধের চাপ সামলাতে সরকারের ওপর বাড়তি দায়িত্ব তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশ গত এক দশকে বড় অবকাঠামোসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে বৈদেশিক ঋণ ব্যবহার করেছে। সড়ক, সেতু, রেল, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পানি সরবরাহ ও নগর অবকাঠামোর মতো খাতে উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নে একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। এসব ঋণের অনেকগুলোর ক্ষেত্রে শুরুতে নির্দিষ্ট সময়ের গ্রেস পিরিয়ড থাকে। ওই সময়ে ঋণের আসল পরিশোধ শুরু হয় না বা তুলনামূলক কম থাকে। পরে গ্রেস পিরিয়ড শেষ হলে আসল পরিশোধ শুরু হয় এবং একই সঙ্গে সুদ পরিশোধের দায়ও অব্যাহত থাকে।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের জায়গাটি এখানেই। অতীতে নেওয়া বড় প্রকল্পগুলোর ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যদি একসঙ্গে বেশি ঋণের আসল পরিশোধ শুরু হয়, তাহলে ভবিষ্যতে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। নতুন ঋণের অর্থছাড় যদি সেই হারে না বাড়ে, তাহলে বৈদেশিক অর্থায়নের নিট প্রবাহ আরও চাপে পড়তে পারে।

এ ক্ষেত্রে শুধু ঋণের পরিমাণ নয়, ঋণের ধরন ও শর্তও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ঋণের সুদের হার তুলনামূলক কম হলেও দীর্ঘমেয়াদে বড় অঙ্কের অর্থ পরিশোধ করতে হয়। আবার কিছু ঋণের ক্ষেত্রে গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ার পর পরিশোধের চাপ দ্রুত বাড়তে পারে। তাই নতুন প্রকল্প গ্রহণের সময় ঋণের শর্ত, পরিশোধের সময়সূচি এবং প্রকল্প থেকে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সুফল—সবকিছু বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ করতে সাধারণত বৈদেশিক মুদ্রা প্রয়োজন হয়। ফলে ঋণ পরিশোধ বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবস্থাপনাতেও এর প্রভাব পড়ে। বাংলাদেশে রপ্তানি আয়, রেমিট্যান্স এবং অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সঙ্গে আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক দায় পরিশোধের ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ। এই ভারসাম্যের ওপর চাপ তৈরি হলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনাতেও বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন হয়।

তবে একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, একটি মাসের তথ্য দিয়ে পুরো অর্থবছরের বৈদেশিক ঋণ পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা যায় না। অর্থবছরের বিভিন্ন সময়ে উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণ ছাড়ের পরিমাণে বড় ধরনের ওঠানামা হতে পারে। কোনো মাসে প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি, ঋণচুক্তির শর্ত পূরণ বা প্রকল্পের বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে অর্থছাড় কম হতে পারে। আবার পরবর্তী মাসগুলোতে একাধিক প্রকল্পের অর্থ একসঙ্গে ছাড় হলে সেই ঘাটতি পূরণও হতে পারে।

তবু অর্থবছরের প্রথম মাসের এই তথ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতার দিকে ইঙ্গিত করছে। নতুন বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড় কমেছে, অথচ পুরোনো ঋণের দায় পরিশোধের পরিমাণ বেড়েছে। অর্থাৎ সামনে বাংলাদেশের জন্য ঋণ ব্যবস্থাপনায় শুধু নতুন অর্থ সংগ্রহ নয়, পুরোনো দায়ের সময়মতো পরিশোধ এবং প্রকল্পভিত্তিক অর্থ ব্যবহারের দক্ষতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈদেশিক ঋণ তখনই অর্থনীতির জন্য কার্যকর হয়, যখন সেই ঋণ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করে ভবিষ্যতে আয়, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সহায়তা করে। কিন্তু ঋণের অর্থছাড় ও প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্যে দীর্ঘসূত্রতা থাকলে বা প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত সুফল না এলে ভবিষ্যতে সেই ঋণ পরিশোধের দায়িত্বই বড় হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশের সামনে তাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বৈদেশিক ঋণের ব্যবহারকে আরও কার্যকর ও পরিকল্পিত করা। নতুন প্রকল্পে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রকল্পের আর্থিক সক্ষমতা, বৈদেশিক মুদ্রা আয় বা সাশ্রয়ের সম্ভাবনা এবং দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে চলমান প্রকল্পে অর্থছাড় ও বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো গেলে অনুমোদিত বৈদেশিক অর্থায়ন দ্রুত অর্থনীতিতে কাজে লাগানো সম্ভব হবে।

জুলাইয়ের পরিসংখ্যান সেই বাস্তবতারই একটি স্পষ্ট প্রতিফলন। নতুন করে ১৮০ দশমিক ১৮ মিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ পাওয়া গেলেও আগের ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধে গেছে ৪৫৩ দশমিক ২৩ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ অর্থবছরের শুরুতেই নতুন ঋণের তুলনায় পুরোনো দায়ের ভার বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

আগামী মাসগুলোতে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণ ছাড়ের প্রবাহ কতটা বাড়ে এবং বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধের পরিমাণ কোন দিকে যায়, তার ওপরই সামগ্রিক চিত্র অনেকটা নির্ভর করবে। একই সঙ্গে সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনা, প্রকল্প বাস্তবায়নের দক্ষতা এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার ওপরও নজর রাখতে হবে। কারণ বৈদেশিক ঋণ শুধু আজকের উন্নয়ন ব্যয়ের উৎস নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর তৈরি হওয়া একটি আর্থিক দায়ও। সেই দায় যেন দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত